পারের প্রতীক্ষায় বেনারস

আন্তর্জাতিক

রমিতা সালুজা, বিবিসি:

গত বছর বেনারসে নভেম্বরের কোন এক রোদমাখা বিকেলে,মুমুক্ষ ভবনের উঠানে বড় নিম গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। পাশের ঘরে প্রার্থনার আওয়াজ পেলাম তখনই খাটো একজন মহিলা বড় নিমকির প্যাকেট সাধলেন, ফিতার ন্যায় এক ধরনের মচমচে খাবার যা কিনা ময়দা বা সুজির তৈরি, উত্তর ভারতে এগুলো সচরাচর পাওয়া যায়। অনেকটা সতর্কতার সাথেই অশীতিপর মহিলাটি বললেন অল্প না খেলে ভিতরে যেতে দিবেন না যখন বললাম আমার ক্ষুদা নেই। তার বলিযুক্ত চেহারায় একটা স্নিগ্ধ হাসি ফুটলো যখন এক টুকরো নিমকি নিলাম। স্নেহের সাথে আমায় বললেন এটা নিয়মমাফিক খাওয়া উচিত।প্রার্থনার ব্যাপারে জানতে চাইতাম কিন্তু তিনি তাড়াহুড়োতে উঠান থেকে চলে গেলেন। মনীশ কুমার পান্ডে, ওখানের মালিক পরে জানালেন সরস্বতী আগরওয়াল নিঃসন্তান বিধবা ছিলেন, চার বছর আগে বেনারসের কাছেই কোথাও থেকে এসেছিলেন স্বামী মারা যাওয়ার পর। সহকর্মী বাসিন্দা রাজস্থানের গায়েত্রী দেবী, ৫ বছর যাবত থাকছেন, ভারতের অন্য কোন প্রান্তে এক ছেলে আর দুই মেয়ে থাকে; কিন্তু খুব কমই আসে উনাকে দেখতে। কাঠের বেঞ্চে উঠানে বসে কথা হচ্ছিলো তার আমার পরিবার নিয়ে এবং নারী অধিকার নিয়ে। তাকে খুশি মনে হলো কথার দ্বারা।

লজ এর ম্যানেজার মনিষ কুমার পান্ডে পরবর্তীতে আমায় বলেছিল যে স্বরস্বতী আগারওয়াল একজন নিঃসন্তান বিধবা এবং সে ভারানসির কাছাকাছি কোন এক জায়গা থেকে আনুমানিক ৪ বছর আগে তার স্বামীর মৃত্যুর পর এসেছিল। সহকর্মী বাসিন্দা গায়েত্রী দেবী রাজেস্থানের যিনি পাঁচ বছরের অধিক হল লজে আছেন। তার ১ ছেলে ২ মেয়েরা ভারতের অন্যান্য অংশে বাস করে, কিন্তু তারা খুব কম আসে ওনার সাথে দেখা করতে। পরবর্তীতে যখন একদিন আঙ্গিনায় এক কাঠের বেঞ্চে বসে ওনার পরিবার থেকে আমার পরিবার,জীবন দর্শন,নারীর অধিকার সম্পর্কে কথা বললাম।ওনার হাসি টা খুব উষ্ণ ছিল এবং দেখে মনে হল সে কথা বলতে পেরে খুব খুশি। উনি বললেন “যখন ছেলেমেয়েরা বিয়ে করে সবকিছু পালটে যায়”। পেছনের বেঞ্চে বসা নীল পসমী শাল কাঁধে জড়িয়ে সতী দেবী কথার সাথে নিঃশব্দে মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানাচ্ছিলেন। উনিও পাঁচ বছর যাবদ অতিথিশালায় অবস্থান করছেন। গায়েত্রী দেবী বলে চললেন,”আমার কোন অভিযোগ নেই,যখন আমি মারা যাবো ওরা আসবে আর আমাকে চিতায় নিয়ে যাবে”। বেনারসের শত শত মানুষের মত এই তিন মহিলাও মৃত্যুর প্রতিক্ষায় আছে।

অনূদিত, মেহরাব আফ্রিদি ও ফজলে রাব্বি: স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের ৫৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *