ঘুরে এলাম নারায়ণগঞ্জের জামদানী পল্লী

ফিচার বাংলাদেশ

মিজু আহমেদ-

 

গন্তব্য নারায়ণগঞ্জ। প্রাচ্যের ড্যান্ডি খ্যাত নারায়ণগঞ্জ জেলা শীতলক্ষ্যা নদী, সোনারগাঁও জাদুঘর ,পানাম নগর,  বাংলার তাজমহল, আদমজী জুট মিল সহ অনেক স্থানের জন্য বিখ্যাত। তবে আমাদের গন্তব্য এসকল স্থানগুলোর কোনোটি নয়। আজ ঘুরে দেখবো নারায়ণগঞ্জ জেলার অদূরে রুপগঞ্জ থানার বিসিক শিল্পনগরী নোয়াপাড়া জামদানী পল্লী।

যাত্রা পথে আমরা

২১ মে সকাল ১১ টায় রাজধানী ঢাকার ‘স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ’ প্রাঙ্গন থেকে সাংবাদিকতা বিভাগের একদল শিক্ষার্থী যাত্রা শুরু করি। এই ভ্রমণটি ছিলো ‘ফিচার এন্ড ক্রিয়েটিভ রাইটিং’ কোর্সের অধীনে।সিদ্ধেশ্বরী থেকে যাত্রা শুরু করে দেড় ঘণ্টায় পৌঁছাই গন্তব্যে। আমাদের ভ্রমণসঙ্গী ছিলেন কোর্স শিক্ষক সহকারী অধ্যাপক শবনম জান্নাত। যাত্রা শুরু  হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই গানের সুরে মেতে উঠি আমরা। সহপাঠী রাজীব সাকলাইন গিটারে সুর বেঁধে মাতিয়ে রাখে সবাইকে। সেই সাথে উপভোগ করতে থাকি  ঢাকা – নারায়ণগঞ্জ মহাসড়কের চারপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। বেলা ১ টা, সূর্য তখন মাথার উপরে। পৌঁছে যাই গন্তব্যে। গাড়ি থেকে নেমে এগুতে থাকি জামদানী পল্লীর দিকে।

ইতিহাসের পাতায় চোখ বুলালে দেখা যায়, মসলিনের হাত ধরেই বাংলায় আসে জামদানী। বাংলাদেশের অতীত ঐতিহ্য মসলিন কাপড়ের সুনাম রয়েছে শীতলক্ষ্যা নদীর পাড় ঘেঁষে গড়ে ওঠা নারায়ণগঞ্জের। জামদানী পল্লীতে গিয়ে লক্ষ্য করলাম, কেউ রং এ ডুবিয়ে প্রস্তুত করছেন সুতা, কেউ আবার তা শুকাচ্ছেন রোদে, সেই সুতা থেকে কারিগররা তৈরি করছেন জামদানী। পুরো পল্লী জুড়ে যেনো জামদানী শিল্পে জড়িয়ে থাকার গল্প বলছে।

রোদে শুকানো হচ্ছে জামদানী তৈরির সুতা

ছোট-বড় অসংখ্য কারখানা রয়েছে এই পল্লীতে। নির্দিষ্ট সংখ্যা জানার সুযোগ নেই তবে সব মিলিয়ে হাজারখানেকের কম হবে না। কারখানা গুলোতে কাজ করছেন অসংখ্য কারিগর। যাদের অনেকেই পারিবারিক সূত্রে এসেছেন এই পেশায়। এই  কাজের জন্য তাদের নেই কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। অবশ্য তাদের কাজ স্বচোখে দেখার পর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিয়ে প্রশ্ন আশার কথা না। নিপুণ হাতের কারিগরি ছোঁয়ায় তৈরি করছেন এক একটি জামদানী শাড়ী। যার বাজার মূল্য ৭শত টাকা থেকে শুরু করে ৭লাখ টাকা ও হয়ে থাকে। স্বল্প মূল্যের শাড়ীগুলো যন্ত্রে তৈরি হলেও উচ্চমূল্যের জামদানী তৈরিতে এখনও পুরোপুরি কারিগরদের হাত ও পায়ের ব্যবহার লক্ষ্যনীয়।

চাচার পাশে বসে আপন মনে শাড়ি বুনছেন শিশু নুসরাত

প্রাপ্ত বয়সের নারী-পুরুষের পাশাপাশি বাড়ির শিশুরা ও এই কাজের সাথে জড়িত। পরিবারের সবাই মিলে আপন মনে বুনেন জামদানী। মোটামুটি তিন ঘণ্টার অধিক সময় ধরে আমরা জামদানী শিল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকা মানুষদের জীবনযাপন পর্যবেক্ষণ করলাম। অনেকের সঙ্গে কথা বলার সময় তাদের হতাশার কথাও জানলাম। পর্যাপ্ত মূল্য না পাওয়ার আক্ষেপ রয়েছে প্রায় সকলেরই। কথায় কথায় বৃদ্ধা কারিগর মনোয়ারা বেগম বললেন, ‘সেই যুগ থাকি আমি এই কাজ করি, কিন্তু অহন সংসার চালানো কষ্ট হয়া যায়। এতো শ্রম দিয়া শাড়ী তৈরি করি সঠিক দাম পাই না৷ পাইকাররা ঠিকে বেশি দামে বিক্রি করে’। জামদানী পল্লী ঘুরে বুঝতে পারলাম একটা শাড়ি তৈরিতে কতটা মেধা আর শ্রমের প্রয়োজন হয়। খানিকটা দুঃখ হলো সেসকল মানুষদের জন্য যারা তাদের কাজের প্রাপ্য সম্মানটুকু পাচ্ছেন না।

 

নিজেদের পাওয়া না পাওয়ার কথা জানাচ্ছেন বৃদ্ধা মনোয়ারা বেগম

কারিগরদের জীবনের গল্প শুনতে শুনতে তাদের অনুরোধে কিছু গান ও করি আমরা। তারা ও গলায় গলা মিলিয়ে আড্ডায় মেতে উঠে। ততক্ষণে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেছে। সারাদিনের কাঠফাটা রোদ আর গরমে অবস্থা নাজেহাল। ঠিক সেই মূহুর্তে রাস্তার পাশে থাকা মানিক কাকার লেবুর শরবত প্রাণ জুড়িয়ে দিয়েছে সবার। তারপর রওনা করি দুপুরের খাবার খাওয়ার উদ্দেশ্যে।

জামদানী পল্লী থেকে বের হয়ে ডেমরার আমুলিয়া রোডে এক রেস্তোরাঁয় দুপুরের খাবার সম্পন্ন করি। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে রওনা করি ঢাকার পথে। পড়ন্ত বিকেলে ক্লান্ত শরীরে স্বস্তি দিচ্ছিলো প্রকৃতির মৃদু বাতাস।

চারপাশে প্রকৃতির নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে ফিরি ঢাকায়। আজ এক নতুন অভিজ্ঞতা জড়ো হলো স্মৃতিতে।

ঢাকা থেকে যেভাবে যাবেন:

ঢাকার গুলিস্তান থেকে যাত্রা শুরু করে যাত্রাবাড়ী হয়ে ডেমরা স্টাফ-কোয়ার্টারে পৌঁছাতে হবে। সেখান থেকে অটোরিকশায় করে পৌঁছে যাওয়া যাবে নোয়াপাড়া জামদানী পল্লীতে। যাওয়া আসাতে গুনতে হবে ২০০-৩০০ টাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *