দেড়শো বছরের পুরোনো গ্রাম ভাকুর্তা

ফিচার

আহমদ মানিক

১৫০ বছরের পুরোনো গ্রাম ভাকুর্তা । এ গ্রামের প্রতিটি ঘরের উঠোন, দরজা, ঘরের ভিতরজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অলঙ্কার তৈরির সরঞ্জাম। বেশিরভাগ বাড়ির বারান্দায় উজ্জ্বল আলোয় উঁকি দিচ্ছে আগুনের ফুলকি। পুরো গ্রামেই চলছে এ কর্মযজ্ঞ। শত বছরের ঐতিহ্য পিতৃপুরুষের পেশাকে আগলে রাখা একটি জনপদ ভাকুর্তা। তাদের জীবনের চিত্রটা সুখকর না হলেও তারা এই পেশা আগলে রেখেছেন জীবিকা ও পিতৃপুরুষের টানে।

আগে কেরোসিনের প্রদীপে ফু দিয়ে এই কাজ করা হতো, এখন সে জায়গায় এসেছে গ্যাস টর্চ। এ রকম আরও কিছু যন্ত্র এসেছে, তবে বেশির ভাগ কাজ এখনও হাতেই করতে হয়।

এই ব্যবসা প্রাচীন সময় থেকে চলে আসছে। এই গ্রামের ছেলে বুড়ো প্রায় সবাই গহনা বানানোর কাজ করে। প্রায় ৮ হাজার নারী-পুরুষ গয়না বানানো এই কাজের সাথে যুক্ত। একটা সময় ভালো ইনকামের উৎস ছিল এই ব্যবসা। কিন্তু কারিগরদের আক্ষেপ কারণ ভারত থেকে চোরাই অর্থে আসা কম মান এবং কম দামের পণ্যের কারণে তাদের চাহিদা কমে যাচ্ছে।

কিন্তু তাদের হাতে বানানো গুলোই ঐতিহ্যবাহী গহনা। রুপা, তামা, কাসা এবং পিতল ইত্যাদিই হলও এই গহনার মূল উপাদান। গয়না গুলো বানানোর পরে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দোকানী বা ব্যবসায়ীরা নিয়ে যায়। ঢাকার নিউমার্কেট, আজিজ সুপার, চাঁদনী চকসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের প্রায় সব বড় শপিং মলের গয়না আসে এই গ্রাম থেকে। মার্কেটগুলোতে সিটি গোল্ড বা অ্যান্টিক নামে এসব গয়না বিক্রি হয়। ডিজাইন এবং উপাদান ভেদে দাম কম বেশি হয়ে থাকে। এখান থেকে যেমন গহনা কেনা যায় তেমনি চাইলে নিজেদের ডিজাইন দিয়েও বানিয়ে নেয়াও যায়।

 

মূলত উৎসব ও বিশেষ কোনো দিবস কেন্দ্র করে এর চাহিদা বেড়ে যায়। জানা যায়, ’৮০-এর দশকে এই বাজারে শুধুই সোনা ও রুপার গয়না তৈরি হতো। কিন্তু কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি ও উপযুক্ত মজুরি না পাওয়াসহ নানা কারণে ’৯০-এর দশকের পর থেকে কারিগররা সোনা ও রুপার অলঙ্কার তৈরি থেকে সরে আসেন। এখন বেশির ভাগ কারিগর ঝুঁকে পড়েছেন ইমিটেশনের গয়না তৈরির দিকে। তামার ব্যবহার বেশি হলেও পিতল ও দস্তা দিয়েও গয়না তৈরি করেন এই কারিগররা।

সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ঠুক ঠাক শব্দে নানা ধরনের গয়না তৈরিই তাদের পেশা। এই জনপদকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে গয়নাশিল্প। এ কাজে এত মানুষ যুক্ত হওয়ার কারণ রোদ-বৃষ্টি-বাদলের মধ্যেও কাজ চলে সমান তালে। বাড়ির বউ-ঝিয়েরাও গৃহস্থালি কাজের ফাঁকে করতে পারেন এ কাজ। পড়ালেখার ফাঁকে ফাঁকে যুক্ত হয় শিক্ষার্থীরা। অপরিসীম ধৈর্যের সঙ্গে একটার সঙ্গে আরেকটার সংযোগ ঘটিয়ে তা নান্দনিক গয়নায় রূপ দেন তারা।

প্রতিটি ঘরের উঠোন, দরজা ও ঘরের ভেতরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অলঙ্কার তৈরির সরঞ্জাম। বেশির ভাগ বাড়ির বারান্দায় চলছে গয়না তৈরির কাজ। পুরো গ্রামেই চলছে এ কর্মযজ্ঞ। ছেলে-বুড়ো, মা-মেয়ে-বউ সবাই ব্যস্ত গলার হার, হাতের চুড়ি, কানের দুল, ঝুমকা, চেন, পায়েল ও নূপুর তৈরিতে। রাস্তার পাশে, বাজারে বাজারে গড়ে উঠেছে গয়নার কারখানা ও দোকান। এ দৃশ্য সাভারের হেমায়েতপুরের ভাকুর্তা গ্রামের। তবে এসব আকর্ষণীয় অলংকার সোনা কিংবা রুপা দিয়ে নয়, বরং তৈরি হয় তামা, পিতল, দস্তার মত ধাতু দিয়ে। গ্রামে থাকা প্রায় ১০ হাজার লোক দীর্ঘদিন ধরে এই পেশার সাথে যুক্ত।

ব্রিটিশ আমল থেকেই এখানকার মানুষ গয়না তৈরিকে বিকল্প পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে। শত বছরের ঐতিহ্য ও পিতৃপুরুষের এই পেশাকে এখনো আগলে রেখেছে তারা। প্রতিটি পরিবারের কমপক্ষে একজন সদস্য এই পেশায় জড়িত রয়েছেন। দিনে দিনে এসব গয়নার চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় পুরুষের পাশাপাশি ভাকুর্তায় নারী সদস্যরাও সমানতালে অলঙ্কার তৈরির কাজ করে যাচ্ছেন। ঢাকার বিভিন্ন নামি দামি মার্কেটসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বড় শপিং মলে যেসব গয়না দেখে সকলে আকৃষ্ট হয়, তাঁর অধিকাংশই সরবরাহ হয় এই গ্রাম থেকে।

শুধু দেশে নয়, এখানকার গহনা যাচ্ছে বিদেশেও। বছরে গড়ে প্রায় আড়াই কোটি টাকার গয়না তৈরি হয় এ গ্রামে। উৎসব ও বিশেষ কোনো দিবসকে কেন্দ্র করে এসব গহনার চাহিদা বেড়ে যায়। ভাকুর্তায় গ্রামের নামেই গড়ে উঠেছে গয়না বাজার। সেখানে রয়েছে বিরাট একটি বটগাছ। সেই বটগাছ ঘেঁষেই রয়েছে সারি সারি গয়নার দোকান। কিছু পাকা, কিছু আধা পাকা, আবার কিছু টিনের ঘর। পুরো ইউনিয়নে কমপক্ষে এমন ২৫০ থেকে ৩০০টি দোকান রয়েছে।

আশির দশক পর্যন্ত শত বছরের প্রশিদ্ধ এই গয়না গ্রামে শুধুই সোনা ও রুপার অলংকার তৈরি করা হতো। কিন্তু কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি ও উপযুক্ত মজুরি না পাওয়াসহ, নানা কারণে নব্বইয়ের দশকের পর থেকে কারিগররা সোনা ও রুপার অলঙ্কার তৈরি থেকে সরে আসেন। এখন বেশির ভাগ কারিগর ঝুঁকে পড়েছেন ইমিটেশনের গয়না তৈরির দিকে। কাজটি আগে কেবল এখানকার সনাতন ধর্মাবলম্বীরাই করতেন। কিন্তু ধীরে ধীরে মুসলমানেরাও এটিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

ভাকুর্তায় তৈরি হওয়া ২০০ থেকে এক হাজার টাকার গয়না চুড়ান্ত ফিনিশিং দেওয়ার পর, ঢাকার নামি দামি শপিংমলে বিক্রি হয় সর্বনিম্ন দুই হাজার টাকা থেকে দশ হাজার টাকায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গয়নার অবকাঠামো তৈরি করা হয় এখানে। পলিশ, রঙ এবং পুথি – পাথর বসানোর কাজ গুলো করা হয় অন্য জায়গায়। এখানে কারিগররা হাতে গয়না তৈরি করে। নিজেদের দক্ষতা ও পরিশ্রম দিয়ে কাজ করেন অধিকাংশ কারিগর। তাই বিদেশ থেকে আসা মেশিনে গড়া গয়নার চেয়ে কিছুটা বাড়তি মুজুরি নেয় তারা। অবশ্য দিনে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা কাজ করে তাদের আয় হয় মাত্র ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা।

আকাশছোঁয়া দামের কারণে অনেকের পক্ষে সোনার গয়না কেনা সাধ্যের বাইরে। তাই তামা-পিতলের গয়নাই এখন সম্বল। তবে বর্তমানে বিদেশি তৈরি নিম্নমানের ইমিটেশনের গহনার একচেটিয়া প্রবেশ, হাতে তৈরি গয়নার বাজার নষ্ট করছে। যা এখানকার জনগোষ্ঠীর জীবিকার জন্য হুমকি হয়ে দাড়িয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *