মো. রাফি খান
বিশ্বকাপের মঞ্চে প্রতিটি ম্যাচই একেকটি অগ্নিপরীক্ষা, আর সেটি যদি হয় কোয়ার্টার ফাইনাল, তবে স্নায়ুচাপ আকাশ ছুঁতে বাধ্য। ঠিক এমন এক রোমাঞ্চকর লড়াইয়ের অপেক্ষায় ফুটবল বিশ্ব। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে আগামীকাল মুখোমুখি হচ্ছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও ইউরোপের লড়াকু দল সুইজারল্যান্ড। যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরির কানসাস সিটির অ্যারোহেড স্টেডিয়ামে ম্যাচটি বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টায় (স্থানীয় সময় ১১ জুলাই রাত ৮টায়) শুরু হবে।

তবে এই হাইভোল্টেজ ম্যাচের আগেই বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে সুইসরা। ইনজুরির কারণে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে বাঁচা-মরার লড়াইয়ে মাঠে নামতে পারছেন না দলটির এই আসরের সেরা পারফর্মার ইয়োহান মানজাম্বি।
মানজাম্বিহীন সুইসদের চড়া মূল্য
২০ বছর বয়সী তরুণ ফরোয়ার্ড মানজাম্বি চলতি বিশ্বকাপে সুইজারল্যান্ডের আক্রমণভাগের মূল চালিকাশক্তি ছিলেন। আসরে এ পর্যন্ত মাত্র ২০০ মিনিট মাঠে কাটিয়েই তিনটি গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরও দুটি গোল। পরিসংখ্যান বলছে, মানজাম্বি মাঠে থাকা অবস্থায় সুইজারল্যান্ড প্রতি ৯০ মিনিটে গড়ে ৩.৬টি গোল করেছে। বিপরীতে, তাঁকে ছাড়া খেলা বাকি ২৮০ মিনিটে সুইসদের গোল মাত্র একটি।
মূলত হাঁটুর ইনজুরির কারণে কলম্বিয়ার বিপক্ষে শেষ ষোলোর রুদ্ধশ্বাস ম্যাচেও খেলতে পারেননি এই ফরোয়ার্ড। সুইস ভক্তরা আশা করেছিলেন কোয়ার্টার ফাইনালের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে হয়তো তাঁকে পাওয়া যাবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই চোটই তাঁকে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে ম্যাচ থেকে ছিটকে দিল।

ম্যাচ–পূর্ব সংবাদ সম্মেলনে এসে দলের কোচ মুরাত ইয়াকিন নিজের হতাশা লুকিয়ে রাখতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘দুর্ভাগ্যবশত, মানজাম্বির চোট আমাদের অনেক বড় ক্ষতি করে দিল। এটি সত্যিই বড় ধাক্কা। সে দারুণ ফর্মে ছিল, আনন্দ নিয়ে খেলছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, সে খেলতে পারছে না।’
শেষ আটের রোমাঞ্চ
চলমান বিশ্বকাপে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার যাত্রাটা ছিল দারুণ। গ্রুপ পর্বে আলজেরিয়া (৩-০), অস্ট্রিয়া (২-০) ও জর্ডানকে (৩-১) হারিয়ে শতভাগ জয় নিয়ে নকআউটে পা রাখে লিওনেল স্কালোনির শিষ্যরা। তবে আসল রোমাঞ্চ শুরু হয় নকআউট পর্বে। রাউন্ড অব ৩২-এ কেপ ভার্দেকে ৩-২ গোলে হারানোর পর, রাউন্ড অব ১৬-এ মিশরের বিপক্ষে ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়েও অবিশ্বাস্যভাবে ৩-২ গোলের মহাকাব্যিক জয় তুলে নেয় আলবিসেলেস্তেরা। এই ম্যাচেই অধিনায়ক লিওনেল মেসি বিশ্বকাপের ইতিহাসে রেকর্ড ৩১তম ম্যাচ খেলার অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করেন।
অন্যদিকে, সুইজারল্যান্ড এই আসরে নিজেদের চেনাতে শুরু করেছে নিখুঁত ও জমাট রক্ষণভাগের দল হিসেবে। রাউন্ড অব ৩২-এ আলজেরিয়াকে ২-০ গোলে বিদায় করার পর রাউন্ড অব ১৬-এ শক্তিশালী কলম্বিয়ার বিপক্ষে নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ে গোলশূন্য ড্র করে তারা। পরবর্তীতে টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে কলম্বিয়াকে বিদায় করে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট কাটে সুইসরা।
মুখোমুখি পরিসংখ্যান

ইতিহাস অবশ্য কথা বলছে আর্জেন্টিনার পক্ষেই। আন্তর্জাতিক ফুটবলে দুই দল এ পর্যন্ত ৭ বার মুখোমুখি হয়েছে, যার মধ্যে ৫টি ম্যাচে জিতেছে আর্জেন্টিনা এবং বাকি ২টি ম্যাচ ড্র হয়েছে; সুইসরা এখনো আর্জেন্টিনার বিপক্ষে জয়ের মুখ দেখেনি। বিশ্বকাপে দুই দলের শেষ দেখা হয়েছিল ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে, যেখানে অতিরিক্ত সময়ে আনহেল দি মারিয়ার একমাত্র গোলে ১-০ ব্যবধানে জিতেছিল আর্জেন্টিনা।
সেমিফাইনালের সমীকরণ
কানসাসের এই হাইভোল্টেজ ম্যাচের জয়ী দল আগামী ১৫ জুলাই আটলান্টার সেমিফাইনালে মুখোমুখি হবে নরওয়ে অথবা ইংল্যান্ডের। ১৯৬২ সালের পর প্রথম দল হিসেবে টানা দুবার বিশ্বকাপ ট্রফি ঘরে তোলার মিশনে থাকা আর্জেন্টিনার সামনে এখন একটাই লক্ষ্য—সুইস প্রাচীর ভেঙে সেমিফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করা। অন্যদিকে, সুইজারল্যান্ড চাইবে সেরা তারকাকে ছাড়াই ফেবারিটদের চমকে দিয়ে ইতিহাসের পাতায় নতুন গল্প লিখতে। কানসাস সিটির গ্যালারি কিংবা বাংলাদেশ সময় সকালের টেলিভিশনের পর্দা—উত্তেজনার পারদ যে সবখানেই তুঙ্গে থাকবে, তা বলাই বাহুল্য!