মাইসা সাইদ অথৈ
ইতিহাস শুধু পাঠ্যবইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়, তার ছাপ ছড়িয়ে আছে জাদুঘরের প্রতিটি গ্যালারিতে। শত-সহস্র বছরের পুরোনো ভাস্কর্য, পোড়ামাটির শিল্পকর্ম, মুক্তিযুদ্ধের স্মারক কিংবা কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তির ব্যবহৃত সামগ্রী, এসব নিদর্শন অতীতকে বর্তমানের সামনে নতুনভাবে তুলে ধরে। সেই ইতিহাসকে কাছ থেকে জানার সুযোগ পেয়েছেন স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের ৮৩তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা।

বিভাগের ‘মিডিয়া, সোসাইটি, কালচার’ ও ‘ডেভেলপমেন্ট কমিউনিকেশন’ কোর্সের অংশ হিসেবে গত মঙ্গলবার (২১ জুলাই ২০২৬) তাঁরা বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর পরিদর্শন করেন। শিক্ষা সফরে বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তানিয়া সুলতানা, প্রভাষক ফারিয়া জাহান এবং প্রভাষক ফারিশতা সিদ্দিকী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ছিলেন।
জাদুঘরে প্রবেশের পরই শিক্ষার্থীদের চোখে পড়ে ‘ফিরে দেখা জুলাই’ শীর্ষক বিশেষ আলোকচিত্র প্রদর্শনী। আলোকচিত্রী জীবন আহমেদের তোলা ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের নির্বাচিত আলোকচিত্র এবং তাঁর সংরক্ষিত খেরোখাতা নিয়ে আয়োজিত এই প্রদর্শনীতে আন্দোলনের নানা মুহূর্ত, মানুষের অংশগ্রহণ এবং সংগ্রামের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ছবিগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে অনেকেই আন্দোলনের ঘটনাগুলো নতুন করে উপলব্ধি করার কথা জানান।

এরপর শিক্ষার্থীরা নলিনীকান্ত ভট্টশালী গ্যালারিতে ভাস্কর নভেরা আহমেদের জীবন ও শিল্পকর্ম নিয়ে চলমান বিশেষ প্রদর্শনী ঘুরে দেখেন। বাংলাদেশের আধুনিক ভাস্কর্যের অন্যতম পথিকৃৎ এই শিল্পীর সৃষ্টিকর্ম ও জীবনযাত্রার নানা দিক তাঁদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।


পরে তাঁরা জাদুঘরের বিভিন্ন গ্যালারি পরিদর্শন করেন। প্রাগৈতিহাসিক যুগের নিদর্শন, পোড়ামাটির শিল্পকর্ম, পাল ও সেন যুগের ভাস্কর্য, নৃতাত্ত্বিক সংগ্রহ, লোকশিল্প, ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের স্মারক, প্রাকৃতিক ইতিহাসের সংগ্রহ এবং দেশি-বিদেশি শিল্পীদের চিত্রকর্ম ও ভাস্কর্য ঘুরে দেখেন শিক্ষার্থীরা। বিশেষ করে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ গ্যালারির ঐতিহাসিক দলিল, আলোকচিত্র ও স্মারক তাঁদের ইতিহাসকে নতুন দৃষ্টিতে ভাবতে উৎসাহিত করে।


শিক্ষা সফরে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী সেতু বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ড ট্রিপের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর পরিদর্শনের সুযোগ হয়েছে। দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধ গ্যালারিতে মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস আমাকে সবচেয়ে বেশি স্পর্শ করেছে।’


আরেক শিক্ষার্থী ওয়াসিমুল বারী সিয়াম বলেন, ‘ফিরে দেখা জুলাই’ প্রদর্শনীটি আমাকে সবচেয়ে বেশি আলোড়িত করেছে। আলোকচিত্র ও সংরক্ষিত খেরোখাতার মাধ্যমে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঘটনাগুলো যেন চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠেছিল। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনের গ্যালারিগুলো আমাদের ইতিহাসকে আরও গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করেছে। সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে এই শিক্ষা সফর আমার পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণী দক্ষতা বাড়িয়েছে। ভবিষ্যতে প্রতিবেদন ও ফিচার লেখার ক্ষেত্রেও এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে।’

দিন শেষে শিক্ষার্থীদের অনেকের কাছেই সফরটি ছিল পাঠ্যবইয়ের বাইরে ইতিহাসকে জানার এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা। শ্রেণিকক্ষে আলোচিত বিষয়গুলো যখন বাস্তব নিদর্শনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যায়, তখন শেখার পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। সাংবাদিকতা শিক্ষার্থীদের জন্য এমন শিক্ষা সফর শুধু পাঠক্রমের অংশ নয়, বাস্তব পর্যবেক্ষণ, তথ্য সংগ্রহ এবং ইতিহাস-সংস্কৃতিকে নতুনভাবে অনুধাবনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।