নাইমুল ইসলাম রাতুল
মুন্সীগঞ্জের পথে যাত্রা শুরু হয়েছিল ইতিহাসের টানে। দিনের শেষে মনে হলো, শুধু দুটি ঐতিহাসিক স্থাপনা ঘুরে দেখা নয়; বরং বাংলার অতীতের দুটি ভিন্ন অধ্যায়ের মুখোমুখি হওয়া। একদিকে মুঘল সাম্রাজ্যের সামরিক কৌশলের স্মারক ইদ্রাকপুর দুর্গ, অন্যদিকে জ্ঞান, দর্শন ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতীক অতীশ দীপঙ্করের বসতভিটা।

সকালের আলোয় ইদ্রাকপুর দুর্গের প্রাচীন দেয়াল যেন কয়েক শতকের ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে দাঁড়িয়ে আছে। মুন্সীগঞ্জ শহরের কাছেই অবস্থিত এই দুর্গ নির্মিত হয় ১৬৬০ সালে। মুঘল সুবাদার মীর জুমলার উদ্যোগে জলপথে পর্তুগিজ জলদস্যু ও আরাকানি মগদের আক্রমণ প্রতিহত করতেই দুর্গটি গড়ে তোলা হয়েছিল।

গোলাকার মূল বুরুজ, উঁচু প্রাচীর ও চারপাশের পরিখা এখনো দুর্গটির প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার পরিচয় বহন করে। সময়ের অনেক পরিবর্তন হলেও স্থাপনাটির গঠন দর্শনার্থীদের সহজেই কয়েক শতক পেছনের বাংলায় ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
দুর্গের ভেতর হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ে পুরোনো ইটের দেয়াল, উঁচু বুরুজ আর বিস্তৃত চত্বর। চারপাশের নীরব পরিবেশে দাঁড়িয়ে কল্পনায় ভেসে ওঠে সৈন্যদের পদচারণা, প্রহরীদের সতর্ক দৃষ্টি কিংবা যুদ্ধের প্রস্তুতির ব্যস্ততা। ইতিহাস এখানে শুধু বইয়ের তথ্য নয়, স্থাপত্যের মধ্যেই যেন জীবন্ত হয়ে আছে।
ইদ্রাকপুর দুর্গের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মীর জুমলার নাম। সাধারণ জীবন থেকে উঠে এসে তিনি মুঘল সাম্রাজ্যের অন্যতম দক্ষ সেনাপতি ও প্রশাসকে পরিণত হয়েছিলেন। বাংলায় তার সামরিক পরিকল্পনা ও প্রশাসনিক দক্ষতার গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে আজও টিকে আছে এই দুর্গ।

দুর্গ ছেড়ে যাত্রা এবার বজ্রযোগিনীর পথে। মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার এই গ্রামেই অবস্থিত অতীশ মেমোরিয়াল কমপ্লেক্স। প্রবেশমুখ পেরোতেই পরিবেশের পরিবর্তন স্পষ্ট। চারপাশে গাছপালায় ঘেরা শান্ত প্রাঙ্গণ, নিরিবিলি পরিবেশ,যেন কোলাহল থেকে দূরে এক নীরব আশ্রয়।

এখানেই জন্মেছিলেন বৌদ্ধ পণ্ডিত ও ধর্মপ্রচারক অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান। প্রায় এক হাজার বছর আগে জন্ম নেওয়া এই মনীষী জ্ঞানের অন্বেষণে ভারত থেকে সুমাত্রা পর্যন্ত ভ্রমণ করেন। পরে তিব্বতে গিয়ে বৌদ্ধ ধর্মের পুনর্জাগরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। আজও তিব্বতসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে তিনি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয়।
ভ্রমণের অন্যতম প্রাপ্তি ছিল অতীশ মেমোরিয়াল কমপ্লেক্সের অধ্যক্ষ করুনানন্দ থেরের সঙ্গে আলাপ। তিনি অতীশ দীপঙ্করের জীবন ও দর্শনের নানা দিক তুলে ধরেন। তার ভাষায়, বৌদ্ধ ধর্মের মূল শিক্ষা করুণা, সহনশীলতা ও আত্মশুদ্ধি। ভিক্ষুদের জীবনও সেই আদর্শেরই অনুশীলন। ধ্যান, অধ্যয়ন, আত্মসংযম ও মানবকল্যাণের চর্চাই তাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ।

করুণানন্দ থের বলেন, অতীশ দীপঙ্করের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার জ্ঞানপিপাসা ও বিনয়। অসাধারণ পাণ্ডিত্য অর্জনের পরও তিনি নিজেকে আজীবন একজন শিক্ষার্থী হিসেবেই দেখেছেন। জ্ঞানের প্রতি এই বিনয়ই তাকে যুগ যুগ ধরে প্রাসঙ্গিক করে রেখেছে।
কমপ্লেক্সের শান্ত পরিবেশে দাঁড়িয়ে উপলব্ধি হয়, দ্রুতগতির বর্তমান জীবনে মানুষ হয়তো অনেক কিছু অর্জন করছে, কিন্তু অন্তর্গত শান্তির সন্ধান ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। অতীশ দীপঙ্করের জীবন ও দর্শন সেই আত্মজিজ্ঞাসার দিকেই ইঙ্গিত করে।
এক দিনের সফরে মুন্সীগঞ্জ যেন ইতিহাসের দুটি ভিন্ন রূপ দেখায়। ইদ্রাকপুর দুর্গ মনে করিয়ে দেয় রাষ্ট্ররক্ষা, কৌশল ও সামরিক শক্তির ইতিহাস। আর অতীশ মেমোরিয়াল কমপ্লেক্স স্মরণ করিয়ে দেয় জ্ঞানচর্চা, সহমর্মিতা ও আত্মিক বিকাশের দীর্ঘ ঐতিহ্য।

বাংলার ইতিহাসের এই দুই ধারাই সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটিতে রয়েছে প্রতিরক্ষার গল্প, অন্যটিতে মানবিকতার শিক্ষা। একটিতে কামানের স্মৃতি, অন্যটিতে ধ্যানের নীরবতা।
ফেরার পথে মনে হয়, এই সফর কেবল দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতা নয়। এটি ছিল ইতিহাসের সঙ্গে সংযোগের একটি দিন—যেখানে একই জেলার ভেতর মিলেমিশে আছে যুদ্ধের স্মৃতি, জ্ঞানের আলো এবং বাংলার সমৃদ্ধ অতীতের দুই অনন্য উত্তরাধিকার।