তানভীর সিদ্দিক টিপু
বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাব থেকে বিশ্বকে বাঁচাতে চাইলে হাতে সময় খুব বেশি নেই। জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকানোর প্রচেষ্টায় ২০২১ সালটা তাই খুব গুরুত্বপূর্ণ। এর কী কারণ, তার একটা ব্যাখ্যা দিয়েছেন বিবিসির প্রধান পরিবেশ প্রতিবেদক জাস্টিন রৌলাট। তিনি মোটা দাগে পাঁচটি বিষয়কে প্রাধান্য দিয়েছেন।
১. গ্লাসগো জলবায়ু সম্মেলন ২০২১
২০১৫ সালের ঐতিহাসিক প্যারিস সম্মেলনে প্রথমবারের মতো বিশ্বের সব দেশই কার্যত জলবায়ু ইস্যুতে একমত হয়েছিল। কিন্তু প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দেশগুলো কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। তখন সবাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, এই শতকের শেষ নাগাদ বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির পরিমাণ যেন শিল্পায়ন-পূর্ব সময়ের থেকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত থাকবে। সম্ভব হলে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে রাখা হবে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় ১২ বছরের মধ্যেই উষ্ণতা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়াবে; শতাব্দীর শেষে তা উঠবে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে।
প্যারিস চুক্তি অনুসারে দেশগুলো পাঁচ বছর পরপর হবে এই সম্মেলন। কার্বন নিঃসরণ কমাতে তাদের অভিমত জানাতে একত্র হবেন তারা। সে হিসাবে পরবর্তী সম্মেলন হতে পারত ২০২০ সালের নভেম্বরে। করোনা পরিস্থিতিতে তা পিছিয়ে যায়। আসছে নভেম্বরে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো শহরে জড়ো হবেন বিশ্বনেতারা। তখন কার্বন নিঃসরণ কমানোর চেষ্টা জোরদারের ঘোষণা আসতে পারে।
২. বড় থেকে ছোট সবাই কাজ করছে
ইতিমধ্যে অগ্রগতি দেখেছে বিশ্ব। সবচেয়ে বড় ঘোষণাটা এসেছে চীনের কাছ থেকে। গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং বলেন, ২০৬০ সাল নাগাদ কার্বন-নিরপেক্ষ হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে তাঁর দেশ। বিশ্বের কার্বন নিঃসরণের ২৮ শতাংশই চীন থেকে হয়।
অবশ্য আগেই এমন ঘোষণা দিয়েছে বিশ্বের অন্যতম বড় অর্থনীতি যুক্তরাজ্য। ২০১৯ সালের জুনে প্রথম দেশ হিসেবে তারা কার্বন-নিরপেক্ষ দেশ হওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। ২০২০ সালের মার্চে একই ঘোষণা আসে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকেও। পরে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াসহ ১১০টির মতো দেশ একই পথে হেঁটেছে। শতাব্দীর মাঝামাঝি নাগাদ কার্বন-নিরপেক্ষ দেশ হওয়ার লক্ষ্য তাদের।
৩. নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন সবচেয়ে সস্তা
নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন যেকোনো সময়ের চেয়ে সস্তা। অনেক দেশেই এখন জীবাশ্ম জ্বালানির চেয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ কম। যদি দেশগুলো আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বায়ু, সৌরশক্তি এবং ব্যাটারি খাতে তাদের বিনিয়োগ বাড়াতে পারে, তবে দাম এতটাই কমবে যে সবাই বিদ্যমান কয়লা-গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো গুটিয়ে নেবে।
২০২০ সালের অক্টোবর মাসে, ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি জানিয়েছে, সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো এখন ইতিহাসের সবচেয়ে সস্তা বিদ্যুতের উৎস। নবায়নযোগ্য জ্বালানির খরচটা উৎপাদন খাতের মৌলিক যুক্তিটাকে অনুসরণ করে—যত বেশি উৎপাদন, তত বেশি সস্তা।
৪. করোনা বদলে দিয়েছে সবকিছু
মানুষ এতদিন ভাবতো আমাদের শিকড়টা খুব মজবুত। সেই বিশ্বাসে চিড় ধরিয়েছে করোনাভাইরাস। এখন মনে হচ্ছে, পৃথিবীটা এমনভাবে শেষ পরিণতির দিকে যেতে পারে, যার নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে নেই। আবার, করোনায় ভর করে এসেছে বিরাট অর্থনৈতিক ধাক্কা, যা ত্রিশের দশকের মহামন্দার পর সবচেয়ে ভয়ংকর।
অর্থনীতির ক্ষত সারতে সরকারগুলো বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ নিয়েছে। সুখবরটা হচ্ছে, এখন বিনিয়োগের পথটা খুব সহজ হয়ে গেছে। বিশ্বব্যাপী সুদহার ঘুরছে শূন্যের কাছাকাছি, এমনকি নেতিবাচক দিকেও। এই সুযোগ নিচ্ছে ইইউ এবং বাইডেনের নেতৃত্বাধীন নতুন মার্কিন প্রশাসন। তারা অর্থনীতি সচল রাখতে ও কার্বন নিঃসরণ কমাতে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এসব পদক্ষেপ বিশ্বব্যাপী নবায়নযোগ্য জ্বালানির দাম কমাবে। তারা অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলোর পণ্যে বাড়তি কর বসানোর ঘোষণাও দিয়েছে।
৫. পরিবেশবান্ধব ব্যবসায় আগ্রহ বাড়ছে
জলবায়ু ইস্যুতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরে বরাবরই জনচাপ থাকে। এর সঙ্গে তারা নবায়নযোগ্য জ্বালানির পড়তি দাম বিবেচনায় নিচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানই পরিবেশবান্ধব হতে সচেষ্ট। এখানে আর্থিক কারণও রয়েছে। কিছুদিন বাদেই তেল-কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সেকেলে হয়ে যাবে। সুতরাং এমন প্রতিষ্ঠানে বা তেলকূপ খননে কেন অর্থ ঢালবেন? কেনই–বা কার্বন-ঝুঁকির বদনাম নেবেন? এসব যুক্তি বাজারে চলছেও বেশ। এ বছরই টেসলার শেয়ারের দাম আকাশ ছুঁয়েছে। বিশ্বের গাড়ি কোম্পানিগুলোর মধ্যে এটি এখন সবচেয়ে দামি। অন্যদিকে এক্সন কোম্পানির শেয়ারের দাম তলানিতে ঠেকেছে। একটা সময় তারাই ছিল বিশ্বের সব খাতের মধ্যে সবচেয়ে দামি কোম্পানি। ‘ডো জোনস ইন্ডাস্ট্রিয়াল এভারেজ’ থেকে ছিটকে পড়েছে এক্সন। ডো জোনস ইনডেক্সে স্থান পায় যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ৩০টি বৃহৎ করপোরেশন।
সূত্রঃ বিবিসি
