তানভীর সিদ্দিক টিপু
‘মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়’ হলেও সেই স্বপ্ন পূরণের সাধ্য কি সবার হয়? হয়, যদি কেউ লক্ষ্যে অটুট থাকে তাহলে সে বড় টতে পারে স্বপ্নের সমান। আর সাহসী আর সৃজনশীল মানুষরা সেই পথে বা পা বাড়াতে দেরী করেন ন। তেমনই তিনজন স্বপ্নবাজ মানুষ জামিল উর রহমান, মীর হাসিব মাহমুদ এবং আলামিন প্রান্ত, যারা এগিয়ে যেতে চান তাদের উদ্যোগ নিয়ে।
তিনজনই স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ থেকে সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগে পড়ালেখা শেষ করেছেন। সাংবাদিকতা করার অপার স্বপ্ন চোখে নিয়ে এই বিষয়ে পড়া শুরু করেছিলেন। তবে চলতিপথে জীবনের রঙের সাথে বদলেছেন স্বপ্নের যাত্রাপথও। সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন উদ্যোক্তা হবেন। কণ্টকাকীর্ণ পথের কাঁটা সরিয়েছেন খুব যত্ন করে। তার কিছু হাতে বিঁধেছে, যন্ত্রণা সয়েছেন, তারপরেও ছিল এগিয়ে যাওয়ার আকুতি। তাইতো তিনজনই আজ উদীয়মান উদ্যোক্তা হিসেবে সবার নজর কেড়েছেন।
বিভাগের ৫৬ ব্যাচের শিক্ষার্থী জামিল উর রহমানের ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল সাংবাদিক হওয়ার। বিভিন্ন জিনিস দিয়ে খেলনা মাইক্রোফোন তৈরি করতেন। সাংবাদিকদের মতো কথা বলার চেষ্টা করতেন। সেই স্বপ্ন পূরণ করতে ভর্তি হয়েছিলেন সাংবাদিকতা বিভাগে। পড়া শেষে সাংবাদিকতা শুরুও করেছিলেন। কিন্তু চাঁপাইনবাবগঞ্জের ছেলে জামিল দেখলেন তারই এলাকার ঐতিহ্যবাহী ‘কালাই রুটি’ ঢাকার মানুষের কাছে বিশেষ পরিচিত না। আবার, ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে ঐতিহ্যবাহী খাবারটি। তাই চাকরি ছেড়ে ঠিক করলেন ঢাকাবাসীকে পরিচয় করিয়ে দেবেন কালাই রুটির সাথে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সাথে।

পরিবারের অনেকের আপত্তি থাকলেও জামিল জানতেন তিনি সফল হবেন। হয়েছেনও। ঢাকা শহরের মানুষের কালাই রুটির স্বাদ নিতে এখন সদলবলে হাজির হচ্ছেন ঢাকার মোহাম্মদপুরের নূরজাহান রোডে জামিলের ‘কালাই রুটির আড্ডা’য়। অবস্থানটা সহজ করে বললে মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজের গলিতে। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে উদ্বোধন হয় রেস্টুরেন্টটি। এর ঠিক পাঁচ মাসের মাথায় খিলগাঁও-এ আরও একটি শাখা চালু করা হয়েছে। সপ্তাহে সাতদিন দুপুর ১২:৩০ টা থেকে রাত ১১ টা পর্যন্ত খোলা থাকে ‘কালাই রুটির আড্ডা’। করোনার সময়ে বাসা থেকে বের হতে না পারলেও আছে ফুড পান্ডা কিংবা পাঠাও এর মাধ্যমে ঘরে বসে অর্ডার করার সুযোগ।

একই বিভাগের ৫৭ ব্যাচের দুই বন্ধু মীর হাসিব মাহমুদ এবং আলামিন প্রান্ত। পড়ালেখার পাঠ চুকিয়ে একদিন বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিলেন চায়ের দোকানে। দেশের স্বাস্থ্যখাতের দুরবস্থা হৃদয় স্পর্শ করে তাদের। বিশেষ করে দেশের প্রান্তিক পর্যায়ে বসবাসরত মানুষের স্বাস্থ্য বিষয়ক সচেতনতা বাড়াতে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। প্রান্তিকের মানুষ ঢাকায় চিকিৎসা নিতে আসে না সহজে। আবার, ঢাকার বড় ডাক্তারদের পক্ষেও সেখানে গিয়ে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয় না। তাই, প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে শহরের ডাক্তারদের গ্রামের মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে উদ্যোগী হন তারা। গড়ে তোলেন টেলিমেডিসিন সেবা প্রতিষ্ঠান ‘বেস্টএইড’।

২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে যাত্রা শুরু করে বেস্টএইড। অনলাইনে দেশের ডাক্তারদের পাশাপাশি বিদেশের ডাক্তারদের সেবাও পাচ্ছেন মানুষ। বেস্টএইডর সিইও মীর হাসিব মাহমুদ বলছিলেন, এখন পর্যন্ত প্রায় ২০ হাজার মানুষকে সেবা দিতে পেরেছেন তারা। কিশোরগঞ্জ এবং মাদারীপুরে তাদের কর্মীরা মানুষকে এই সেবা পৌঁছে দিতে কাজ করছেন। অনলাইনের মাধ্যমে দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে সেবা নিতে পারবেন যে-কেউ। যেকোনো স্বাস্থ্যগত সমস্যার জরুরি সমাধান পেতে হটলাইনে যোগাযোগ করতে পারেন +8801533443118 নাম্বারে অথবা ফেসবুক পেজ https://www.facebook.com/bestaidbd/ তে।

স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীগণ মূলত দুইটি বিষয়ে অধ্যয়ন করেন। একটি সাংবাদিকতা, অন্যটি গণযোগাযোগ। আলামিন প্রান্ত বলছিলেন, ‘সাংবাদিকরা মানুষের কথা তুলে ধরে। তারা সাধারণ মানুষের ভাবনা বুঝতে পারে। ফলে, সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্রদের পক্ষে মানুষের কাছে পৌঁছানো অনেক সহজ হয়।’
আগে সাংবাদিকের চোখে তারা মানুষের সমস্যাগুলো দেখতে পেতেন, মানুষের কাছে তুলে ধরতেন। এখন উদ্যোক্তা হয়ে সেই সমস্যার সমাধান নিজ হাতেই করতে পারছেন। আর এই কাজে তিনজনেই বেশ তৃপ্ত।
