মুভি রিভিউ: ‘একটি সুতার জবানবন্দী’

বিনোদন

তানিয়া সুলতানা:

কামার আহমাদ সাইমন  তাঁর একটি সুতার জবানবন্দীকে চলচ্চিত্র বলতে রাজি নন, তিনি বরং একে মনোলগ বলতে চান। তবে চলচ্চিত্র সমালোচকদের অনেকেই একে চলচ্চিত্র বলে অভিহিত করেছেন। কামারের খুশি হবার কথা ছিল, কিন্তু তিনি গাইগুই করছেন। নিজের এই কাজকে তিনি ঠিক চলচ্চিত্র বলতে চাননি। একে ঠিক নির্মাতার বিনয় ভাবলে একটু ভুল ভাবা হয়ে যেতে পারে। বিষয়টি কি ইঙ্গিতপূর্ণ? চলচ্চিত্র শব্দটির যে অতি সরলীকৃত এক মানে দাঁড়িয়েছে আমাদের বেশিরভাগের মনে, তা থেকে তিনি একটি সুতার জবানবন্দীকে যেন একটু দূরে রাখতে চান। নির্মাতার এই নারাজি বিষয়টা পাঠক হিসেবে আমার মনে এক মহিমা তৈরি করেছে, যা ছবিটিকে রাজনৈতিকভাবে আরো গুরুত্ববহ করে তোলে।

দর্শক হিসেবে একটি সুতার জবানবন্দীর ডকুমেন্টেশনের তরিকায় আমি আশ্চর্য হয়েছি। বলে রাখা ভালো ২৪ এপ্রিল, ২০১৩ সাভারে রানা প্লাজার ধ্বংস এই ছবিটির কেন্দ্রীয় বিষয়। নির্মাতা ফিকশন করতে পারতেন। এখানে নির্মাতার জন্য চরিত্র নির্মাণের স্বাধীনতা রয়েছে, রযেছে তার কল্পনাকে রূপ দেবার সুযোগ। আর সে সুযোগ আজকের যুগে অবাধ। কিন্তু তিনি বাস্তব থেকে প্রতিটি ঘটনা, প্রতিটি চরিত্র সংগ্রহ করলেন, সে অনুযায়ী গল্প সাজালেন এবং সম্পাদনা করে ছবিটি বানালেন। কামার আহমাদ সাইমনের এইসব ব্যাপারে বিশেষ ঝোঁক। বছরের পর বছর শুট করতে তার আলসেমি নেই। তার চেয়েও ধীর এবং নিবিষ্ট মনে তিনি রিসার্চ করে থাকেন। চারিদিকে হাজারো ফুটেজ, হাজারো দলিল রানা প্লাজাকে নিয়ে। এর কোনো কোনোটি এই বাংলার মানুষ বোধহয় চাইলেও ভুলতে পারবেন না–আইকনিক হয়ে আছে। ফলে মনোলগ বানাতে সেগুলো কাজে লাগানো যায়। এটা একইসাখে সময় ও শ্রম সাশ্রয়ী, অধিকতর বিশ্বাসযোগ্য। কিন্তু নির্মাতা সহজ পথে হাঁটলেন না।

কামার আর সারা আফরীনের আগের কাজ ‘শুনতে কি পাও!’ দেখে মনে হয়েছে, এই নির্মাতাদ্বয় চরিত্র নির্মাণ করতে পছন্দ করেন, তাদের দৈনন্দিন জীবনের ভেতর দিয়ে তুলে আনতে চেষ্টা করেন একেকটি গল্প। আর এই জীবনগাঁথাকে ঘিরে থাকা রাজনীতি। এদের রিসার্চ এতই পোক্ত যে ছবি দেখলে দর্শকের মনে হবে, আগে থেকে প্রতিটি ঘটনার স্ক্রিপ্টিং করে পরে শুট করা হয়েছে। ফলে দর্শকের আলাদা করে মাথায় রাখার দরকারই নেই এটা ঠিক ফিকশন নাকি ননফিকশন।

তবে পরিচালকের ভাষ্যমতে একটি সুতার জবানবন্দীতে সেভাবে চরিত্র নির্মাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন তিনি। অথচ ছবিটি দেখলে দর্শক ঠিকই চরিত্র খুঁজে পাবেন। আসলে চরিত্রটি দর্শক নিজে। কিংবা কামারের ক্যামেরাই এখানে একটি চরিত্র যার মধ্য দিয়ে দর্শক মুখোমুখি হতে থাকেন বিভিন্ন প্রটাগনিস্টের সাথে। ক্যামেরা কিংবা দর্শক সুতার মত বিভিন্ন ঘটনা, কথোপকথন আর ইমেজকে একত্র  করতে চাইবে। অথচ ক্যামেরা যেন পুরো প্রতিফলনটা খুঁজে পায় না, সে যেন একেকটি ভাঙা আয়নায় একেকটি প্রতিফলন তুলে আনে। এই ক্যামেরার গতি কম, এর ফ্রেমে সেধরনের বৈচিত্র্যও খুঁজে পাওয়া যায় না খুব একটা। একে কামারের ব্যর্থতা মনে হয় না। বদলে ঘনীভূত হয়ে ওঠে এক জটিল রাজনৈতিক চরিত্র। পর্দায় তাই চরিত্রগুলোকে আর সম্পূর্ণ আঁকা হয় না।  বরং কোথাও কোথাও ক্যামেরা আড়ি পাতে, সন্তর্পণে চলে এবং সেল্ফ সেন্সরশিপের ভেতর থেকেও ছবিটি শেষপর্যন্ত দর্শককে স্তম্ভিত করে দেয়। এবং দর্শককে এক জটিল পরিস্থিতির সম্মুখীন করে তোলে। কাঁচের উল্টোপাশ থেকে আমাদের রোজকার জীবনে স্বাভাবিক হয়ে যেতে পারাকে খোঁচা দিতে মুহূর্তের একটি ফ্রেম অস্বস্তি দেয়। প্রটাগনিস্টরা যখন কথা বলেন, সত্যরা শরের মতন একের পর এক আসতে থাকলে ক্যামেরার বৈচিত্র্যহীনতা তুচ্ছ হয়ে যায়। তখনই সিকুয়েন্সের বদল ঘটে, আসে নতুন চরিত্র।

আমরা একের পর এক চরিত্র দেখি। এটি একটি পেঁয়াজের মতো বিষয় আরো খোসা ছাড়ালে নতুন আরেকটা মাত্রাই যোগ হতে পারে শুধু কিন্ত শেষ পর্যন্ত ফলাফল আশাব্যঞ্জক কিছু নয়। দর্শকের আহত মগজে মরফিন ঢেলে দিতে প্রস্তুত হয় অদ্ভুত সব শব্দ। এতদিনে দায়সারা ভাবটিতে অস্বস্তি এনে দেবে নেপথ্য শব্দগুলো। আমাদের ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা আর্তনাদগুলো কানে বাজতে থাকবে। টুকরো টুকরো বাস্তবতার কাছে সদ্য শোকগ্রস্ত স্তম্ভিত দর্শক– তার সামনে অর্থ্যাৎ পর্দায় হাজির হন শিল্পী  দিলারা বেগম জলি। কামারের মনোলগের মতন তিনিও তার জায়গা থেকে দর্শককে আমন্ত্রণ করেন তার প্রদর্শনীতে। ভোগবাদী সমাজের সামনে হাজির করেন বড় এক ডাইনিং টেবিল, সেখানে দূর্ঘটনার টুকরো টুকরো বাস্তবতার সুতো খুলে দেন। রানা প্লাজাকে ঘিরে থাকা একেকটি মানুষ, মানুষটার চুলের ক্লিপটা কিংবা তার চারপাশটা যেন একেকটি সুতা, একেকটি বাস্তবতা! জলির কাজ কিংবা কামারের ক্যামেরা– ওরা এখানে এসে প্যারালাল হয়ে যায়।

স্পেকট্রাম, তাজরীন কিংবা রানা প্লাজায় মানুষ পুড়েছে, মরেছে। ইন্ডাস্ট্রির প্রতিটি ধাপে, পর্যায়ের অব্যবস্থাপনা, অনিশ্চয়তা শেষ পর্যন্ত নিম্নগামী। বিশ্বের কোথাও কেউ সস্তায় কাপড় পড়বে বলে গরীব দেশের এলিট শ্রেণী তার নিজের দেশের মানুষের শ্রম কিনে নিচ্ছে তার চেয়েও কম দামে। সেখানে কোনো এক রানা তো একা ভিলেন নয়। প্রত্যেকটি সুতা ধরে ধরে টান দিতে গিয়ে বোঝা গেল। এই মানুষগুলো, তাদের মৃত্যু এই গরীবদেশে শেষ পর্যন্ত কোনো মাইনেই রাখে না।

সব সুতো ধরে ধরে নির্মাতার এই যে একটি প্রচেষ্টা–সবার জবান ফ্রেমে বন্দী  করার– সেখানে নির্দিষ্ট কোনো সুতোকে চিহ্নিত করা গেল না। তাহলে নাম ‘একটি সুতোর জবানবন্দী  কিভাবে হয়। এখানে একটি কেন? একেকটি হলে ঠিক ছিল। নামে নির্মাতার এতবড় ভুল? নাকিএকদম শেষে এসে বুঝবো নামকরণের স্বার্থকতা হলো কি হলো না!

তানিয়া সুলতানা: স্টামফেোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমে অধ্যয়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *