চারদিক২৪ ডেস্ক: বর্তমানে দেশের স্যাটেলাইট টেলিভিশন ‘বিজয় টিভি’র বার্তা প্রধান (হেড অব নিউজ) হিসেবে কর্মরত আছেন মামুনুর রহমান। প্রিন্ট, অনলাইন ও ইলেকট্রনিক—তিন মাধ্যমেই তাঁর রয়েছে দীর্ঘ কাজের অভিজ্ঞতা। সাম্প্রতিক সময়ে সাংবাদিকতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর প্রভাব, সম্ভাবনা এবং এর নৈতিক সংকট নিয়ে চারদিক২৪ ডট কম এর সাথে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. রাফি খান।
চারদিক২৪: আপনি দীর্ঘ সময় ধরে প্রিন্ট, অনলাইন এবং বর্তমানে টেলিভিশনে সাংবাদিকতা করছেন। আপনার অভিজ্ঞতার আলোকে যদি বলেন, এআই বর্তমান সময়ের সাংবাদিকতায় ঠিক কী ধরনের পরিবর্তন নিয়ে এসেছে?
মামুনুর রহমান: সাংবাদিকতা মানেই তো প্রতিনিয়ত নতুন চ্যালেঞ্জ আর সত্য অনুসন্ধানের নেশা। আমার দৃষ্টিতে, এআই এই পেশায় একটি বহুমাত্রিক বিপ্লব নিয়ে এসেছে। যে বিশাল পরিমাণ ডেটা বিশ্লেষণ করতে আগে আমাদের দিনের পর দিন সময় লাগত, এআইয়ের কল্যাণে তা এখন চোখের পলকে সম্ভব হচ্ছে। এটি শুধু দ্রুত সংবাদ তৈরিতেই নয়, বরং সোশ্যাল মিডিয়া থেকে ব্রেকিং নিউজের সোর্স খুঁজে বের করা কিংবা অডিও-ভিডিওর দ্রুত ট্রান্সক্রিপশন তৈরিতে এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে গাণিতিক বা ছকবাঁধা প্রতিবেদন, যেমন—খেলার স্কোর কিংবা শেয়ার বাজারের খবর তৈরিতে এআই দারুণ কার্যকর।
চারদিক২৪: বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমগুলোতে এআই ব্যবহারের বর্তমান চিত্রটা কেমন? আমরা কি বৈশ্বিক গতির সাথে তাল মেলাতে পারছি?
মামুনুর রহমান: ব্যক্তিগত পর্যায়ে সাংবাদিকদের মধ্যে এআই টুল ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। অনেকে রিসার্চ বা খসড়া তৈরিতে এটি ব্যবহার করছেন। তবে প্রাতিষ্ঠানিক বা নিউজরুম-পর্যায়ে এর আনুষ্ঠানিক অন্তর্ভুক্তি এখনও সীমিত। হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এটি কার্যকরভাবে শুরু করেছে। তবে আশার কথা হলো, বিভিন্ন কর্মশালা ও কোর্সের মাধ্যমে সাংবাদিকদের এআই-সম্পর্কিত দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আমরা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও রূপান্তরের প্রক্রিয়াটি শুরু হয়ে গেছে।
চারদিক২৪: এআই ব্যবহারে সময় বাঁচে ঠিকই, কিন্তু তথ্যের নির্ভুলতা বা ‘ফ্যাক্ট-চেকিং’-এর ক্ষেত্রে এটি কতটা নির্ভরযোগ্য?
মামুনুর রহমান: দেখুন, এআই সিস্টেম মূলত অ্যালগরিদম ও ডেটার ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেয়। যদি উচ্চমানের ডেটা দিয়ে একে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, তবে এটি মানুষের চেয়েও নিখুঁত ফলাফল দিতে পারে কারণ এতে মানবিক পক্ষপাতিত্ব কম থাকে। তবে বড় শর্ত হলো—এআইকে নিয়মিত নজরদারিতে রাখতে হবে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় এটি বড় বড় নথির অসঙ্গতি খুঁজে বের করতে পারলেও, চূড়ান্ত যাচাই ও সিদ্ধান্তের দায়িত্ব কিন্তু একজন রক্ত-মাংসের সাংবাদিকেরই। এআই কেবল একজন দক্ষ সহকারী হতে পারে, বিকল্প নয়।
চারদিক২৪: সাংবাদিকতায় এআই ব্যবহারের নৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো কী কী? বিশেষ করে ‘ডিপফেক’ বা ভুল তথ্য ছড়ানোর যে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, সেটিকে আপনি কীভাবে দেখেন?
মামুনুর রহমান: এটিই এখনকার সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা। এআই অনেক সময় কাল্পনিক তথ্য বা ‘হ্যালুসিনেশন’ তৈরি করে। এছাড়া ডিপফেক প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি করা ভুয়া ছবি বা ভিডিও মুহূর্তেই গুজব ছড়িয়ে দিতে পারে। অ্যালগরিদমে যদি কোনো পক্ষপাতিত্ব লুকিয়ে থাকে, তবে সংবাদের নিরপেক্ষতা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। আবার অন্যের তথ্য অনুমতি ছাড়া ব্যবহারের ফলে কপিরাইট জটিলতাও তৈরি হচ্ছে। সবচেয়ে বড় সংকট হলো দায়বদ্ধতা—এআই-এর তৈরি কোনো ভুলের দায়ভার কে নেবে? এই প্রযুক্তিতে মানুষের মতো নৈতিক বিচারবোধ বা সংবেদনশীলতা নেই, তাই এটি যেমন আশীর্বাদ, ঠিকভাবে ব্যবহার না করলে তেমন অভিশাপও হতে পারে।
চারদিক২৪: অনেক সাংবাদিকের মনেই সংশয় রয়েছে যে, এআই কি ভবিষ্যতে তাঁদের পেশার জন্য হুমকি হয়ে উঠবে?
মামুনুর রহমান: আমি মনে করি না এআই পুরোপুরি হুমকি। তবে এটি কাজের ধরন বদলে দেবে। যেসব কাজ ছকবাঁধা বা ডেটানির্ভর, সেগুলো হয়তো এআই দখল করে নেবে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের রিপোর্টিং, মানবিক বিশ্লেষণ, নৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং গভীর অনুসন্ধানী কাজে মানুষের জায়গা নেওয়া এআই-এর পক্ষে সম্ভব নয়। তাই চাকরি হারানোর ভয় না পেয়ে বরং এআই টুল ব্যবহারে দক্ষ হয়ে ওঠাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
চারদিক২৪: এআই যুগের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?
মামুনুর রহমান: নতুনদের জন্য আমার পরামর্শ হবে—এআইকে আপনার প্রতিযোগী না ভেবে একজন ‘স্মার্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট’ হিসেবে দেখুন। ডেটা লিটারেসি, ডিজিটাল ভেরিফিকেশন এবং এআই টুল ব্যবহারের দক্ষতা অর্জন করা এখন সময়ের দাবি। তবে প্রযুক্তির ভিড়ে যেন আপনার মানবিক সংবেদনশীলতা এবং নৈতিকতা হারিয়ে না যায়। মনে রাখবেন, তথ্যের ভিড়ে নির্ভরযোগ্যতা বা ‘ক্রেডিবিলিটি’ই হবে ভবিষ্যতের সাংবাদিকতার আসল শক্তি। প্রযুক্তি হয়তো দ্রুত খবর দিতে পারে, কিন্তু বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের জন্য মানুষের সততা ও মেধার বিকল্প নেই।
চারদিক২৪: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
মামুনুর রহমান: আপনাকেও ধন্যবাদ।
