সাইবার জগতে নিরাপত্তার খোঁজে

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

চারদিক ডেস্ক

আপনি অফিসে কর্মব্যস্ত সময় পার করছেন। দম ফেলার ফুরসত পাচ্ছেন না। অসংখ্য মেইল দেখতে ও পাঠাতে হচ্ছে। এমন সময় একটি মেইলে আপনার চোখ আটকে গেল। মেইলটি করেছেন আপনার অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। খুব জরুরী নির্দেশনা, এখনই লিংকে ক্লিক করে যাবতীয় তথ্য ফিরতি মেইলে পাঠাতে হবে। আপনি লিংকে ক্লিক করার সাথে সাথে আপনার কম্পিউটারের নিয়ন্ত্রণ পেয়ে গেল কুচক্রী একদল হ্যাকার।

শুনতে অবাক লাগলেও, বিষয়টি এখন খুবই সাধারণ। ইন্টারনেটের উপর মানুষের ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতার যুগে ক্ষণিকের নিয়ন্ত্রণহীনতাই আপনাকে টেনে নিতে পারে খাদের অতল গহ্বরে। হ্যাকারের আক্ষরিক অর্থ হচ্ছে, এমন ব্যক্তি যিনি আপনাকে না বলে কয়ে, আপনার মূল্যবান তথ্য হস্তগত করে। মানে; আমাদের গ্রাম বাংলার এককালের দুর্বার ও দুর্ধর্ষ সিধ কেটে আপনার মূল্যবান জিনিস হস্তগত করার মত আরকি। তবে এক কালের হ্যাকারেরা সেকালের ফর্মুলা ব্যবহার করে না। তারা এখন বেশ স্মার্ট, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অন্তর্জাল ভেদ করে আপনার তথ্য হস্তগত করার চেষ্টা করে। সাইবার ক্রাইম নির্মূল এবং এসব হ্যাকারদের শায়েস্তা করতে উদয় ঘটে এথিক্যাল হ্যাকারদের। যারা তাদের বুনন করা সব বেআইনি জাল কেটে দিতে দক্ষ এবং বদ্ধপরিকর। তবে পৃথিবীতে এথিক্যাল হ্যাকারদের চেয়ে হ্যাকারদের সংখ্যা বেশি। কারণ, শখের বশে হ্যাকিং করতে গিয়ে অনেক তরুণ-তরুণী অপরাধ জগতে নিজেদের জড়িয়ে ফেলে। প্রতিবছর শুধু এই অপরাধের শিকার হয়ে বহু প্রতিষ্ঠান কোটি কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছে। এমনকি মানুষেরাও হচ্ছেন নাস্তানাবুদ। তবে ইথিক্যাল হ্যাকারদের জন্য সব ক্ষতিকর প্রভাবের ইতি টানা সম্ভব হয়েছে। তারা বিভিন্ন প্রকার সাইবার হামলার প্রতিকার বের করছে, যাতে সেই হামলার শিকার হয়ে বহু ক্ষতির সম্মুখীন না হতে হয়। তারা গবেষণা করে চলেছে, কী প্রক্রিয়ায় সাইবার হামলা চালানো যায় এবং কীভাবে তা রোধ করা সম্ভব। জেনে আসা যাক কিছু হ্যাকিংয়ের প্রক্রিয়া এবং এর থেকে রেহাই পাওয়ার উপায়।

১) সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং:

সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং মূলত মনস্তাত্ত্বিকভাবে কাউকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রক্রিয়াকে বোঝায়। কোন টেকনোলজি ব্যবহার না করে সরাসরি ভুক্তভোগীকে মানসিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করে তার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করা। ভুক্তভোগীর বিশ্বাস, ভয়, কৌতূহল, লোভ ও সহানুভূতিশীলতা ব্যবহার করার মাধ্যমে তার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করা। যেমন ধরা যাক, একটি ফেইক মেইল পাঠানো হলো যাতে লেখা আছে ব্যাংক অ্যাকাউন্টটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে, অ্যাকাউন্টটি পুনরায় সচল করতে হলে নিম্নোক্ত লিংকে ক্লিক করুন। কিংবা, আপনার অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নামে মেইল পাঠানো হয়েছে, তাতে লেখা নিম্নোক্ত লিঙ্কে ক্লিক করে প্রয়োজনীয় তথ্য বা ফাইল সাবমিট করুন। অথবা, আপনার নিকটস্থ থানার নামে মেইল বা খুদেবার্তা আসবে, তাতে লেখা এনআইডি সরকারিভাবে ভেরিফাই করার জন্য নিম্নোক্ত থানার দেয়া লিঙ্কে ঢুকুন। উপরের সবগুলো উদাহরণে ভুক্তভোগীকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য এক ধরনের প্রক্রিয়া ব্যবহার করা হয়েছে এটি মূলত সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং। মানুষের স্পর্শকাতর অনুভূতিগুলোকে কাজে লাগিয়ে হ্যাকার তার নিজের কার্যসিদ্ধি করে।

 

২) মালওয়্যার:

মালওয়্যার সবচেয়ে পুরনো এবং কার্যকর পদ্ধতিগুলের একটি। এখনো এর ব্যবহার অনস্বীকার্য। এর মাধ্যমে তথ্য চুরি, সিস্টেম ড্যামেজ, গুপ্তচরবৃত্তি, ডিভাইসের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া ও তথ্য এনক্রিপ্ট করা হয়ে থাকে। এর মাধ্যমে কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে পুরোপুরি অচল কিংবা দীর্ঘসময়ের জন্য অকার্যকর করা হয়ে থাকে। মালওয়্যার এর কিছু ধরন আছে, যেমন ভাইরাস, এটি কোন প্রোগ্রাম কিংবা ফাইল এর মাধ্যমে কম্পিউটার সিস্টেম কিংবা মোবাইলে আক্রমণ চালায় এবং সেখানে জমে থাকা তথ্য, ডিভাইস এমনকি পুরো সিস্টেমকে আক্রান্ত করতে পারে। ট্রোজেন, এটি মূলত সচরাচর ব্যবহৃত কোন অ্যাপস, ফাইল কিংবা কোন সফটওয়্যার এর ভিতরে লুকিয়ে থাকে এবং সেই ফাইল, সফটওয়্যার কিংবা অ্যাপ্লিকেশনটি ব্যবহার করার সময় ট্রোজেনটি পুরো সিস্টেমে ছড়িয়ে পড়ে এবং এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে থাকে। রেনসামওয়ার, এটি মূলত এমন একটি সফটওয়্যার যার দ্বারা সম্পূর্ণ সিস্টেমে ছড়িয়ে থাকা তথ্যগুলোকে এনক্রিপ্ট করে রাখে। এবং হ্যাকার ভুক্তভোগীকে ব্ল্যাকমেইল করার মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করে থাকে। স্পাইওয়্যার, এটি এমন একটি সফটওয়্যার যেটি কোন সিস্টেমে প্রবেশ করে নিরবে নজরদারি করে থাকে। এতে করে ব্যবহারকারী কিভাবে সিস্টেমকে ব্যবহার করছে কিংবা তার সকল গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করতে শুরু করে। এ ধরনের সফটওয়্যার মূলত গোয়েন্দা সংস্থা ব্যবহার করে থাকে। কি-লগার, এটি মূলত ডিভাইস কিংবা কোন সিস্টেমে প্রবেশ করে নিরবে পর্যবেক্ষণ করে এবং কিবোর্ডের মাধ্যমে যাই টাইপ করা হোক না কেন তার তথ্য হ্যাকারকে প্রদান করে থাকে।

 

৩) নেটওয়ার্ক অ্যাটাক:

এক্ষেত্রে হ্যাকাররা মূলত কোন ডিভাইস সার্ভার কিংবা কোন নেটওয়ার্কের যোগাযোগ মাধ্যম গুলোকে ব্যবহার করে, তথ্য চুরি করার জন্য। এই যোগাযোগ মাধ্যম হতে পারে কোন ওয়াইফাই রাউটার, ওয়েব সাইট, সার্ভার কিংবা কোন কানেকশন ডিভাইস। নেটওয়ার্ক এটাকিং এর কিছু ধরন আছে যেমন এম আই টি এম, এটিকে মূলত ম্যান ইন দ্যা মিডিল অ্যাটাক বলা হয়। হ্যাকার কোন পাবলিক ওয়াইফাই ডিভাইসের মাধ্যমে দুজন ব্যক্তির বা দুইটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যকার কমিউনিকেশনকে ইন্টারসেপ্ট করে এবং সেখানে প্রেরিত কোন তথ্য, কোন ফাইল কিংবা কোনো বার্তা পরিবর্তন করে পুনরায় প্রেরণ করতে পারে কিংবা চুরি করতে পারে। প্যাকেট স্নিফিং, এখানে একজন হ্যাকার কোন পাবলিক ওয়াইফাই কিংবা কোন আনএনক্রিপটেড ওয়েবসাইটের জমে থাকা তথ্য যেমন পাসওয়ার্ড, ব্রাউজিং হিস্ট্রি, কুকিস ইত্যাদি চুরি করতে পারে। ডিডিওএস অ্যাটাক, এখানে কোন হ্যাকার কোন একটি ওয়েবসাইটের প্রবেশ অধিকার বন্ধ করে দিতে পারে কিংবা সম্পূর্ণ ওয়েবসাইটকে বন্ধ করে দিতে পারে। ডি এন এস স্পুফিং, এখানে হ্যাকার কোন একটি ওয়েবসাইটের ডোমেইন পরিবর্তন করে নিজের তৈরি করা কোনো ওয়েবসাইটের সঙ্গে লিংক করে দিতে পারে। এতে করে কেউ যদি তার পরিচিত কোন ওয়েবসাইটের ঠিকানা লিখে টাইপ করে তবে এই ওয়েবসাইটে প্রবেশ না করে বরং হ্যাকারের বদলে দেয়া ওয়েবসাইটে গিয়ে প্রবেশ করবে। ধরা যাক, কোন হ্যাকার যদি কোন নির্দিষ্ট নেটওয়ার্কে “ফেসবুক ডট কম” ডোমেইনের ভেতর নিজের বানানো ডোমেইন যুক্ত করে দিতে পারে তবে সেই নেটওয়ার্কে যতবারই “ফেসবুক ডট কম” লিখে সার্চ করা হলেও, হ্যাকারের লিংক করা ওয়েবসাইটটি বারংবার ওপেন হবে।

 

৪) ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন অ্যাটাক:

এর মাধ্যমে হ্যাকার কোন ওয়েবসাইট, অনলাইন প্লাটফর্ম অথবা ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন হ্যাকিং এর মাধ্যমে তথ্য চুরি করে থাকে। যেমন এসকিউএল ইনজেকশন, এর মাধ্যমে হ্যাকার কোন ওয়েবসাইট থেকে ব্যবহারকারী ইউজারনেম পাসওয়ার্ড এবং সেখানে জমা রাখা তথ্য চুরি করে থাকে। ই-কমার্স এবং ফর্ম টেম্পারিং, এর মাধ্যমে হ্যাকার কোন ফেক ই-কমার্স ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ভুক্তভোগীর ক্রেডিট কার্ড কিংবা ডেবিট কার্ড এর তথ্য পাসওয়ার্ড সংগ্রহ করে থাকে।

 

৫) ফিজিকাল অ্যাটাক:

 

এখানে হ্যাকার সশরীরে কোন ডিভাইস বা সিস্টেম এর এক্সেস নিয়ে তথ্য চুরি করে কিংবা পরিবর্তন করে। এর কিছু ধরন আছে যেমন, ডিভাইস থেফট, হ্যাকার কোন একটি ল্যাপটপ, মোবাইল, এক্সটার্নাল হাইড্রাইভ, ইউএসবি ডিভাইস কিংবা ট্যাবলেট চুরি করে এবং ভুক্তভোগীদের তথ্য সংগ্রহ করে। ইভিল মেড অ্যাটাক, এখানে হ্যাকার কোন একটি ভাইরাস কিংবা মালওয়ার কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সিস্টেমে ইন্সটল করার মাধ্যমে সেই সিস্টেমের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। হার্ডওয়্যার টেম্পারিং, এখানে হ্যাকার কোন ওয়াই-ফাই রাউটার কিংবা সিকিউরিটি ক্যামেরা কিংবা চার্জিং স্টেশন ইত্যাদির সিস্টেম হ্যাক করার মাধ্যমে এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে থাকে এবং সিস্টেমে লগইন করা ইউজারের তথ্য চুরি করে থাকে। শোল্ডার সার্ফিং, এখানে হ্যাকার কোনো একজন ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়িয়ে তার ফোনের পাসওয়ার্ড কিংবা পিন কোড কিংবা লক স্ক্রিন প্যাটার কিংবা ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ডের পাসওয়ার্ড দেখার মাধ্যমে পরবর্তীতে সেগুলোকে তথ্য এবং অর্থ চুরি করার ক্ষেত্রে ব্যবহার করে।

 

প্রতিরোধ:

১) ভেবেচিন্তে যুক্তিসহকারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

২) কখনোই নিজের ডিভাইস বা সিস্টেমের পাসওয়ার্ড কিংবা ওটিপি অন্য কাউকে জানানো যাবে না।

৩) কোন ধরনের অচেনা লিংক ক্লিক করা যাবে না। কোন ধরনের লিংক পেয়ে থাকলে সেটি ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

৪) টু ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন চালু করতে হবে।

৫) কোন ধরনের অচেনা ইউএসবি কম্পিউটার বা সিস্টেমে প্লাগইন করা যাবে না।

৬) এন্টিভাইরাস ব্যবহার করতে হবে।

৭) নিজের সিস্টেম সবসময় আপডেট রাখতে হবে।

৮) ক্রেক সফটওয়্যার ব্যবহার থেকে দূরে থাকতে হবে।

৯) সিস্টেমের ফায়ারওয়াল এনাবেল করতে হবে।

১০) শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করতে হবে।

১১) ওয়েব এপ্লিকেশনে অ্যাড ব্লকার ব্যবহার করতে হবে।

১২) এইচটিটিপিএস ওয়েবসাইট ছাড়া সারফিং করা যাবে না।

১৩) পাবলিক ওয়াইফাই ব্যবহার থেকে দূরে থাকতে হবে।

১৪) ডিভাইস এবং সিস্টেমের সিকিউরিটি সম্পর্কে প্রতিনিয়ত নতুন জ্ঞান আহরণ করতে হবে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *