দয়া করে… একটু হারতে শিখুন..

ফিচার

এক দিকে জন্ম দাত্রী মা আর অন‍্য দিকে প্রিয়তমা স্ত্রী, অনেকটা সি সো গেমের মত, সমতা রাখা খুবই কঠিন । তার চেয়েও বড় কথা সমতা রাখবেন কীভাবে যদি দুজনই সমতায় নয় ক্ষমতায় বিশ্বাসী হয়! একসময় ক্ষমতার লেলিহান শিখায় দগ্ধ হয় প্রিয়জন। তখনও কি টনক নড়ে! নাকি দোষারোপের রাজনীতি করে নতুন ক্ষমতা প্রদর্শনের হার না মানা খেলা চলতেই থাকে!

আমাদের সমাজে ছোটবেলা থেকেই কিছু প‍্যারেন্টস বিশেষ করে মা, হেলিকপ্টার মায়ের ভূমিকা পালন করে থাকেন । ছেলে-মেয়ের খাবার-দাবার থেকে শুরু করে পোশাক, পড়াশুনা, বন্ধু- বান্ধব সব বিষয়ে নাক গলাতেই ওনারা অভ্যস্ত । “আমার থেকে আমার সন্তানের ভাল কেউ বুঝবে না” – এ বিশ্বাসকে পুঁজি করে সন্তানের ভাল-মন্দের সব দায় নিজ স্কন্ধে তুলে নেন। মায়েদের এমন হেলিকপ্টারের ভূমিকার পেছনে সমাজের দায়কেও আমলে নিতে হয়। কারন এ সমাজ, মাকে সন্তান ‘মানুষ’ করার কিছু পরিমাপক চাপিয়ে দেয়। মা সচেতন বা অবচেতন ভাবে সব পরিমাপকের সঠিক প্রয়োগ করে জিততে চান। অন‍্যদিকে, হাঁ তে হাঁ মিলিয়ে বেড়ে ওঠা সন্তান ‘লক্ষী বাচ্চা’ তকমাটুকু পেয়েই তুষ্টির ঢেকুর তোলে । কিন্তু বিপত্তি ঘটে সন্তানের জীবনে যখন নতুন সম্পর্কের আনাগোনা শুরু হয়। সময়ের সাথে সম্পর্কের গতিপথ পরিবর্তন করতে হয়, ভারসাম‍্য রেখে চলা লাগে, মেনে ও মানিয়ে নিতে হয়। এ বাস্তবতার ধার না ধেরে নতুন মানুষকে এক হাত দেখে নেয়া কিংবা আমার সন্তান শুধু আমার কথা মতোই চলবে। এ ভয়ঙ্কর চিন্তা থেকে পারিবারিক রাজনৈতিক খেলা খেলতে থাকেন। যে কোনো মূল‍্যেই ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার নীল নক্সা আঁকতে থাকেন। অন‍্যদিকে, মা নাকি প্রিয়জন! কার মন রাখি! এ দোলাচলে লক্ষী সন্তানের জীবনে যে কালো মেঘ নেমে এসেছে তার খবর কে রাখে! ছোট বেলা থেকে এক কর্তার হুকুমে বেড়ে ওঠা সন্তান তো শেখেনি সম্পর্কের কেমিস্ট্রি আর সমতার কৌশল। বলির পাঠা হতে হতে, মনের কথাগুলো কেবল নিরবতার কুন্ডলী পাকাতে থাকে। আশাহত দিকহীন নাবিক খুঁজে ফেরে দিশা। আর দিনের পর দিন দিশা না পেয়ে একদিন হয়তো চরম মূল্য দিয়ে ফেলে।

অন‍্যদিকে, নিউক্লিয়ার পরিবারে বেড়ে ওঠা অনেক সন্তানরাই ছোটবেলা থেকেই আলাদিনের চেরাগ হাতে পেয়ে যায়। পরিবারের এক বা দুই মাত্র সন্তান হওয়ায় চাওয়া আর না পাওয়ার মাঝে সমঝোতা করতে শিখে না, অপ্রাপ্তি কিংবা অপূর্ণতা যে জীবনেরই একটি অংশ তা মেনে নিতে পারে না। না শুনে অনভ‍্যস্ত মগজ সব কিছুই চাহিবা মাত্রই পেতে চায়। নিজের মন মত না হলেই ‘খেলবো না’ টাইপ আচরণে বিদ্ধ করতে থাকে চারপাশের সম্পর্কগুলো কে। এভাবেই সম্পর্কের মাঝে শক্ত ইগোর দেয়াল তৈরি হতে থাকে ধীরে ধীরে।

সম্পর্কগুলো জটিল করতে পরিজন নামের আর এক জাজমেন্টাল দলের কথা না বললেই নয় ।যদিও বাড়ির বউদেরকেই মোকাবেলা করতে হয় এ দলকে বেশি। সম্পর্কে এরা ননদ, ননাশ, দেবর, ভাসুর, বন্ধু আরো কত কি! কখনো নিজেদের স্বার্থে, কখনোবা নিছক মজা নেবার ছলে ডিভাইড এন্ড রুল করতে এরা সিদ্ধহস্ত । বউ-শ্বাশুড়ির মাঝে তৃতীয় পক্ষ হয়ে থাকা এ দলের মুল কাজ পিএনপিসি করা। মাঝে মধ্যে এক জনের পক্ষ হয়ে তুমুল ঝগড়াও জুড়ে দিতে পারে। কিন্তু পরিবারের ক্রাইসিসের সময়গুলো তে সদ উপদেশ দিয়ে পাশে পাবেন না তেমন কাউকে ।কিছু ব‍্যতিক্রম যে নেই তা নয়। তবে তাদের সংখ্যা নেহাতই কম। সবই কেবল নিজেদের স্বার্থ হাসিলের উছিলায়। স্বার্থে টান পড়লে গিরগিটির মত রং বদলাতেও সময় নেয়না এরা।

অথচ চিন্তার পরিবর্তন, সহিষ্ণুতা আর ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থেকে নিজেদের সরিয়ে আনতে পারলেই কিন্তু একটি স্বস্তির জীবন যাপন করা সম্ভব । আপনি যেদিন থেকে শ্বশুর কিংবা শ্বাশুড়ি, সেদিন থেকে ভাবতে শিখুন আপনার সন্তান নতুন জীবন শুরু করেছে। সে জীবনে তার কিছু প্রাইভেসির প্রয়োজন। নতুন সম্পর্কের সাথে মানিয়ে চলতে তাকে সাহায্য করুন। তাদের আষ্টে-পৃষ্ঠে বেঁধে রাখার কূট কৌশল মাথা থেকে নামিয়ে ফেলুন। কোথায় আপনাকে থামতে হবে বরং সেই সুকৌশল রপ্ত করুন। আসলে সময়ের প্রয়োজনে যারা জীবন যাপনে ব্রেক কষতে জানেন তাদের কাছেই “জীবন সুন্দর “।

আবার নতুন বাড়িতে পা দিয়েই বউ যদি “সব আমার” জপতে থাকেন তবে তো শুরুতেই সম্পর্ক ধাক্কা খাবে।এত বছর যিনি সংসার সামলে রেখেছেন, সম্পর্ক গুলো আঁকড়ে আছেন তাঁকে বোঝার চেষ্টা করুন । প্রতিপক্ষ না হয়ে, সহজ সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা বেশি জরুরি । সম্পর্কে যৌক্তিক সমতার সহঅবস্হান প্রয়োজন। মা-বাবা, ভাই-বোন কিংবা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক গুলো সুষ্ঠু আর সুন্দর রাখতে নিজের যৌক্তিক অবস্থানের জানান দিন। খোলামেলা আলোচনা করুন। প্রয়োজনে কাউন্সিলিং নেয়া যেতে পারে। মনে রাখবেন, আবেগের কাছে বিবেক যাতে হেরে না যায়।

আর পরিজনরা, বউ- শাশুড়ির চুলচেরা বিশ্লেষণ না করে নিজেদের দিকে তাকান! অন‍্যরে কি দায়িত্ব ! সে দায়িত্ব পালন করলো কিনা! অমুকের ছেলের বউ কি বল্লো আর কি করলো, সেদিকে না তাকিয়ে আপনি আপনার দায়িত্ব কতটুকু পালন করলেন তা দেখুন। সমালোচনা করে সময় নষ্ট না করে গঠনমূলক কিছু করুন । আর সম্ভব হলে, বউ-শাশুড়ির দ্বন্দ্বে ছন্দ না মিলিয়ে, একটু সেতু বন্ধনের চেষ্টা করুন।

আসলে সম্পর্কের ভিতর হার-জিত শব্দগুলো বড্ড বেমানান । সম্পর্ক গড়তে গিয়ে একটু হার না হয় হলোই। হার থেকে যদি পরিবারের সদস‍্যদের সাথে সহজ-সুন্দর একটি সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তবে তা গৌরবের। কিছু হেরে যাওয়ার ভিতর দিয়ে আমরা আসলে জিতে যাই। তাই সম্পর্কের খাতিরে দয়া করে…একটু হারতে শিখুন ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *