সমাজ ও দেশের প্রকৃত চিত্রায়ণ মোনাজাতউদ্দিনের “পথ থেকে পথে”

তারুণ্যের ভাবনা শিল্প-সাহিত্য

তানজিন আক্তার: 

মোনাজাতউদ্দিন রচিত “পথ থেকে পথে” বইটিতে দেখা যায় বাংলাদেশের এক অনন্য রূপ। গ্রাম-বাংলার মায়া লাগানো বুলি থেকে গ্রামীণ মানুষের কষ্টের গাঁথা অব্ধি সব। সাংবাদিকতা করতে এসে মোনাজাতউদ্দিনের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা নিয়েই বইটি রচিত। প্রথম জীবনে সাংবাদিক হতে চাওয়ার সংগ্রাম থেকে একজন প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিক হওয়ার সব গল্পই এখানে বিদ্যমান। সত্য ঘটনা তুলে ধরতে একজন সাংবাদিককে দিতে হয় অগাধ শ্রম। ঠিক যেমন “তিতপল্লা” গ্রামে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার রিপোর্ট করতে ছুটে আসেন ময়মনসিংহ থেকে জামালপুরে। পরদিন ভোরেই আবার ছুটে যান ময়মনসিংহে। বন্যার কবলে গ্রামীণ মানুষদের দুর্দশার অবস্থা জানা যায় “মনতলার পথে” নামক গল্পে যেখানে একজন মানুষ খাদ্যাভাবে মধুয়া ঘাসের গোড়া চিবিয়ে খাচ্ছিল। এই সংবাদটি করতে গিয়েই তাকে পড়তে হয় ঝুঁকির মধ্যে যা আমরা বুঝতে পারি “আমাকে বলা হলো আপনি সরে থাকুন” লাইনটির মাধ্যমে। শুধুমাত্র তাই নয়, কুমিল্লা জেনারেল হাসপাতালে পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য গিয়ে তৎকালীন ইত্তেফাকের সাংবাদিক গোলাম মোস্তফা চৌধুরীর মারাত্মক আহত হওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ দিকগুলো ফুঁটে ওঠে। সাংবাদিকতা করতে লাগে হরেক কৌশল ও ভণিতা। হাসপাতালের ওষুধ পাচারের চোরাকারবারিদের ধরতে মিথ্যে বুক ব্যথার অজুহাতে মোনাজাত উদ্দিনকে ভর্তি হতে হয়েছিল হাসপাতালে।

আবার, একইভাবে ভণিতা ও কৌশল ব্যবহার করে “হাতিরদিয়া বাজার সমবায় সমিতি” -র জেলখানার সত্যতা উদঘাটন করেছিলেন তিনি। বিচিত্র সব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বিচিত্র সব পথ পাড়ি দিতে হয় একজন সাংবাদিককে। কুয়াশাচ্ছন্ন সামাজিক ঘটনা থেকে পরিষ্কার সত্য আবিষ্কার করাই যেন তার কাজ। শহুরে গদি গরম করা আয়েশি জীবন এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষদের জ্ঞানের সীমিত পরিসীমা, সব খবরই তাকে রাখতে হয়। জীবনের আনন্দময় মুহূর্ত বা যেকোনো উৎসবের আমেজ, পরিবার-পরিজনের সাথে ভাগাভাগি করে নেওয়াটা হয়ে যায় কষ্টকর। ঘড়ির কাঁটায় সময় ভাগ করতে গিয়ে দায়িত্বের বোঝায় সময় হয়ে উঠে না ভালোবাসার মানুষগুলোর জন্য। এইসব গাম্ভীর্যপূর্ণ অভিজ্ঞতার পাশাপাশি হাস্যরসাত্মক অভিজ্ঞতাও থাকে।বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জায়গায় অবস্থানের কারনে একজন সাংবাদিক বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের সাক্ষাৎ পায়। সমাজের বিভিন্ন মানুষের অভিজ্ঞতা এবং জীবন কাহিনী জায়গা পায় তার লেখায়।

সাংবাদিকতা করতে বিচক্ষণতার পাশাপাশি প্রয়োজন সাহসিকতা। সত্যকে তুলে ধরতে ভয়কে তুড়ি মেরে যেতে হয় সত্যের কাছাকাছি। বড় মহলের চাপ উপেক্ষা করে লক্ষ্য রাখতে হয় দৃঢ়। এমন সাহসিকতার প্রমাণ মেলে “হা উন্নয়ন!” নামক গল্পের “মলয় ভৌমিক” নামক চরিত্রে যেখানে তার মৃত্যুদন্ড ঘোষণা করা হলেও সে নির্ভয়ভাবে নিজ জেলাতেই অবস্থান করেন।সাংবাদিকদের কারনে দেশের অনেক অব্যবস্থাপনা ফুঁটে ওঠে। জনকল্যাণমুখী কাজের নামে সরকারি আমলাদের টাকা হজমের নেশা থেকে ট্রেনের ভাড়া নিয়ে কারসাজির দৌড়াত্ম অব্ধি সবই দেখা যায় সাংবাদিকের কলমের কালিতে। আরো দেখা যায় বিলাসবহুল প্রাচুর্যের আড়ালে হারিয়ে যাওয়া কাঙাল মানুষদের। ভিক্ষাবৃত্তিকে যাদের এখনো পেট চালানোর কায়দা হিসেবে বেছে নিতে হয়।

সাংবাদিকতা পেশাটি একটি স্বচ্ছ দর্পনের মতো সমাজ ও দেশের অবস্থা প্রতিফলিত করে, যা তুলে ধরে মানুষের জীবনযাত্রার মান এবং প্রসারিত করে সাধারণ মানুষের জ্ঞানের ভান্ডার।সাংবাদিকদের কাছে থাকে রাজনৈতিক অনেক তথ্য। বিভিন্ন কৌশলে এসব গোপন তথ্য আদায় করতে হয়। যেমনটি মোনাজাত উদ্দিন করেছিলেন “গোলাম আজম” -এর বাংলাদেশে এসে লুকিয়ে সভা-সমাবেশে বক্তৃতা করার সময়ে।এই ঘটনাটিতে দেখা গিয়েছিল সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিনের দারুণ বিচক্ষণতা। যেই ঘটনাটির মধ্যে ফুঁটে উঠেছিল সাংবাদিকদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য অর্থাৎ কিছু প্রতিবেদন তৈরী করতে সাংবাদিকদের ছোট বা নীচু হতে হলেও হওয়া লাগে। একজন সাংবাদিকের পরিচিত থাকে বিস্তর পর্যায়ের। চতুরতাপূর্ণ জাল, কপাট মানুষের সাথে তার পরিচয়ের পাশাপাশি মেধা এবং শ্রম দিয়ে জনকল্যাণমুলক কাজ করা মানুষেদের সাথেও তার দেখা হয়।ঠিক যেমন বইটিতে দেখা মিলে চতুর আলীর মতো লোক যে “বিশেষ উড়োজাহাজ” বানানোর নামে সরকারি টাকা আত্মসাৎ করে এবং দেখা মিলে রহমান মিয়ার সাথে যিনি মেধা খাটিয়ে সিমেন্টের টিউবওয়েল তৈরী করেন যেটির দাম কম হওয়াতে মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে ক্রয় করতে পারে। এভাবেই বিভিন্ন চরিত্র এবং বিভিন্ন ঘটনার সংমিশ্রণে রঙ্গিন এক অভিজ্ঞতার সৃষ্টি হয় সাংবাদিকদের জীবনে।

সাংবাদিকতায় প্রয়োজন বিশ্বাসযোগ্যতার। আর এই বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য একজন সাংবাদিককে প্রকৃত সত্য উপস্থাপন করা লাগে জনগণেরর কাছে। জীবনের সব চরম পরিস্থিতিতে নিজেকে প্রস্তুত রেখে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হয়ে কলম চালিয়ে যাওয়ার প্রতিজ্ঞা নিতে হয় তাকে। মানুষের প্রতি সমানুভূতিশীল হয়ে তার দুঃখ-দুর্দশার জানান দিতে হয় বৈরী পরিস্থিতি মোকাবিলা করে “পথ থেকে পথে” হেঁটে সত্যকে উদঘাটন করা এবং সাধারণ মানুষেসহ সমাজ ও দেশের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরাতেই একজন সাংবাদিকের জীবন নিহিত।

তানজিন আক্তার: স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের ৭৮তম ব্যাচের শিক্ষার্থী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *