ক্লাসরুমের বাইরে আরেকটি ক্লাস: শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শ্রীমঙ্গলে

কলাম
মোঃ সোহেল হোসেন

 

ক্লাসরুমে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা সাধারণত নির্দিষ্ট কিছু কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ থাকে। শিক্ষক পড়ান, শিক্ষার্থীরা শোনে; কখনো প্রশ্ন করে, কখনো আবার নীরবে ক্লাস শেষ হওয়ার অপেক্ষায় থাকে। কিন্তু ক্লাসরুমের বাইরে সেই সম্পর্কের গল্পটা একটু অন্যরকম। সেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থী পরিচয়ের আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে সহযাত্রীর পরিচয়টাই যেন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। শ্রীমঙ্গলের এই সফরটা তাই শুধু একটি শিক্ষাসফর ছিল না; বরং ছিল ক্লাসরুমের বাইরে আরেকটি ক্লাস।

 

গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই পরিকল্পনা চলছিল, আমরা শ্রীমঙ্গল যাব। আমার জন্য এ ধরনের ট্যুরের অভিজ্ঞতা কিছুটা নতুনই বলা যায়। তবে এই ভ্রমণ শুরু হওয়ার আগেই যেন নানা নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে আমাদের সবাইকে। স্টুডেন্টদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে ট্রেনের টিকিট কাটতে যাওয়া, টিকিট না পাওয়া, শেষ পর্যন্ত রেলের মহাপরিচালক বরাবর আবেদন, ফারিয়া ম্যামের উপস্থিত হতে না পারা, ফারিশতা ম্যামের অসুস্থতা, ঠিকমতো রিসোর্ট না পাওয়া; সব মিলিয়ে একের পর এক “না”-এর মুখোমুখি হয়েই আমাদের যাত্রা শুরু। মনে হচ্ছিল, শ্রীমঙ্গল বুঝি আমাদের খুব সহজে ধরা দেবে না!  তবু শেষ পর্যন্ত সব অনিশ্চয়তা পেছনে ফেলে আমরা রওনা হতে পেরেছিলাম।

 

এই সফরটি শুধু ঘোরাঘুরির জন্য ছিল না। ৮৪ ব্যাচের শিক্ষার্থীরা ‘ফটোজার্নালিজম’ কোর্সের অংশ হিসেবে এই সফরে এসেছিল। ক্লাসে এতদিন আমরা ছবির কম্পোজিশনের বিভিন্ন নিয়ম নিয়ে আলোচনা করেছি। শ্রীমঙ্গলে এসে সেই তাত্ত্বিক বিষয়গুলোই তারা বাস্তবে প্রয়োগের সুযোগ পেল। চা-বাগান, পাহাড়ি পথ, মাধবপুর লেক কিংবা প্রকৃতির নানা দৃশ্য; সবই হয়ে উঠেছিল তাদের জন্য বাস্তব দৃশ্যের ফ্রেম। একই সফরে শবনম জান্নাত ম্যাম ৮৪ ও ৮৫ ব্যাচের শিক্ষার্থীদের নিয়ে এসেছিলেন “ফিচার অ্যান্ড ক্রিয়েটিভ রাইটিং” কোর্সের অংশ হিসেবে। ফলে কেউ চা-শ্রমিকদের জীবন নিয়ে ফিচারের জন্য তথ্য সংগ্রহ করছিল, কেউ মণিপুরি সম্প্রদায়ের জীবন ও সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করছিল, আবার কেউ ছবি ও লেখার সমন্বয়ে তৈরি করছিল ফটো ফিচার। একই জায়গা, কিন্তু দেখার চোখ ছিল ভিন্ন। কেউ ক্যামেরায় গল্প খুঁজছিল, কেউ নোটবুকে। আর এখানেই হয়তো এই সফরের সবচেয়ে সুন্দর দিক, শিক্ষার্থীরা শ্রীমঙ্গলকে শুধু পর্যটকের চোখে দেখেনি; তারা দেখেছে একজন ফটোজার্নালিস্ট ও ফিচার রাইটারের চোখে। যখন ক্লাসে বলা রুল অফ থার্ড, লিডিং লাইন্স, ফ্রেম ইন ফ্রেম  কিংবা সিমেেত্রে  বাস্তব দৃশ্যের সামনে প্রয়োগ করতে হয়, তখন বিষয়গুলো আর শুধু তত্ত্ব থাকে না। চা-বাগানের সরু পথ, সারি সারি চা-গাছ, পাহাড়ি ঢাল কিংবা মাধবপুর লেক; প্রতিটি জায়গাই হয়ে উঠেছিল একটি সম্ভাব্য ফ্রেম। একটি composition rule যখন একজন শিক্ষার্থী নিজের ক্যামেরায় প্রয়োগ করে একটি ছবি তৈরি করে, তখন সেটি আর শুধু বইয়ের জ্ঞান থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে তার নিজের অভিজ্ঞতা।

ছবির পাশাপাশি গল্পের খোঁজে

দীর্ঘ রেলভ্রমণ শেষে চান্দের গাড়িতে করে যখন চা-বাগানের বিভিন্ন স্পটে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম, তখন ক্লান্তির চেয়ে উচ্ছ্বাসই যেন বেশি ছিল। একসঙ্গে চলতে চলতে, গল্প করতে করতে শিক্ষার্থীদের অন্য এক রূপও দেখতে পেলাম। নূরজাহান চা-বাগানে গিয়ে ক্যামেরার ব্যস্ততা চোখে পড়ার মতো। কেউ প্রকৃতির ছবি তুলছে, কেউ বন্ধুর ছবি, কেউ আবার একটি দৃশ্যকে ভিন্ন ভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে দেখছে। ক্লাসে শেখানো বিষয়গুলো বাস্তবে প্রয়োগ করার আগ্রহ তাদের মধ্যে স্পষ্ট ছিল। এরপর মাধবপুর লেক। পাহাড়ের ওপর দিয়ে সাবধানে হাঁটতে হচ্ছে, আবার তার মধ্যেই ছবি তোলার সুযোগ খোঁজা চলছে। কেউ প্রকৃতিকে ফ্রেমবন্দি করছে, কেউ পোজ দিচ্ছে, কেউ আবার বন্ধুদের নিয়ে তৈরি করছে নিজেদের মতো কিছু মুহূর্ত। পাহাড়ি মিষ্টি আনারস, পেয়ারা আর স্থানীয় নানা খাবারও যোগ করেছিল ভ্রমণের স্বাদ। তবে এই সফরের সবচেয়ে বড় পাওয়া হয়তো জায়গাগুলো দেখা নয়; বরং শিক্ষার্থীদের একটু অন্যভাবে দেখা। ক্লাসে যে শিক্ষার্থী হয়তো খুব চুপচাপ, ট্যুরে এসে তাকেই দেখা গেল সবচেয়ে বেশি প্রাণবন্ত। কেউ দায়িত্ব নিয়ে বন্ধুদের খোঁজ রাখছে, কেউ ছবি তুলছে, কেউ সবার সঙ্গে হাসি-ঠাট্টায় মেতে উঠছে। আবার কেউ হয়তো ক্লান্ত হয়ে একটু চুপচাপ বসে আছে। শিক্ষক হিসেবে এসব মুহূর্ত আমাদের শিক্ষার্থীদের এমন কিছু দিক দেখার সুযোগ করে দেয়, যা নিয়মিত ক্লাসে খুব সহজে দেখা যায় না।

 

শিক্ষকও শেখেন

এই সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি ছিল, শেখার সম্পর্কটি কখনোই একমুখী নয়। ক্লাসরুমে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের শেখান। কিন্তু ক্লাসরুমের বাইরে এসে শিক্ষকও অনেক কিছু শেখেন শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে। কোনো শিক্ষার্থী হয়তো অসাধারণ একটি ফ্রেম খুঁজে নেয়। কেউ এমন একটি প্রশ্ন করে, যা শিক্ষককেও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। কেউ কোনো মানুষের গল্প শুনতে গিয়ে এমন একটি দিক আবিষ্কার করে, যা অন্যদের চোখ এড়িয়ে গেছে। আবার ভ্রমণের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের এমন কিছু দিকও দেখা যায়, যা নিয়মিত ক্লাসে সবসময় ধরা পড়ে না। কে দায়িত্বশীল, কে নেতৃত্ব দিতে পারে, কে বন্ধুর পাশে দাঁড়ায়, কে দলের সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চলতে পারে; এসবও তো শিক্ষার অংশ। ক্লাসে শিক্ষার্থীদের আমরা তাদের রোল নম্বর, উপস্থিতি, অ্যাসাইনমেন্ট কিংবা পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে চিনি। ভ্রমণে এসে সেই পরিচয়ের বাইরে থাকা মানুষটিকে দেখা যায়।

 

ভ্রমণের চেয়ে বেশি কিছু

দুই দিনের সফর শেষে শরীরে ক্লান্তি ছিল। দীর্ঘ পথ হাঁটা, ঘোরাঘুরি, ছবি তোলা, মানুষের সঙ্গে কথা বলা; সব মিলিয়ে ভ্রমণটি ছিল পরিশ্রমেরও। কিন্তু সেই ক্লান্তির সঙ্গে ছিল এক ধরনের তৃপ্তি। কারণ, এই সফরে আমরা শুধু কয়েকটি জায়গা ঘুরে দেখিনি। আমরা একসঙ্গে পথ চলেছি, খেয়েছি, হেসেছি, ছবি তুলেছি, ক্লান্ত হয়েছি এবং সময়টাকে নিজেদের মতো করে উপভোগ করেছি। ক্যাম্পাসে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে যে আনুষ্ঠানিক দূরত্ব থাকে, এই দুই দিনের ভ্রমণে তার অনেকটাই যেন কমে এসেছিল। শিক্ষক তখন শুধু ক্লাস নেওয়া মানুষটি নন; তিনিও দলের একজন। শিক্ষার্থীরাও শুধু ক্লাসে বসে থাকা মুখ নয়; তারা প্রত্যেকে আলাদা গল্প, আলাদা সম্ভাবনা ও আলাদা ব্যক্তিত্ব নিয়ে থাকা মানুষ। হয়তো এটাই শিক্ষাভ্রমণের সবচেয়ে বড় অর্জন।

যার মাধ্যমে আমরা উপলব্ধি করতে পারি, শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করা নয়। একজন শিক্ষার্থীকে বাস্তব পৃথিবীর সঙ্গে পরিচিত করা, অন্যের সঙ্গে কাজ করতে শেখানো, দায়িত্ব নিতে শেখানো, প্রকৃতিকে বুঝতে শেখানো এবং মানুষের প্রতি সংবেদনশীল করে তোলাও শিক্ষার অংশ। এসব শেখানোর জন্য সবসময় ব্ল্যাকবোর্ড লাগে না। কখনো লাগে একটি ট্রেনের জানালা, একটি চা-বাগানের পথ, একটি পাহাড়ি টিলা কিংবা একটি বনের নীরবতা। শ্রীমঙ্গলের এই সফর তাই শুধু একটি ট্যুর নয়। এটি ছিল শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সম্পর্ককে নতুনভাবে দেখার, তাদের পরিচিত মুখের আড়ালে থাকা মানুষটিকে কাছ থেকে চেনার এবং নিজের শিক্ষকতার জগতে নতুন একটি অধ্যায় যোগ করার উপলক্ষ। ক্লাসরুমে আমরা শিক্ষার্থীদের শেখাই। আর কখনো কখনো ক্লাসরুমের বাইরে এসে তারাই আমাদের শেখায় যে শিক্ষা শুধু বইয়ের পাতায় নয়, মানুষকে দেখার চোখেও তৈরি হয়। সবচেয়ে সুন্দর কিছু ক্লাসের কোনো দেয়াল থাকে না।

প্রভাষক,
সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *