‘পান্তা ভাতই ছিল তখন আমাদের বর্ষবরণ’

ফিচার শিল্প-সাহিত্য

রিদিতা সাহা

‘যত দূর জানি আজ থেকে ৬/৭ বছর আগের পহেলা বৈশাখ ছিল একটা উৎসব। একটা আবেগের জায়গা। পান্তা -ইলিশ, লাল- সাদা পাড় শাড়ি ছাড়াও পহেলা বৈশাখ ঘিরে একটা অন্যরকম আবেগ কাজ করত। কিন্তু একালে এসে আমাদের সেই আবেগ যেন হয়ে গিয়েছে মুঠোফোন বন্দী। যেকোন উৎসব হয়ে গিয়েছে শুধু মাত্র সেল্ফি আর সোশ্যাল মিডিয়া কেন্দ্রীক। উৎসব ঘিরে এখন আর আগের মতো আবেগ দেখা যায় না। সেই আমেজটাও যেন কোথাও একটা হারিয়ে গিয়েছে।’ শুনছিলাম পহেলা বৈশাখ নিয়ে স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফারহানা ওয়াজেরিন তিতলির কথা।

বাঙালি জাতির ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণের দিন পহেলা বৈশাখ তথা বাংলা নববর্ষ। বাংলা পঞ্জিকার  প্রথম মাস  বৈশাখের প্রথম দিনটি বাংলাদেশে জাতীয় উৎসব হিসেবে পালিত হয়ে থাকে এবং এটি বাঙালিদের একটি সর্বজনীন লোকউৎসব হিসাবে বিবেচিত।

এক সময় নববর্ষ পালিত হতো ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে। তখন এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল কৃষির, কারণ কৃষিকাজ ছিল ঋতুনির্ভর। এই কৃষিকাজের সুবিধার্থেই মুগল সম্রাট আকবর ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০/১১ মার্চ বাংলা সন প্রবর্তন করেন এবং তা কার্যকর হয় তাঁর সিংহাসন-আরোহণের সময় থেকে (৫ নভেম্বর ১৫৫৬)। আগে ‘ফসলি সন’ নামে পরিচিত হলেও, পরে তা ‘বঙ্গাব্দ’ নামে পরিচিত হয়।

গৃহিণী জুবলী সাহা তার পহেলা বৈশাখের স্মৃতি মনে করে জানান, ‘আমাদের সময়ে পহেলা বৈশাখ ছিলো হালখাতা,স্কুল ছুটি, লাল পারের সাদা শাড়ি, ফুলের মালা, আলতা এইসব। সকাল বেলার চিড়া, মুড়ি, দই খেতাম। তারপর মা লাল পারের সাদা শাড়ি পরিয়ে দিতো চুলে দুটো ফিতে দিয়ে বেনি করে দিত এরপর বাবার সাথে বৈশাখী মেলায় ঘুরতে যেতাম। কিন্তু এই সময়ের পহেলা বৈশাখে এই সব আর দেখা মেলে না। এখনতো সবাই বিভিন্ন রঙের শাড়ি পরে, কেউ আবার জামা পড়ে । আমাদের সময়ে ফেসবুক ছিলনা তাই এখনের মত ছবি তোলার এত প্রচলন ছিলনা। এখনতো মানুষ পহেলা বৈশাখ পালন করে সেজেগুজে ছবি তুলবে বলে।’

অতীতে বাংলা নববর্ষের মূল উৎসব ছিল হালখাতা। কিন্তু নববর্ষকে উৎসবমুখর করে তোলে বৈশাখী মেলা। এটি মূলত সর্বজনীন লোকজ মেলা। এ মেলা অত্যন্ত আনন্দঘন হয়ে থাকে। কালের বিবর্তনে নববর্ষের সঙ্গে সম্পর্কিত অনেক পুরানো উৎসবের বিলুপ্তি ঘটেছে, আবার সংযোগ ঘটেছে অনেক নতুন উৎসবের। তখন পহেলা বৈশাখ ছিল জমিদারদের পুণ্যাহের দিন। ঢাকার ঘুড়ি ওড়ানো এবং মুন্সিগঞ্জের গরুর দৌড় প্রতিযোগিতা ছিল এক সময় অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ। বর্তমানে নগরজীবনে নগর-সংস্কৃতির আদলে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে নববর্ষ উৎযাপিত হয়। পহেলা বৈশাখের প্রভাতে উদীয়মান সূর্যকে স্বাগত জানানোর মধ্য দিয়ে শুরু হয় নববর্ষের উৎসব। নববর্ষকে স্বাগত জানাতে তরুণীরা লালপেড়ে সাদা শাড়ি, হাতে চুড়ি, খোপায় ফুল, গলায় ফুলের মালা এবং কপালে টিপ পরতেন; আর ছেলেরা পরতেন পাজামা ও পাঞ্জাবি। কেউ কেউ ধুতি-পাঞ্জাবিও পরতেন। এদিন সকালবেলা পানতা ভাত খাওয়া একটি ফ্যাশনে পরিণত হয়েছিল। সঙ্গে থাকতো ইলিশ মাছ ভাজা।কিন্তু বর্তমান সময়ে নববর্ষ উৎযাপনের জন্য সবথেকে দরকারী হয়ে উঠেছে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। মঙ্গল শোভাযাত্রা’ র উদ্দেশ্য হলো আমাদের দেশীয় এবং রক্তের খুব কাছাকাছির গল্প-কথা, জিবনী সামগ্রী, ভাব ও প্রেম নিয়ে সার্বজনীন মঙ্গলের জন্য আরেকবার সবাই মিলে পথে নামা।

নোয়াখালী সরকারি কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র অর্প সাহা মনে করেন, ‘বারো মাসে তেরো পার্বণের দেশ এই বাংলাদেশ আর এইসব পার্বণ আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির শেকড়। বর্তমানের বৈশাখ আর আগেকার বৈশাখের মধ্যে তারতম্য প্রকাশ পায়।সেকালের বৈশাখ মানে ছিলো নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রা, বৈশাখী মেলা, নাগরদোলায় চড়া, পান্তা-ইলিশ খাওয়া, নতুন জামা পড়ে ঘুরে বেড়ানো।এই বাংলা নববর্ষের মূল উৎসবের মধ্যে রয়েছে ‘হালখাতা’,এই দিনে সেজে ওঠে বাড়ি ঘর – দোকানপাট সব।আর একালের বৈশাখ – আমরা ভুলেই গিয়েছি আমাদের পূর্ব পুরুষের সেই সম্প্রীতি ও ভালোবাসা। বিগত কয়েক বছর এই বৈশাখী মেলা ও উৎসবের আমেজ দেখা যায় না। এখন বৈশাখ মানে উশৃঙ্খলতা, নিরাপত্তাহীনতায় নারী সমাজ, পার্টি করা, সোশ্যাল মিডিয়ায় পোষ্ট করা। মানুষের মধ্যে সেই আমেজ আর দেখা যায় নাএই যদি হয় বৈশাখ তবে কী রবে এটি সোনালী ইতিহাসের পাতায়।’

গৃহিণী আফরোজা চায়না মনে করেন, ‘আগে পহেলা বৈশাখ উদযাপন ছিল পরিবার কেন্দ্রিক। বর্ষবরণের আনন্দটা ছিল নিজ পাড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। চাহিদা বলতে ছিল একটি লাল পাড়-সাদা শাড়ি। পান্তা ভাতই ছিল তখন আমাদের বর্ষবরণ। আশা করে থাকতাম, পহেলা বৈশাখের পর কাঁচা আম খেতে পারব। কারন, পহেলা বৈশাখের আগে কাঁচা আম খাওয়া যেত না, মুরুব্বিরা বলতেন। আর বর্তমানে, পহেলা বৈশাখের আনন্দ কিছুটা আত্মকেন্দ্রিক হয়ে গেছে, আমি মনে করি। এখন বর্ষবরন করা হয় যে যার যার মত, তরুনরা পরিবারকে সময় কম দেয়। তবে এখনও পহেলা বৈশাখের গুরুত্ব কমে যায়নি। পান্তা-ইলিশের কদর এখনও একই রকম আছে। নতুন প্রজন্ম নতুন রুপে দিনটি উদযাপন করে।’

 

ছবি: উইকিপিডিয়া

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *