দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে প্রকাশনা শিল্পের সাথে জড়িত ফাতেমা-তুজ-জোহরা। তার প্রকাশনা সংস্থার নাম সাঁকোবাড়ি প্রকাশন। বর্তমান যুগে বই প্রকাশের অভিজ্ঞতা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে চারদিক২৪ ডট কম এর সাথে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আরাফাত হোসেন তরফদার।
চারদিক২৪: : প্রকাশক হিসেবে বই প্রকাশের ক্ষেত্রে কী কী ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়?
ফাতেমা-তুজ-জোহরা: বই প্রকাশের প্রক্রিয়াটা অনেক জটিল। প্রথমত, ভালো মানের পান্ডুলিপি খুঁজে পাওয়া কঠিন, কারণ সব লেখাই পাঠকের মন জয় করতে পারে না। দ্বিতীয়ত, মুদ্রণ খরচ দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে, ফলে মানসম্মত বই প্রকাশ করতে গিয়ে ব্যয়ও বেড়ে যায়। তৃতীয়ত, বিপণন ও বিতরণের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বইমেলা বা নির্দিষ্ট কিছু বিক্রয় উৎসব ছাড়া সারাবছর বই বিক্রি ধরে রাখা কঠিন হয়ে যায়।
চারদিক২৪: বর্তমানে অনলাইনে পিডিএফ ছড়িয়ে পড়া বা পাইরেসি বই প্রকাশের ক্ষেত্রে কতটা হতাশাজনক ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে?
ফাতেমা-তুজ-জোহরা: পাইরেসি আমাদের প্রকাশনা শিল্পের জন্য বড় হুমকি। একজন লেখক কিংবা প্রকাশক অনেক সময় ও শ্রম ব্যয় করে বই প্রকাশ করেন, কিন্তু পাইরেসির ফলে বইটি বিনামূল্যে সহজলভ্য হয়ে যায়। এতে বই বিক্রি কমে যায় এবং আমরা আর্থিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হই। নতুন লেখকেরাও এতে হতাশ হন, কারণ তারা তাদের বই বিক্রি থেকে যথাযথ প্রাপ্য সম্মানী পান না।
চারদিক২৪: এ যুগে অনেক সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারই বই বের করছেন, এই ব্যাপারটিকে আপনি কিভাবে দেখেন?
ফাতেমা-তুজ-জোহরা: এটা দুইভাবে দেখা যায়। একদিকে, সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সাররা বই লিখছেন বলে পাঠকের সংখ্যা বাড়ছে, নতুন প্রজন্ম বইয়ের প্রতি আগ্রহী হচ্ছে। অন্যদিকে, অনেক সময় দেখা যায়, তারা কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে জনপ্রিয় হলেও সাহিত্যিক হিসেবে ততটা দক্ষ নন। ফলে, অনেক নিম্নমানের বই বাজারে আসছে, যা প্রকৃত পাঠকের জন্য হতাশাজনক। তবে যদি ইনফ্লুয়েন্সাররা মানসম্পন্ন বই লেখেন এবং পাঠকদের সত্যিকার অর্থে সমৃদ্ধ করতে পারেন, তবে এটা ইতিবাচক দিক।
চারদিক২৪: বর্তমান অনেক প্রকাশক কিংবা লেখকই তাদের বইয়ের প্রমোশন সোশ্যাল মিডিয়ায় করে থাকেন। আমাদের প্রবীণ লেখক কিংবা প্রকাশকেরা প্রমোশন কিংবা প্রচারের নতুন এ স্টাইলের সাথে খাপ খাওয়াতে পেরেছে বলে আপনি মনে করেন?
ফাতেমা-তুজ-জোহরা: কিছু প্রবীণ লেখক ও প্রকাশক অবশ্যই সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার চেষ্টা করছেন, তবে অনেকেই এখনো এই ডিজিটাল বিপ্লবের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেননি। সোশ্যাল মিডিয়ায় বইয়ের প্রচারণা এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পাঠকরা এখন অনলাইনেই বইয়ের রিভিউ খোঁজেন, লেখকের কথা শুনতে চান। তাই যারা এখনো এই মাধ্যম ব্যবহার করছেন না, তারা এক ধরনের ব্যাকফুটে রয়েছেন। তবে তরুণ লেখক ও প্রকাশকরা এ ক্ষেত্রে বেশ দক্ষভাবে এগোচ্ছেন।
চারদিক২৪: যুগের সাথে পাঠকের রুচিবোধে কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে বলে আপনি মনে করেন?
ফাতেমা-তুজ-জোহরা: পাঠকদের রুচিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। আগের মতো শুধু উপন্যাস বা কবিতা নয়, এখন পাঠকেরা গবেষণাধর্মী লেখা, জীবনী, ডকুমেন্টারি স্টাইলের লেখা, সাইকোলজি বা সেলফ-হেল্প বইয়ের প্রতি বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন। ফিকশন থেকেও অনেক সময় নন-ফিকশন বই বেশি জনপ্রিয় হচ্ছে। এছাড়া, তরুণ প্রজন্মের পাঠকরা সংক্ষিপ্ত, সহজ ভাষায় লেখা বই পছন্দ করেন। বড় ও জটিল সাহিত্যকর্মের তুলনায় তারা সহজবোধ্য ও তথ্যবহুল বইয়ের প্রতি বেশি ঝুঁকছেন।
চারদিক২৪: বই প্রকাশে তরুণ লেখকদের আগ্রহ কেমন? আপনারা তাদের কিভাবে মূল্যায়ন করেন?
ফাতেমা-তুজ-জোহরা: তরুণ লেখকদের বই প্রকাশে আগ্রহ অনেক বেড়েছে, বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে। তারা সহজেই তাদের লেখার প্রচার করতে পারেন, পাঠকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন। আমরা প্রকাশকরা তরুণদের জন্য প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে চাই, তবে অবশ্যই গুণগত মানের ব্যাপারে সচেতন থাকতে হয়। শুধুমাত্র জনপ্রিয়তা বা ফলোয়ার সংখ্যা দেখে বই প্রকাশ করলে দীর্ঘমেয়াদে এর ক্ষতি হতে পারে। তাই আমরা নতুন লেখকদের উৎসাহ দেই, কিন্তু তাদের লেখা যেন মানসম্মত হয়, সেটাও নিশ্চিত করার চেষ্টা করি।
চারদিক২৪: আপনি নিজেও একজন মুক্তিযোদ্ধা। আপনার মতে, বর্তমান জেনারেশনের মুক্তিযুদ্ধের বইয়ের প্রতি আগ্রহ কিংবা চাহিদা কেমন?
ফাতেমা-তুজ-জোহরা: মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তরুণদের আগ্রহ আছে, তবে সেটা নির্ভর করে উপস্থাপনার ওপর। পুরনো তথ্যগুলোর পাশাপাশি নতুন গবেষণা, নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে মুক্তিযুদ্ধকে তুলে ধরলে তরুণ পাঠকরা বেশি আকৃষ্ট হয়। অনেকেই মুক্তিযুদ্ধকে শুধুমাত্র ইতিহাসের অংশ হিসেবে দেখে, কিন্তু যদি গল্প, উপন্যাস, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, বা গবেষণালব্ধ তথ্যের মাধ্যমে নতুনভাবে উপস্থাপন করা যায়, তবে আগ্রহ বাড়বে। এছাড়া, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক ভুল তথ্যও ছড়িয়ে পড়ে, তাই নির্ভরযোগ্য বই প্রকাশ করাও গুরুত্বপূর্ণ।
চারদিক২৪: বর্তমানে অডিও বুক আর ই-বুকের ব্যবহার বাড়ছে, এ বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখছেন?
ফাতেমা-তুজ-জোহরা: অডিও বুক ও ই-বুকের জনপ্রিয়তা বেড়েছে, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে। অনেকেই মোবাইলে বা ট্যাবলেটে বই পড়তে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, আবার অনেকে সময় বাঁচানোর জন্য অডিও বুক শোনেন। এটি প্রকাশকদের জন্য এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে, তবে আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে এই প্ল্যাটফর্মগুলোতে বইগুলোর পাইরেসি যেন না হয়। তাছাড়া, অডিও বুক ও ই-বুক কখনোই প্রিন্ট বইয়ের বিকল্প হতে পারবে না, বরং এটি একটি সম্পূরক মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে।
চারদিক২৪: ধন্যবাদ, আপনার অভিজ্ঞতা ও বিশ্লেষণ থেকে অনেক কিছু জানার সুযোগ হলো।
ফাতেমা-তুজ-জোহরা: আপনাকেও ধন্যবাদ, বইপ্রেমীদের জন্য এ ধরনের আলোচনা খুবই দরকার।
