লালবাগ দুর্গ: রোজ বলে যায় মোঘল ইতিহাসের গল্প

ফিচার

তানভীর সিদ্দিক টিপু
‘আমরা মোঘল আমলে জন্ম নিতে পারলে ভালো হতো। প্রজা হলে যুদ্ধ করতাম। রাজা হলে এরকম দুর্গ নির্মাণ করতাম। সবাই যুগের পর যুগ আমাদের কবর দেখতে আসতো। আমাদের ইতিহাস পড়তো।’ বাংলাদেশে মোঘল আমলের ঐতিহাসিক নিদর্শন লালবাগ দুর্গ দেখতে এসে এভাবেই আফসোস করছিলেন স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্র আমিনুর রহমান। এখানে থাকা পরী বিবির মাজার দেখে তার মনে ইতিহাসের পাতায় বিচরণ করার ইচ্ছা জেগেছে।

এমন নয়নাভিরাম কেল্লায় বেড়াতে এলে যে কারো মনে এমন ইচ্ছা জাগতে পারে। মূল ফটক দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলেই গাছপালা ঘেরা সাজানো গোছানো বিশালতা মনের অবস্থা পরিবর্তন করে দেবে। সোজা হেঁটে গেলেই দুর্গের একেবারে মধ্যভাগে দেখা মিলবে পরীবিবির সমাধির। এখানে তিনটি বিশাল দরজা আছে। এর মধ্যে বর্তমানে জনসাধারণ কেবল একটি ফটক ব্যবহার করতে পারেন। আর ঢুকে সোজা তাকালে চোখে পড়ে সাদা মার্বেল পাথরে ঢাকা পরীবিবির মাজার। এছাড়া আছে আটটি ঘর। চারকোণে চারটি অষ্টকোণ মিনার ও মাঝে একটি অষ্টকোণ গম্বুজ।

আছে হাম্মামখানাসহ দ্বিতল দরবার হল। এর মধ্যে নিচতলার আকর্ষণ হলো হাম্মামখানা। এটি মূলত সুবেদারদের বাসভবন হিসেবে ব্যবহার হতো। ওপরের তলায় বসতো বিচারালয়। শায়েস্তা খাঁ এখানে থাকতেন ও রাজকার্য পরিচালনা করতেন। শায়েস্তা খাঁ’র বাসভবনটি এখন দর্শনার্থীরা জাদুঘর হিসেবে দেখেন। এতে তার ব্যবহার্য নানান জিনিসপত্র,তৎকালীন বিভিন্ন যুদ্ধাস্ত্র,পোশাক,সেই সময়ের প্রচলিত মুদ্রা রয়েছে।

মোঘল সম্রাট শায়েস্তা খাঁ-এর মেয়ে পরী বিবির মাজার এখানে থাকায় অনেকেই এই দুর্গের নির্মাতা হিসেবে শায়েস্তা খাঁ-কে কৃতিত্ব দিয়ে থাকে। তবে সেই ভুল ভাঙ্গবে দুর্গে ঢুকতেই একপাশের সাইনবোর্ড এর লেখা পড়লে। জনশ্রুতি আছে, মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের ছেলে মুহাম্মদ আজম শাহ বাবার কাছে আবদার করেছিলেন, তাঁকে যেন বাংলার সুবাদার করে পাঠানো হয়। তাই ১৬৭৮ সালে তাঁকে সুবাদার করে পাঠানো হয় ঢাকায়। ঢাকার সুবাদারি পেয়ে শাহজাদা আজম বুড়িগঙ্গার তীরে একটি দুর্গ নির্মাণ করা শুরু করলেন, নাম রাখলেন ‘কিল্লা আওরঙ্গবাদ’। কিন্তু এই নামে কেউ আর ডাকত না কেল্লাটিকে। লালবাগ এলাকায় কেল্লাটি হওয়ায় সবাই লালবাগের কেল্লা বলেই ডাকা শুরু করেন।

আজম শাহ দুর্গটি নির্মাণ করা শুরু করেছিলেন। কিন্তু সম্রাটের আদেশে পরের বছরই তাঁকে ঢাকা ত্যাগ করতে হলো। ১৬৭৯ সালে দ্বিতীয়বারের মতো শায়েস্তা খান এলেন সুবাদার হয়ে। প্রথমবার ছিলেন ১৬৬৩ থেকে ১৬৭৩ সাল পর্যন্ত। শায়েস্তা খানকে আজম শাহ অনুরোধ করেছিলেন দুর্গটির নির্মাণকাজ শেষ করার জন্য। বলা হয়ে থাকে, এই আজম শাহের সঙ্গেই বিয়ে হওয়ার কথা ছিল পরী বিবির। কিন্তু পরী বিবি অকালে প্রাণ হারালে শায়েস্তা খান দুর্গটিকে অপয়া বলে মনে করেন। দুর্গ নির্মাণ শেষ করেননি শায়েস্তা খান। কিন্তু কন্যা পরী বিবির সমাধির ওপর একটি স্থাপনা গড়ে তোলেন তিনি।

কেল্লার আরেক আকর্ষণীয় নিদর্শন দক্ষিণ-পূর্ব তোরণ। আছে একটা সুড়ঙ্গপথ। দর্শনার্থীরা এর ফটকে ভিড় করলেও ভিতরে যাওয়ার অনুমতি নেই। দুর্গের মসজিদটিও সুউচ্চ মিনার নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে সগৌরবে। একটা বিশাল পুকুর আর চোখ জুড়ানো সীমানা প্রাচীর ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে এই দুর্গকে।

লালবাগ কেল্লায় ঢুকতে হলে মূল দরজার ডানপাশের কাউন্টার থেকে টিকিট কিনে নিতে হবে। প্রতিটির মূল্য ২০ টাকা। বিদেশি পর্যটকদের বেলায় তা ২০০ টাকা। গ্রীষ্মকালে সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দুর্গ খোলা থাকে। শীত মৌসুমে সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত দর্শনার্থীরা দুর্গ ঘুরে দেখতে পারেন। দুটি ঋতুতেই দুপুর ১টা থেকে ১টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত বন্ধ রাখা হয় দর্শনীয় জায়গাটি। আর সবসময়ের জন্য শুক্রবারে জুমার নামাজের জন্য সাড়ে ১২টা থেকে ৩টা পর্যন্ত বন্ধ থাকে দুর্গ। এছাড়া রবিবার সাধারণ ছুটি ও সোমবার দুপুর ২টা থেকে ফটক খোলা হয়।

দুর্গটি জুড়ে সুশোভিত উদ্যান করেছে কর্তৃপক্ষ। সেগুলো নিয়মিত পরিচর্যাও করা হয়। ফলে দর্শনার্থীরা ঐতিহাসিক পটভূমিতে দাঁড়িয়ে প্রকৃতিকে উপভোগ করার অনন্য সুযোগ পায়। কোনো এক ছুটির নিমন্ত্রণে ঘুরে আসতে পারেন দুর্গ থেকে। কে জানে, হয়তো দুর্গের এই চোখ জুড়ানো সৌন্দর্যে ব্যুদ হয়ে আপনিও আনমনে বলে উঠবেন – জন্মই যখন হলো, তিনশো বছর আগে কেনো হলো না?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *