মো. রাফি খান: রানা প্লাজা ধস ও তাজরীন গার্মেন্টসের অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের পূর্ণ ক্ষতিপূরণ, আজীবন চিকিৎসা, স্থায়ী পুনর্বাসন ও দায়ীদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি ৭ দফা দাবি জানিয়েছেন শ্রমিকেরা। একই সঙ্গে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আশুলিয়ায় তাজরীন ফ্যাশনের ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তাঁরা।
আজ শনিবার বেলা ১১টায় ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাব–এর জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, রানা প্লাজা ধস ও তাজরীন গার্মেন্টসের অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকেরা আইএলও কনভেনশন–১২১ অনুযায়ী ন্যায্য ক্ষতিপূরণ, উন্নত চিকিৎসা, বিকল্প কর্মসংস্থান ও স্থায়ী পুনর্বাসনের দাবিতে গত বছরের ২৩ নভেম্বর থেকে আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে তাজরীন ফ্যাশনের পোড়া ভবনে অবস্থান করছেন।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, এক যুগ পেরিয়ে গেলেও অনেক আহত শ্রমিক এখনো সুচিকিৎসা পাচ্ছেন না। কেউ পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, কেউ কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন, আবার অনেক পরিবার একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে চরম দুর্দশার মধ্যে আছে। ট্রাস্ট ফান্ড থেকে যে চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলেও অভিযোগ করা হয়।
শ্রমিক নেতারা বলেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প আজ বিশ্বের দরবারে যে অবস্থানে পৌঁছেছে, তার পেছনে শ্রমিকদের ঘাম ও রক্ত জড়িয়ে আছে। অথচ সেই শ্রমিকেরাই এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাঁরা বলেন, রানা প্লাজা ও তাজরীন ট্র্যাজেডি শুধু দুর্ঘটনা নয়, শ্রমিক নিরাপত্তা ও মানবাধিকারের প্রশ্নে রাষ্ট্র, মালিকপক্ষ ও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সম্মিলিত ব্যর্থতার প্রতীক।
সংবাদ সম্মেলনে ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর তাজরীন ফ্যাশনে অগ্নিকাণ্ডে ১১৪ শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনা এবং ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজা ধসে ১ হাজার ১৩৪ জনের বেশি শ্রমিক নিহত ও আড়াই হাজারের বেশি শ্রমিক আহত হওয়ার প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়। বক্তারা বলেন, ভবনে ফাটল দেখা দেওয়ার পরও শ্রমিকদের জোর করে কাজে পাঠানো হয়েছিল। তাই এটিকে ‘পরিকল্পিত শ্রমিক হত্যা’ হিসেবে উল্লেখ করেন তাঁরা।
লিখিত বক্তব্যে অভিযোগ করা হয়, এত বছর পরও অধিকাংশ আসামি জামিনে মুক্ত এবং বিচার কার্যক্রম দৃশ্যমান অগ্রগতি পায়নি। বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান শ্রমিক নেতারা।
সংবাদ সম্মেলন থেকে ঘোষিত ৭ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের পুনর্মূল্যায়ন করে পূর্ণ ক্ষতিপূরণ ও আজীবন চিকিৎসা নিশ্চিত করা, এমপ্লয়মেন্ট ইনজুরি স্কিমে অন্তর্ভুক্তি, দায়ীদের দ্রুত বিচার, অনুদানের হিসাব প্রকাশ, দায়ী মালিকদের সম্পদ অধিগ্রহণ করে পুনর্বাসন, রানা প্লাজার সামনে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ এবং ২৪ এপ্রিলকে ‘শ্রমিক হত্যা দিবস’ ঘোষণা।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার দাবিও জানান শ্রমিকেরা। তাঁদের ভাষ্য, রানা প্লাজা ও তাজরীনের কারখানাগুলোতে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পোশাক উৎপাদন হতো। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণে এসব ব্র্যান্ডেরও নৈতিক ও আইনি দায় রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলন থেকে সরকারের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া, বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে প্রচারাভিযান, সভা–সমাবেশ ও মিছিলের কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়।
