বিগ ব্যাং এর আদ্যোপান্ত

ফিচার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

মোহাম্মদ জাওয়াদ ইসলাম

 

প্রতি রাতে যখন আমরা আকাশের তারা দের দিকে তাকাই তখন আমরা যেন এক মহাজাগতিক টাইম মেশিনের দিকে তাকিয়ে থাকি। দূরবর্তী ছায়াপথগুলো থেকে আসা আলো পৃথিবীতে পৌঁছানোর আগে লক্ষ লক্ষ এমনকি কোটি কোটি বছর ধরে ভ্রমণ করে। এক অর্থে জ্যোতির্বিজ্ঞান হল আলো দিয়ে লেখা ইতিহাস। আর সেই ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মানবজাতির অন্যতম উল্লেখযোগ্য বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ‘বিগ ব্যাং’

 

বিগ ব্যাং শুধু একটি নাটকীয় বিস্ফোরণই নয় বরং এটি আমাদের পরিচিত স্থান, কাল, পদার্থ এবং শক্তির সূচনার প্রতীক। গত শতাব্দীতে বিজ্ঞানীরা এটিকে একটি দুঃসাহসিক অনুমান থেকে মহাবিশ্বের উৎপত্তির প্রধান ব্যাখ্যায় রূপান্তরিত করেছেন। তবুও অসাধারণ অগ্রগতি সত্ত্বেও কিছু গভীর প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি, বিগ ব্যাং এর আগে কি ঘটেছিল? এটি কেন ঘটেছিল? এবং এখন থেকে কোটি কোটি বা এমনকি ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন বছর পর মহাবিশ্বের ভাগ্যে কি অপেক্ষা করছে?।

বিগ ব্যাং এর গল্প শুধু সুদূর অতীতের নয় বরং এটি বর্তমান এবং ভবিষ্যতেরও গল্প। বিংশ শতাব্দীর আগে বেশিরভাগ বিজ্ঞানী বিশ্বাস করতেন যে মহাবিশ্ব মোটামুটি একই রূপে সর্বদা বিদ্যমান ছিল। এটিকে চিরন্তন ও অপরিবর্তনীয় বলে মনে হতো। ১৯১৫ সালে অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্বের মাধ্যমে সেই ধারণাটি ভেঙে পড়তে শুরু করে। আইনস্টাইনের সমীকরণগুলো থেকে বোঝা যাচ্ছিল যে, মহাবিশ্ব হয় প্রসারিত হবে নয়তো সংকুচিত হবে। যে ধারণাটি তিনি প্রথমে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। একটি ‘স্থির মহাবিশ্ব’-এর ধারণাটি বজায় রাখার জন্য তিনি “কসমোলজিক্যাল কনস্ট্যান্ট” বা মহাজাগতিক ধ্রুবক প্রবর্তন করেন। যাকে তিনি পড়ে তার সবচেয়ে বড় ভুল বলে বর্ণনা করেন। প্রকৃত যুগান্তকারী আবিষ্কারটি আসে 1920 এর দশকের শেষের দিকে। যখন আমেরিকান জ্যোতির্বিজ্ঞানী এডউইন হাভেল আবিষ্কার করেন যে দূরবর্তী ছায়াপথ গুলো আমাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। অর্থাৎ, মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছিল। বিজ্ঞানীরা যুক্তি দেখান যে, যদি ছায়াপথ গুলো আজ একে অপরের থেকে দূরে সরে যেতে থাকে, তবে এক সময় তারা নিশ্চয়ই অনেক কাছাকাছি অবস্থান করত হয়তো। মহাজাগতিক ঘড়িকে যথেষ্ট পেছনে নিয়ে গেলে সবকিছু প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে এক অকল্পনীয় এবং আশ্চর্যজনক এক ঘটনা ঘটে, প্রসারিত হওয়া মহাবিশ্ব সংকুচিত হয়ে একটি বিন্দুতে এসে মিলিত হয়। সেই মুহূর্তটিকে আমরা বিগ ব্যাং বলে থাকি।

বিগ ব্যাং এর এক সেকেন্ডের ক্ষুদ্র ভগ্নাংশের মধ্যেই ‘কসমিক ইনফ্লেশন’ নামে পরিচিত একটি ঘটনা ঘটার সময় মহাবিশ্ব প্রসারিত হতে থাকে। ট্রিলিয়ন ডিগ্রী থেকে তাপমাত্রা কমার সাথে সাথে মৌলিক কণাগুলোর উদ্ভব ঘটে। কোয়ার্ক একত্রিত হয়ে প্রোটন এবং নিউট্রন গঠন করে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই হাইড্রোজেন এবং হিলিয়াম মিলিত হয়ে প্রথম পারমাণবিক নিউক্লিয়াস তৈরি করে। পরবর্তী ৩৮০০০০ বছর ধরে মহাবিশ্ব একটি অত্যন্ত উত্তপ্ত প্লাজমা হিসেবে সংগঠিত ছিল। যেখানে আলো অবাধে চলাচল করতে পারত না। অবশেষে তাপমাত্রা এতটাই কমে আসে যে ইলেকট্রন পারমাণবিক নিউক্লিয়াসের সাথে যুক্ত হয়ে প্রথম পরমাণু তৈরি করে।

 

মহাবিস্ফোরণের পর মহাবিশ্ব এক দীর্ঘ অন্ধকার যুগে প্রবেশ করে। মহাকর্ষ ভর ধীরে ধীরে হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের বিশাল মেঘ সংগ্রহ করতে থাকে। কয়েক কোটি বছর পর, নক্ষত্রগুলো প্রথমবারের মতো জ্বলে ওঠে এবং মহাবিশ্বকে আবারও আলোয় ভরিয়ে দেয়। সেই আদি নক্ষত্রগুলো মহাজাগতিক কারখানায় পরিণত হয় যা নিউক্লিয় সংযোজনের মাধ্যমে কার্বন, অক্সিজেন, সিলিকন এবং লোহার মতো ভারী মৌল তৈরি করতে থাকে। যখন বিশাল নক্ষত্র গুলো সুপারনোভা হিসেবে বিস্ফোরিত হয় তখন তারা এই মৌলগুলোকে মহাকাশের চারিদিকে ছড়িয়ে দেয়।

 

যদিও বিগ ব্যাং কোটি কোটি বছর আগে ঘটেছিল, তবে এর প্রভাব আজও আমাদের জীবনকে প্রভাবিত করে চলেছে। মহাবিশ্ব এখনো প্রসারিত হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে পর্যবেক্ষণ থেকে জানা যায় যে এই প্রসারণ ধীর হওয়ার পরিবর্তে আরো ত্বরান্বিত হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা এই অপ্রত্যাশিত আচরণের কারণ হিসেবে ‘ডার্ক এনার্জি’ নামে পরিচিত একটি রহস্যময় ঘটনাকে দায়ী করে থাকেন। সমানভাবে রহস্যময় হলো ‘ডার্ক মেটার’। একটি অদৃশ্য পদার্থ যা আলো নির্গত বা প্রতিফলিত করে না। কিন্তু ছায়াপথ গুলোর উপর মহাকর্ষীয় প্রভাব ফেলে। ডার্ক মেটার এবং ডার্ক এনার্জি একত্রে মহাবিশ্বের প্রায় ৯৫ শতাংশ গঠন করে যার ফলে সাধারণ পদার্থ যেমন নক্ষত্র, গ্রহ এবং মানুষ মহাজাগতিক বাস্তবতার একটি ক্ষুদ্র অংশ হয়ে রয়েছে।

আধুনিক টেলিস্কোপ মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে আমূল পরিবর্তন করেছে। হাবল স্পেস টেলিস্কোপ কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরের ছায়াপথ পর্যবেক্ষণ করে জ্যোতির্বিজ্ঞানে বিপ্লব এনেছে। অতি সম্প্রতি, জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ মহাজাগতিক ইতিহাসের আরো গভীরে দৃষ্টিপাত করেছে, যা বিগ ব্যাং এর অল্প পরেই গঠিত হওয়া আশ্চর্যজনকভাবে পরিণত ছায়াপথগুলোকে উন্মোচন করেছে।

এত সফলতা সত্ত্বেও বিগ ব্যাং তত্ত্ব সবকিছুর উত্তর দেয় না। সবচেয়ে বড় রহস্য গুলোর মধ্যে একটি হল একেবারে শুরুতে কি ঘটেছিল। পার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলো বিগ ব্যাং এর পর থেকে, মাত্র এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশ সময় পর্যন্ত মহাবিশ্বকে বর্ণনা করতে পারে। কিন্তু একেবারে শুরুর বিন্দুতে এসে সেগুলো অকার্যকর হয়ে পড়ে। বিগ ব্যাং এর মাধ্যমে কি সময়ের সূচনা হয়েছিল যা “এর আগে কি ছিল?” প্রশ্নটিকে অর্থহীন করে তোলে। কিছু তাত্ত্বিক মডেল অনুযায়ী মহাবিশ্ব হয়তো অবিরাম প্রসারণ ও সংকোচন চক্রের মধ্য দিয়ে যায়। অন্যরা প্রস্তাব করে যে আমাদের মহাবিশ্ব কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশন থেকে উৎপন্ন হয়েছে। আরেকটি অমীমাংসিত ধাঁধা হলো পদার্থ ও প্রতিপদার্থের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা। মহাবিস্ফোরণের ফলে উভয়েরই সমান পরিমাণ উৎপন্ন হওয়ার কথা ছিল। অথচ আমাদের মহাবিশ্ব প্রধানত পদার্থ দিয়েই গঠিত। এই বিষয়টিকে নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখনো গবেষণা করে যাচ্ছে, তবে এর কোন সদুত্তর পাওয়া সম্ভব হয়নি।

 

বিগ ব্যাং কে প্রায়শই সবকিছুর সূচনা হিসেবে বর্ণনা করা হয়। কিন্তু অনেক দিক থেকে এটি আমাদের কৌতূহলেরও সূচনা। এটি সেই বিন্দুকে চিহ্নিত করে যেখানে বিজ্ঞান ও কল্পনা মিলিত হয়। যেখানে পর্যবেক্ষণ রহস্যের মুখোমুখি হয়। বিগ ব্যাং তত্ত্বকে বোঝার চেষ্টায় আমরা শেষ পর্যন্ত নিজেদেরকেই বোঝার চেষ্টা করি যে, আমরা কোথা থেকে এসেছি, আজ আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি এবং এই বিশাল ও নিরন্তর প্রসারিত আকাশের নিচে আমাদের জন্য কি ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *