ফাইজা নোহান
শুধু গাছ লাগানো নয়, লাগানো গাছগুলো যেন টিকে থাকে, বেড়ে ওঠে এবং পরিবেশে ভূমিকা রাখতে পারে—এই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে প্ল্যান্ট স্কলার (বৃক্ষ-বৃত্তি)। এবার এই উদ্যোগের প্রযুক্তিগত সহযোগী হিসেবে যুক্ত হয়েছে জার্মানিভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্পেসনাস।

গত ১৭ আগস্ট ২০২৬ সাসটেইনেবল রিসার্চ অ্যান্ড কনসালটেন্সি লিমিটেড (এসআরসিএল) ও স্পেসনাসের মধ্যে এ বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এর আওতায় প্ল্যান্ট স্কলারের গাছ পর্যবেক্ষণ, তথ্য সংগ্রহ ও যাচাইয়ের কাজে প্রযুক্তিগত সহায়তা দেবে স্পেসনাস।
প্ল্যান্ট স্কলারের মূল লক্ষ্য শুধু কতগুলো গাছ লাগানো হয়েছে তা গণনা করা নয়। বরং লাগানো গাছগুলোর কতগুলো টিকে আছে, কতটা বেড়ে উঠছে এবং পরিবেশে কী ধরনের ভূমিকা রাখছে ,সেটি নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা। এ বিষয়ে এসআরসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও নগর পরিবেশবিদ আবু জুবায়ের বলেন, ‘বৃক্ষরোপণের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে রোপিত চারার সংখ্যার ওপর নয়, বরং কতটি গাছ টিকে আছে, বেড়ে উঠছে এবং পরিবেশগত ভূমিকা রাখছে তার ওপর।’
গত ২৫ জুন ২০২৬ ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবে আনুষ্ঠানিকভাবে প্ল্যান্ট স্কলারের যাত্রা শুরু হয়। এসআরসিএলের আয়োজনে এবং সেন্টার ফর অ্যাটমোসফেরিক পলিউশন স্টাডিজ (ক্যাপস), ক্লাইমেট ফ্রন্টিয়ার্স ও ফ্লাওয়ারের সহ-আয়োজনে এ উদ্যোগের উদ্বোধন করা হয়। শুরু থেকেই প্ল্যান্ট স্কলারের লক্ষ্য ছিল গাছ লাগানোর পাশাপাশি সেগুলোর দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা ও টিকে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করা।
ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলায় প্ল্যান্ট স্কলারের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। খুলনা, ময়মনসিংহ, বাগেরহাট, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনাসহ বিভিন্ন জেলায় এখন পর্যন্ত ১ হাজারটি গাছ লাগানো হয়েছে। এর মধ্যে ৯১০টি গাছ বর্তমানে ভালো অবস্থায় রয়েছে। অর্থাৎ গাছগুলোর সম্মিলিত টিকে থাকার হার ৯১ শতাংশ। এসব জেলার পাশাপাশি আরও কয়েকটি এলাকাতেও কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
প্ল্যান্ট স্কলারের কার্যক্রমে শুরু থেকেই প্রযুক্তির ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রতিটি গাছের তথ্য সংরক্ষণের জন্য ট্রি রেজিস্ট্রি ও স্কলার রেজিস্ট্রি এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণের জন্য রুটিন মনিটরিং ও প্রোগ্রাম অ্যানালিটিক্স ব্যবহৃত হচ্ছে। জিআইএস, ট্রি আইডি ও জিও-ট্যাগিংয়ের মাধ্যমে প্রতিটি গাছের অবস্থান ও অবস্থা নথিভুক্ত করা হচ্ছে।
স্পেসনাসের সঙ্গে নতুন এই অংশীদারত্বের ফলে প্ল্যান্ট স্কলারের এই পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে। জার্মানির প্রতিষ্ঠান স্পেসনাস কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে পাওয়া তথ্য এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে নির্ভুল কৃষি ও পুনরুৎপাদনশীল কৃষি ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করে আসছে। প্রতিষ্ঠানটি ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উদ্যোগের সঙ্গেও যুক্ত।
সমঝোতার আওতায় প্ল্যান্ট স্কলারের সঙ্গে স্যাটেলাইটভিত্তিক পর্যবেক্ষণ, প্রতিবেদন ও যাচাই ব্যবস্থা (স্যাটএমআরভি) যুক্ত হবে। এর মাধ্যমে কৃত্রিম উপগ্রহের তথ্য ব্যবহার করে মাটির গুণাগুণ, গাছের স্বাস্থ্য এবং সম্ভাব্য কার্বন শোষণের বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করা যাবে।
এ প্রযুক্তি প্ল্যান্ট স্কলারের বর্তমান জিআইএস, ট্রি আইডি ও জিও-ট্যাগভিত্তিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হবে। ফলে রোপণ করা প্রতিটি গাছের টিকে থাকা, বৃদ্ধি এবং সম্ভাব্য কার্বন শোষণের তথ্য আরও নির্ভুলভাবে পর্যবেক্ষণ ও যাচাই করা সম্ভব হবে।
প্ল্যান্ট স্কলার এরই মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। গত ৯ জুলাই জাতীয় পরিবেশ মেলায় এসআরসিএল ও ক্যাপসের যৌথ স্টল পরিদর্শন করে প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান প্ল্যান্ট স্কলার সম্পর্কে অবহিত হন। এরপর ২২ জুলাই ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সভা এবং কামরাঙ্গীরচরের নদীতীর পুনরুদ্ধার নিয়ে মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
এর ধারাবাহিকতায় ৯ আগস্ট কামরাঙ্গীরচরের ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের বড়গ্রাম ব্যাটারিঘাট সড়ক ও বুড়িগঙ্গা নদীতীরে ‘বৃক্ষ বৃত্তি ও সবুজ নগর গঠন কর্মসূচি’ অনুষ্ঠিত হয়। এ কর্মসূচির মাধ্যমে বুড়িগঙ্গা নদীতীর পুনরুদ্ধার ও সবুজায়নের কাজের সঙ্গেও প্ল্যান্ট স্কলারের কার্যক্রম যুক্ত হয়েছে।
এসআরসিএল ও স্পেসনাসের এই অংশীদারত্ব প্ল্যান্ট স্কলারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন ধাপ। গাছ লাগানোর পর সেগুলোর কী অবস্থা হচ্ছে, কতগুলো গাছ টিকে থাকছে এবং পরিবেশে সেগুলোর সম্ভাব্য ভূমিকা কী ,এসব বিষয় প্রযুক্তির মাধ্যমে নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এর ফলে প্ল্যান্ট স্কলার শুধু বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি ও তথ্যভিত্তিক বৃক্ষ ব্যবস্থাপনার একটি উদ্যোগ হিসেবে আরও এগিয়ে যাবে।