সংবিধানের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা হচ্ছে : ড. মিজানুর রহমান

বাংলাদেশ সাক্ষাৎকার

আজ সংবিধান দিবস। ১৯৭২ সালের এই দিনে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান গৃহীত হয়। স্বাধীনতার ৪৯ বছরে কতটা কার্যকর আমাদের সংবিধান? কিংবা আমরা কি সাংবিধানিক উপায়ে দেশ পরিচালনা করতে পারছি? এসব প্রশ্ন নিয়ে সংবিধান দিবসের বিশেষ সাক্ষাৎকারে চারদিক২৪ ডট কম এর সাথে কথা বলছেন মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান। টেলিফোনে সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন তানভীর সিদ্দিক টিপু।

চারদিক২৪: সংবিধান প্রণয়নের আটচল্লিশ বছর পার হয়ে গিয়েছে। আজকের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে আমরা কতটুকু সংবিধানকে অনুসরণ করতে পারছি?
ড.মিজানুর রহমান: সংবিধানের মূল আত্মাটাকে আমরা বোধহয় এখনো আত্মস্থ করতে পারিনি। যার জন্য হয়তো বর্ণ দিয়ে কি লেখা আছে সেটাকে অনেক সময় গুরুত্ব দেওয়া হয় কিন্তু এটা আসলে সংবিধান অনুসরণ করে নয়। আমরা সংবিধানের যে বাস্তবতা সেটি থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছি।

চারদিক২৪: কেন আমরা সংবিধানকে সঠিকভাবে অনুসরণ করতে পারছিনা?
ড.মিজানুর রহমান: কারণ বাহাত্তরের সংবিধান যখন রচিত হয়েছিল তখনকার বাংলাদেশ আর এখনকার বাংলাদেশের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ হয়ে গেছে। বাহাত্তরের বাংলাদেশ ছিল মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত বাংলাদেশ। তখন স্বপ্নটা ছিল সোনার বাংলা গড়ার, সুষম একটা সমাজ ব্যবস্থা গড়ার। একটা রাষ্ট্র হবে যেখানে প্রত্যেকটা মানুষের মর্যাদা সুরক্ষিত থাকবে এবং রাষ্ট্র সেই উদ্দেশ্যে কাজ করে যাবে। দুঃখজনক হলেও সত্য, পঁচাত্তর পরবর্তী সময় থেকে যে ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে আমাদের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সেই ধারাটা অনেকাংশে অব্যাহত। সেখানে রাষ্ট্রের নজর থেকে জনগণ ছিটকে পড়ে গেছে। জনগণ বলতে আমি বলতে চাইছি প্রান্তিক দরিদ্র জনগণ। মূলত যারা প্রাণ দিয়েছিল স্বাধীনতার জন্য। যাদের রক্তের মাধ্যমে আমাদের স্বাধীনতা অর্জিত। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, যে তিরিশ লাখ মানুষ প্রাণ দিয়েছিল তার ২৩ লাখ ছিল আমাদের গ্রামের মানুষ, কৃষক, শ্রমিক শ্রেণীর। যারা এই দেশটাকে স্বাধীন করেছেন যেন তাদের অধিকার রক্ষিত থাকে। সেই তারাই এখন রাষ্ট্রীয় বিবেচনা থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছেন। সুতরাং এই কারণে আমাদের রাষ্ট্রের নৈতিক দিক থেকে যে অধঃপতন হলো সেটির কারণেই আজকের এই অবস্থা।

চারদিক২৪: সরকারি দল বা রাষ্ট্রপরিচালনার সাথে যুক্ত যারা তারা সংবিধান অনুসরণ করে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে কতটুকু আন্তরিক?
ড.মিজানুর রহমান: দেখুন, আমাদের রাজনীতিবিদদের মধ্যে এক ধরনের চিন্তা কাজ করে যে জনগণের জন্য রাষ্ট্রের জন্য কোনটা মঙ্গলজনক শুধু তারাই সেটা ভালো বোঝে এবং তারা ছাড়া তাদের বাহিরে আর কেউ এটা বোঝেন না। তাদের ধারণা যে, তারা বোধহয় জনগণের সাথে, রাষ্ট্রের সাথেই কাজ করে চলেছেন । কিন্তু জনগণের অভিপ্রায় জেনে নেয়া দরকার এবং মাঝে মাঝে যাচাই করা দরকার। এই কথাটা অনেক সময় তারা ভুলে যায়।

যেভাবে আমাদের রাষ্ট্র পরিচালিত হওয়া উচিত ছিল ঠিক সেভাবে হচ্ছে না। আমি সংবিধানের দুটি অনুচ্ছেদ উল্লেখ করছি। একটা হচ্ছে অনুচ্ছেদ ৭। যেখানে বলা হয়েছে প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। ৭(খ) এ বলা আছে, জনগণের অভিপ্রায়ই হবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন। সেই অভিপ্রায় হচ্ছে সংবিধান। যা কিছু জনগণের অভিপ্রায়ের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় সেটি বাতিল বলে গণ্য হবে । এই যে জনগণের মালিকানা, এই জনগণের মালিকানার বদলে আমাদের রাষ্ট্রটা এখন আমলাদের মালিকানা হয়ে গেছে। আমলাতন্ত্র এখানে জেঁকে বসেছে। যেটি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশে হওয়ার কথা ছিল না।

আরেকটি হচ্ছে আমাদের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১। যেখানে বলা হয়েছে বাংলাদেশটা হবে গণতান্ত্রিক। যেখানে প্রশাসনের সকল স্তরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি কর্তৃক রাষ্ট্র পরিচালিত হবে। আবার অনুচ্ছেদ ৫৯ এ বলা আছে যে, আমাদের স্থানীয় সরকারব্যবস্থা সেখানেও প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার থাকবে অর্থাৎ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত প্রতিনিধিরা শাসনকার্য পরিচালনা করবে। এখন জনগণের কর্তৃক প্রতিনিধি নির্বাচিত হচ্ছে কিনা বিষয়টি নিয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে। আমাদের প্রতিনিধিরা আজকে তথাকথিত ভাবে নির্বাচিত হয়ে প্রতিনিধিত্ব করছেন। সুতরাং সেখানে আমাদের সংবিধান কোথায় থাকলো? আমাদের সংবিধানকে আমরা উল্টেপাল্টে ফেলেছি। আমরা সংবিধানের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে ফেলেছি।

চারদিক২৪: সাম্প্রতিক সময়ে ধর্মকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছি আমরা। ধর্ম ও জাতি বিষয়ে সংবিধান কতটুকু গণতান্ত্রিক বা নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করছে?
ড.মিজানুর রহমান: আমরা একটা গোঁজামিল দিয়ে চলার চেষ্টা করছি। আমাদের বাহাত্তরের সংবিধানে খুব স্পষ্ট করে লেখা ছিল, ধর্মভিত্তিক কোন রাজনীতি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশে চলবে না। এটি যার যার ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে আমাদের ধর্মকে সংবিধানে নিয়ে আসা হল। জিয়াউর রহমান করলেন এটা। সেখানে ‘পরম করুণাময় আল্লাহর নামে শুরু করছি’ না বলে যদি বলা হতো ‘সৃষ্টিকর্তার নামে শুরু করছি’ তাহলে বিষয়টা অন্যরকম হতো। কিন্তু আল্লাহর নামে শুরু করছি বলে একটা নির্দিষ্ট ধর্ম কে নির্দেশ করা হলো। তার থেকেও আরো বড় ভণ্ড এবং স্বৈরাচারী শাসক এরশাদ। তিনি অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ধর্ম হিসেবে ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করলেন। ধর্ম মানুষের । রাষ্ট্রের কি কোন ধর্ম হয়? রাষ্ট্র কিভাবে ধর্ম পালন করবে? আমরা এটার থেকে আর বের হতে পারলাম না। সেটা রাজনৈতিক কারণে হোক বা ভোটের রাজনীতির কারণে বা ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য । আমরা সবকিছু করছি কিন্তু রাষ্ট্রধর্ম ত্যাগ করতে পারছিনা। আমরা কিন্তু বাহাত্তরের সংবিধানে আর ফিরে যেতে পারলাম না।

তবে জিয়াউর রহমান এবং এরশাদ ধর্মনিরপেক্ষতাকে যে নির্বাসনে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন, সেখান থেকে সেটাকে আমরা আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসতে পেরেছি, সংবিধানে উল্লেখ করতে পেরেছি। তবে একদিকে আমরা বলছি ধর্মনিরপেক্ষতা, আবার আমরা বলছি যে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতা থাকলেতো রাষ্ট্র কখনো একক ধর্মকে প্রাধান্য দিতে পারেনা। দুটি বিষয় আসলে সাংঘর্ষিক। অথচ আমরা দুইটাই ওখানে রেখে দিয়েছি। এই গোঁজামিলের খেসারত দিতে হচ্ছে আমাদের। হেফাজতে ইসলাম বা কওমি মাদ্রাসাগুলোর যে শিক্ষাব্যবস্থা তার সাথে আমাদের স্কুল-কলেজের শিক্ষাব্যবস্থার মানের তারতম্য থাকা সত্ত্বেও আমরা তাদেরকে সমমানের মর্যাদা দিয়ে দিলাম। গোঁজামিলের কারণে ধর্মীয় নেতাদের কথাকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিতে হয়। এই আচরণের কারণে অন্যান্য ধর্মের যারা বিশ্বাসী রয়েছেন তারা কোণঠাসা হয়ে পড়বে, এটাই স্বাভাবিক। এটিই এখন চলছে বাংলাদেশে।

চারদিক২৪: আদর্শ সাংবিধানিক বাংলাদেশ গড়তে এই মুহূর্তে কি করা প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?
ড.মিজানুর রহমান: যদি আমাদের বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যেতে হয়, তাহলে অনেক জঞ্জাল থেকে মুক্ত হতে হবে। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনেক অনেক ইতিবাচক কাজ করে চলেছেন। কিন্তু এরপরেও তিনি কিন্তু বঙ্গবন্ধুর যে আদর্শ বা দর্শন সেই দর্শন থেকে অনেক পিছিয়ে আছেন। বঙ্গবন্ধু অন্তত তার তাত্ত্বিক এবং দার্শনিক দিক থেকে কয়েকশো বছর আমাদেরকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে জিয়া, এরশাদ, বিএনপি আমাদেরকে কয়েকশো বছর পিছিয়ে নিয়ে গেছে। সেখান থেকে আবার আমাদের প্রধানমন্ত্রী অনেক এগিয়ে নিয়ে এসেছেন। কিন্তু এগিয়ে নিয়ে গেলেও এখনো কিন্তু আমরা সেই বাহাত্তরের যে স্বর্ণযুগ সেখানে এখনও ফিরতে পারিনি। ফিরতে হলে যেমন রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রত্যয় দরকার, ঠিক তেমনি নতুন প্রজন্মকে আমাদের বাহাত্তরের সংবিধান ধারণ করতে হবে। সেই সংবিধানের ভিতরে যে মূল্যবোধগুলো লুকিয়ে আছে সেগুলোকে বুঝতে হবে এবং সেগুলো যেন প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশে, সেই লক্ষ্যে কাজ করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *