এআই: অভিশাপ নাকি আশীর্বাদ

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

চারদিক২৪ ডেস্ক

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন আর কেবল বিজ্ঞান ভিত্তিক কল্পকাহিনী বা একাডেমিক ল্যাবরেটরীতে গবেষণায় সীমাবদ্ধ নেই। এটি আধুনিক সমাজের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। মানুষের দৈনন্দিন কাজে, যোগাযোগের ক্ষেত্রে, শিক্ষায়, স্বাস্থ্য সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে, ভ্রমণ, এমনকি ক্রিটিকাল থিংকিং এর ক্ষেত্রেও এআই নিজের একক আধিপত্য বিস্তার করে যাচ্ছে। ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট এবং তথ্য পর্যালোচনা করার অ্যালগরিদম থেকে শুরু করে মানুষের ডায়াগনস্টিক এবং সেলফ ড্রাইভিং যানবাহন পর্যন্ত এআই অভূতপূর্ব গতিতে মানব জীবনকে রূপান্তরিত করছে।

 

এআই এর শুভাকাঙ্ক্ষীরা এটিকে দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা এবং জীবনের মান উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি বৈপ্লবিক শক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করলেও; সমালোচকেরা এটিকে মানুষের চাকরিচ্যুত হবার কারণ, নীতিগতভাবে দুর্বল, গোপনীয়তার হ্রাস এবং সামাজিক বৈষম্য সহ আরো নানা গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি বয়ে নিয়ে আসতে পারে বলে সতর্ক করছেন। যেকোনো শক্তিশালী প্রযুক্তির মতোই, এ আই সম্পূর্ণরূপে উপকারী কিংবা সম্পূর্ণরূপে ক্ষতিকারক নয়; এর প্রভাব নির্ভর করবে এটি কিভাবে বিকশিত, নিয়ন্ত্রিত এবং ব্যবহার করা হয় তার ওপর।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রধান সুবিধা এবং অসুবিধা গুলো আলোচনা করার পূর্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ে জেনে নেয়া যাক। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বলতে এমন কম্পিউটার সিস্টেমকে বোঝায় যা সাধারণত, সেই সকল কাজ করতে অভ্যস্ত যেগুলো করতে মনুষ্য বুদ্ধিমত্তার প্রয়োজন পড়ে। অর্থাৎ, মানুষ তার মস্তিষ্ক ব্যবহার করে বা চিন্তা করে যে সকল কাজ করতে পারে, সেই সকল কাজ একটি কম্পিউটার সিস্টেম তৈরি করে কৃত্রিমভাবে করা হয়। যেমন, অভিজ্ঞতা থেকে শেখা, প্যাটার্ন চিনতে পারা, ভাষা বোঝা, সিদ্ধান্ত নেয়া এবং সমস্যা সমাধান করা।

 

সমাজের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এ আই এর সুবিধা:-

১) উৎপাদনশীলতা এবং দক্ষতা বৃদ্ধি: এ আই এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সুবিধাগুলির মধ্যে একটি হলো এটি মানুষের তুলনায় দ্রুত এবং আরও সঠিকভাবে কাজ সম্পন্ন করার ক্ষমতা রাখে। এই সিস্টেমগুলি প্রচুর পরিমাণে ডেটা বিশ্লেষণ করতে পারে, ভিন্ন ভিন্ন কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে করতে পারে এবং ক্লান্তি ছাড়াই ক্রমাগত কাজ করতে পারে। উৎপাদনমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠান গুলোতে, এআই চালিত রোবট গুলি উৎপাদনের গতি বৃদ্ধি করে এবং মানুষের কাজে ত্রুটি হবার আশঙ্কা হ্রাস করে। এছাড়াও অফিসগুলোতে এআইয়ের দ্বারা বিভিন্ন কাজের সময়সূচী নির্ধারণ, ডেটা এন্ট্রি, গ্রাহক সহায়তা এবং নথি বিশ্লেষণমূলক কাজগুলো এআই একাই পরিচালনা করে থাকে যা কর্মীদের আরো সৃজনশীল এবং কৌশলগত কাজে মনোনিবেশ করতে সহায়তা করে। এতে করে ব্যবসা গুলো আরও উৎপাদনশীল হয়ে ওঠে, খরচ হ্রাস প্রায় এবং গ্রাহকদের কাছে পরিষেবা গুলো আরো দক্ষতার সাথে এবং দ্রুততার সাথে সরবরাহ করা সম্ভব হয়।

২) স্বাস্থ্যসেবায় অগ্রগতি: যদিওবা বর্তমানে এআইকে স্বাস্থ্য সেবায় পরিপূর্ণভাবে ব্যবহার করার জন্য এখনো কাজ চলছে। তবুও বর্তমানে বিভিন্ন দেশে যেমন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং জাপানের মত উন্নত দেশগুলোতে এআইয়ের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবার কিছু কিছু বিষয় পরিচালনা করা হয়। এ আই এর মাধ্যমে রোগীর ডায়াগনোসিস পর্যালোচনা করা হয়, ক্যান্সার সহ স্নায়বিক ব্যাধি সনাক্তকরণের ক্ষেত্রে এটি ব্যবহার করা হয়, এমনকি ওষুধ আবিষ্কারের ক্ষেত্রেও এআইকে ব্যবহার করা হচ্ছে। যদিও বা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে স্বাস্থ্য সেবায় এআইয়ের ব্যবহার নেই বললেই চলে।

৩) উন্নত শিক্ষা: এ আই শিক্ষা ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। এ আই পরিচালিত অনলাইন লার্নিং প্লাটফর্ম গুলি শিক্ষাকে আরো সহজ এবং সুদূরপ্রসারী করে তৈরি করেছে। শিক্ষার্থী সহ সকলেই বিভিন্ন এ আই অ্যাপ্লিকেশন দ্বারা ভাষা শিক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করছে। এমনকি বিভিন্ন প্রবলেম সলভিং এআই অ্যাপ্লিকেশন দ্বারা শিক্ষা বিষয়ক বিভিন্ন সমস্যার সমাধান বের করছে।

৪) নিরাপত্তা এবং সুরক্ষা: নিরাপত্তায় এআইয়ের ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে সাইবার স্পেসে হ্যাকিং কিংবা স্প্যাম এর স্বীকার হচ্ছে লাখো লাখো মানুষ। সেখানে এআই এই সকল অপরাধীদেরকে সনাক্ত করতে সহায়তা করছে, যেমন দুবাইতে এআই ডিটেক্টর পুলিশ সিস্টেম তৈরি করা হয়েছে যেটি মানুষের মুখ স্ক্যান করে কাঙ্খিত অপরাধীদেরকে সনাক্ত করার কাজ করে। আবার বাংলাদেশে এ আই ট্রাফিক সিস্টেম এর মাধ্যমে ট্রাফিক আইন ভঙ্গকারীদেরকে মামলার আওতায় আনা হচ্ছে। এছাড়াও সামরিক ক্ষেত্রে এআই রাডার সিস্টেম, ড্রোন এবং মিসাইল সিস্টেম তৈরি করে রাষ্ট্রকে শত্রুপক্ষের আক্রমণ থেকে রক্ষা করা হচ্ছে।

সমাজের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এ আই এর অসুবিধা:-

 

১) চাকরিচ্যুতি এবং বেকারত্ব: এ আই এর সাথে সম্পর্কিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভয়গুলির মধ্যে একটি হল চাকরি হারানোর ভয়। এআই নতুন চাকরি তৈরি করলেও এর জন্য প্রায়শই উন্নত প্রযুক্তিগত দক্ষতার প্রয়োজন হয় যা অনেক কর্মীর থাকেনা। বলা ভালো, সময়ের সাথে সাথে প্রযুক্তির পরিবর্তন হয়, এবং সেই প্রযুক্তির দক্ষতা অর্জন না করলে পরবর্তীতে উদ্ভাবন করা নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। ঠিক এই কারণেই এআইয়ের দ্বারা পুরনো অনেক প্রযুক্তির বিনাশ ঘটলেও এটি নতুন কিছু প্রযুক্তির উদ্ভাবন করেছে। যথোপযুক্ত পুনঃ প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষা কার্যক্রমের ব্যবস্থা করা নাহলে চাকরিচ্যুতি এবং বেকারত্বের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে পারে।

 

২) নৈতিকতার অবক্ষয়: এ আই সিস্টেমগুলো দ্বারা এমন কাজ করা সম্ভব কিংবা সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব যা মানুষের জীবনকে উল্লেখযোগ্য ভাবে প্রভাবিত করতে পারে এবং সমাজে জটিল নৈতিকতার প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারে। আমাদের সমাজে এআই ব্যবহার করে বিভিন্ন মিথ্যা এবং বানোয়াট তথ্য প্রচার করে মানুষের মাঝে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হয়। এআই ব্যবহার করে নারীদের অশ্লীল ছবি তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার একটি প্রবণতা দেখতে পাওয়া যায়। এছাড়াও বিভিন্ন ব্যক্তির ছবি ভিডিও তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে তাদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করার প্রবণতাও বিদ্যমান। আবার এ আই এলগরিদমে পক্ষপাত মূলক বিশ্লেষণ লক্ষ্য করা যায়। এটি যেহেতু ঐতিহাসিক তথ্য ব্যবহার করে থাকে সেক্ষেত্রে বিদ্যমান সামাজিক কুসংস্কারের প্রতিফলিত একটি রূপ প্রায় এর বিশ্লেষণে দেখতে পাওয়া যায়।

৩) গোপনীয়তা এবং নজরদারি: এ আই মূলত ব্যক্তিগত ডিভাইস, অনলাইন কার্যকলাপ এবং পাবলিক স্পেস থেকে তথ্য সংগ্রহ করে থাকে, যা কিনা আমাদের গোপনীয়তা এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে হুমকির সম্মুখীন করে থাকে। প্রায় কোন দেশেই এআই বিষয়ক কোনো আইন বা বিধান না থাকায় প্রতিটি দেশের সরকার তার জনগণের ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করতে পারে ভিন্নমত দমনের ক্ষেত্রে।

 

৪) প্রযুক্তির উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা: এ আই সিস্টেমগুলো যত বেশি শক্তিশালী হচ্ছে এর ওপর মানুষের অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে। যা কিনা মানুষের যুক্তি নির্ভর চিন্তা, সৃজনশীলতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। আবার প্রযুক্তিগত ত্রুটি বা ভুল ডেটা বিশ্লেষণের দ্বারা ভুল এবং অসত্য তথ্য উপস্থাপিত হতে পারে।

এআই পরিচালিত অর্থনৈতিক এবং সামাজিক কাঠামো তৈরি করতে প্রস্তুতির প্রয়োজন। সরকারগুলিকে শিক্ষা এবং দক্ষ জনবল তৈরীর কর্মসূচিতে বিনিয়োগ করা উচিত। এবং গোপনীয়তা রক্ষা, বৈষম্য রোধ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সচ্ছলতা নিশ্চিত করার জন্য শক্তিশালী নিয়ম কানুন তৈরি করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক ভাবে ন্যায় সঙ্গত এআইয়ের উন্নয়নকে উৎসাহিত করতে সহায়তা করতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সমাজের ভবিষ্যৎ গঠনকারী সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম গুলোর একটি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব পূর্ব নির্ধারিত নয় তবে এটিকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সমাজ যখন প্রযুক্তির বিপ্লবের মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে তখন মূল প্রশ্ন হল এআই আমাদের ভবিষ্যৎ গঠন করবে কিনা তা নয় বরং প্রশ্ন হল আমরা কতটা যোগ্যতার সাথে এআই গঠন করতে পারব।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *