ওয়াই-ফাইয়ের ঘরোয়া সমস্যা ও সমাধান

ফিচার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

মোহাম্মদ জাওয়াদ ইসলাম

 

আমাদের অনেকের কাছেই ওয়াই-ফাই এখন বিদ্যুৎ বা পানির মতো অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। আমরা বাড়ি থেকে কাজ করতে, অনলাইন ক্লাসে যোগ দিতে, সিনেমা দেখতে, প্রিয়জনদের সাথে ভিডিও চ্যাট করতে, স্মার্ট হোম ডিভাইস পরিচালনা করতে, এমনকি রাতের খাবার অর্ডার করতেও এর উপর নির্ভর করি। তবুও ভিডিও চলতে চলতে থেমে যায়, জুম মিটিংয় আটকে যায়, বা ওয়েব পেজ হিমবাহের গতিতে লোড নিতে থাকে; এমন দৃশ্য দেখলে হতাশ হওয়া ছাড়া আর কোন উপায় অবশিষ্ট থাকেনা।

ওয়াই ফাই ধীর হয়ে গেলে বেশিরভাগ মানুষ তাদের ইন্টারনেট পরিষেবা প্রদানকারীকে দোষারোপ করতে থাকে। কখনো কখনো আবার তারা দোষীও হয় বটে; কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে প্রায়শই সমস্যাটি আমাদের আরো কাছাকাছি-ই অবস্থান করে। ওয়াইফাই সংকেত মূলত বেতার তরঙ্গের মতো অদৃশ্য। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এমন সব বস্তু ও পরিস্থিতির কারণে এগুলো দুর্বল, প্রতিফলিত, অবরুদ্ধ, বাধা গ্রস্ত হতে পারে যা আমরা বেশির ভাগ সময় কখনো সন্দেহ করি না। নির্ভরযোগ্য ওয়ারলেস সংযোগের সবচেয়ে বড় কিছু শত্রু আমাদের চোখের সামনেই লুকিয়ে থাকে।

সম্ভবত ওয়াইফাই এর সবচেয়ে বিখ্যাত খলনায়ক হলো মূলত মাইক্রোওয়েভ ওভেন। অনেক ওয়াইফাই রাউটার ২.৪ গিগাহার্জ ফ্রিকুয়েন্সিতে কাজ করে, যা খাবার গরম করার জন্য মাইক্রোওয়েভ ওভেনের থেকে বের হওয়া ফ্রিকোয়েন্সির কাছাকাছি। যদিও মাইক্রোওয়েভ ওভেন গুলো তাদের ফ্রিকোয়েন্সির বিকিরণ নিরাপদে আবদ্ধ রাখার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে, তবুও সামান্য পরিমাণে যান্ত্রিক ত্রুটি কিংবা অন্য কোন কারণে ফ্রিকোয়েন্সি বাইরে বিকিরণ করতে পারে। বিশেষ করে পুরনো যন্ত্র বা ক্ষতিগ্রস্ত দরজার সিল থেকে থাকলে। যদি কেউ বাসি খাবার গরম করার সময় আপনার ইন্টারনেট সংযোগ রহস্যজনকভাবে ধীরগতির হয়ে যায়, তবে সম্ভবত আপনি ভুল ভাবছেন না। এর সমাধান খুবই সহজ, যদি আপনার রাউটার ডুয়েল ব্যান্ড বা ট্রিপল ব্যান্ড ওয়াইফাই সমর্থন করে থাকে তবে পাঁচ গিগাহার্জ কিংবা ৬ গিগাহার্জ ফ্রিকোয়েন্সি ধারণকৃত ওয়াইফাই রাউটার সংযুক্ত করুন। এগুলো মাইক্রোওয়েভের ইন্টারফিয়ারেন্স দ্বারা অনেক কম প্রভাবিত হয় এবং সাধারণত কম দূরত্বে দ্রুত গতি প্রদান করে থাকে। এবং অবশ্যই মাইক্রোওয়েভ এর থেকে ওয়াইফাই রাউটারকে দূরে রাখতে হবে।

একুরিয়াম ঘরকে শান্তিপূর্ণ এবং সুন্দর মরুদ্যান-এ রূপান্তরিত করতে পারে। তবে দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে এগুলো ওয়ারলেস সিগন্যালকে প্রচন্ডভাবে বাধা প্রদান করতে পারে। পানি রেডিও তরঙ্গ অত্যন্ত ভালোভাবে শোষণ হতে পারে বলে, যদি রাউটার এবং ল্যাপটপের মধ্যে একটি বড় মাছের ট্যাংক থেকে থাকে তবে তা কার্যকর ভাবে একটি বিশাল প্রতিবন্ধক হয়ে ওঠে; যা সিগন্যালকে দুর্বল করে দেয়। ট্যাংক যত পুরু হবে এর প্রভাব তত বেশি হবে। অনেকেই না জেনেই রাউটার একুরিয়ামের পাশে রাখেন, কারণ বসার ঘরের তাক বা কেবিনেটে প্রায়শই প্রচুর মালপত্র থাকে। আপনার যদি একটি বড় আকারের একুরিয়াম থাকে তবে রাউটারটি অন্য কোথাও রাখুন, অথবা নিশ্চিত করুন যে সিগন্যালটি এর পাশ দিয়ে যাওয়ার জন্য একটি পরিষ্কার এবং খোলামেলা জায়গা আছে।

 

আয়না শুধু মাত্র আপনার মুখই প্রতিফলিত করে না, বড় আয়নাও ওয়াইফাই এর ফ্রিকুয়েন্সিকে প্রতিফলিত করতে পারে। অনেক আধুনিক আয়নায় পাতলা ধাতব প্রলেপ থাকে যা প্রতিফলন কে আরো উন্নত করে। ধাতু আলোর মতোই রেডিও সিগনালকেও প্রতিফলিত করে যার ফলে সিগন্যাল গুলো সরাসরি আপনার ডিভাইসের দিকে না এসে ঘরের অন্য কোন জায়গায় এলোমেলো ভাবে ছড়িয়ে পড়ে। একই নীতি ধাতব ফাইলিং ক্যাবিনেট, রেফ্রিজারেটর, স্টিলের তাক এবং এমনকি দেয়ালের ভিতরে লুকানো কিছু ফয়েল যুক্ত ইন্সুলেশনর মত উপকরণের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কখনো কখনো একটি বড় ধাতব বস্তু থেকে রাউটারটিকে মাত্র কয়েক ফুট দূরে সরালে কাভারেজ নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়।

 

পুরু দেয়াল বাড়িকে সিগন্যালের গোলকধাঁধায় পরিণত করতে পারে। সব দেয়াল একরকম হয় না, একটি সাধারণ ড্রাইওয়াল পার্টিশন ওয়াইফাইকে প্রায় কোনভাবেই প্রভাবিত করে না অন্যদিকে কংক্রিটের দেয়াল অর্থাৎ ইট, পাথর, স্টিল এবং পুরনো প্লাস্টারের দেয়াল সিগন্যালকে উল্লেখযোগ্য ভাবে দুর্বল করে দিতে পারে। অনেক ঐতিহাসিক ভবন অজান্তেই ওয়াইফাই-য়ের জন্য “ডেড জন”-এ পরিণত হয় কারণ তাদের নির্মাণ সামগ্রী আধুনিক ড্রাইওয়াল এর চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর ভাবে রেডিও তরঙ্গ বাধা দেয়। মেঝেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, বিভিন্ন তলার মধ্যে কংক্রিটের কারণে প্রায় সময় ওয়ারলেস পারফরম্যান্স নাটকীয়ভাবে কমিয়ে দেয়। আপনার রাউটার যদি বেজমেন্টে থাকে তবে দ্বিতীয় তলায় চমৎকার কভারেজ আশা করাটা হবে বোকামি। বরং, রাউটারটি যদি বেসমেন্টে থাকে তবে প্রাইমারি রাউটার থেকে তারের মাধ্যমে দ্বিতীয় তলায় অন্য একটি রাউটারের সাথে সংযুক্ত করতে হবে। তবেই পর্যাপ্ত পরিমাণে পারফরম্যান্স আশা করা যাবে।

আপনার প্রতিবেশীর ওয়াইফাই আপনার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে কয়েক ডজন রাউটার একই সীমিত জায়গার মধ্যে থাকলে, রেডিও চ্যানেলের জন্য সেটি উপযুক্ত না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি থাকে। কল্পনা করুন, একটি ঘরে যদি প্রচুর মানুষ থাকে এবং সবাই একসাথে কথা বলার চেষ্টা করছে, তবে এক সময় কণ্ঠস্বর গুলো একে অপরের উপর এসে পড়ে এবং যোগাযোগ করা কঠিন হয়ে যায়। ওয়াইফাই অনেকটাই একইভাবে কাজ করে। রাউটারের ফ্রিকোয়েন্সি যদি ২.৪ গিগাহার্জ ব্যান্ডে পরিচালিত হয় তবে এই সমস্যাটি অনেক বড় আকার ধারণ করে। সৌভাগ্যবশত, বেশিরভাগ আধুনিক রাউটার স্বয়ংক্রিয়ভাবে একাধিক চ্যানেল এর মধ্যে আপনার চ্যানেলটি খুঁজে নিতে পারে। যদি সেটি না হয় সে ক্ষেত্রে আপনার রাউটারের সেটিং থেকে ম্যানুয়ালি আপনার চ্যানেলটিকে সংযুক্ত করতে হবে।

ওয়ারলেস হেডফোন, মাউস, কিবোর্ড, গেম কন্ট্রোলার, ফিটনেস ট্র্যাকার এবং স্মার্ট স্পিকার প্রায়শই ব্লুটুথ এর উপর নির্ভর করে। ব্লুটুথও ২.৪ গিগাহার্জ ফ্রিকোয়েন্সি রেঞ্জ ব্যবহার করে থাকে। সাধারণত এই প্রযুক্তি প্রতি সেকেন্ডে বহুবার দ্রুত ফ্রিকোয়েন্সি পরিবর্তন করে ইন্টারফিয়ারেন্স ভালোভাবে সামাল দিতে পারে। কিন্তু যখন অসংখ্য ব্লুটুথ ডিভাইস, ওয়াইফাই এর পাশাপাশি কাজ করে তখন বিশেষ করে ছোট অ্যাপার্টমেন্ট বা হোম অফিসে তখন প্রচন্ড ভিড় তৈরি হয়। আপনি যদি নিয়মিত বড় ফাইল ট্রান্সফার করেন বা ভিডিও কলে অংশ নেন তবে পাঁচ থেকে ছয় গিগাহার্জ ওয়াইফাই ব্যান্ড ব্যবহার করলে এই সমস্যা গুলো কমতে পারে।

কিছু পুরনো বেবি মনিটর, কর্ডলেস ফোন, ওয়্যারলেস সিকিউরিটি ক্যামেরা এবং হোম অটোমেশন গ্যাজেট ওয়াইফাই এর মত একই ফ্রিকুয়েন্সি ব্যবহার করে পরিচালিত হয়। যদিও আধুনিক সরঞ্জামগুলো সাধারণত এই ফ্রিকোয়েন্সিকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে । তবুও পুরনো কিছু ডিভাইস আশ্চর্যজনকভাবে শক্তিশালী ইন্টারফেয়ারেন্স তৈরি করতে পারে। যদি দ্বীনের নির্দিষ্ট সময় আপনার সংযোগ ধীর গতি সম্পন্ন হয়ে যায় তবে বিবেচনা করে দেখতে হবে যে বাড়ির অন্য কোন ডিভাইস প্রায় একই সময়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হচ্ছে কিনা। বাড়িতে যত বেশি ডিভাইস থাকবে তত বেশি ওয়াইফাই রাউটারের সক্ষমতা থাকতে হবে তা না হলে এই সমস্যা সমাধান করা সম্ভব হবে না। উৎসবের মরশুমে মানুষ মাঝে মাঝে অপরিসীম ওয়াইফাই সমস্যা লক্ষ্য করে থাকে। সাধারণত সাজসজ্জার আলো নিজে থেকে সমস্যার কারণ হয় না বরং নির্দিষ্ট কিছু ইলেকট্রনিক কন্ট্রোলার, সস্তা পাওয়ার সাপ্লাই বা দুর্বলভাবে তৈরিকৃত লাইটিং সিস্টেম বৈদ্যুতিক নয়েজ তৈরি করতে পারে, যা কাছাকাছি থাকা ওয়্যারলেস সরঞ্জাম এর কাজে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এমনকি এটি রাউটারের ফ্রিকোয়েন্সি কেউ প্রতিফলিত করতে পারে এই প্রভাবগুলো সাধারণত সামান্য হয়। কিন্তু যখন একটি রাউটার আগে থেকেই ভুল জায়গায় স্থাপন করা থাকে তখন তা লক্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। সেই ক্ষেত্রে রাউটার রাখার জায়গাটিকে সঠিকভাবে বেছে নিতে হবে।

মানুষের শরীরের বেশিরভাগ অংশই পানি এবং পানি ওয়াইফাই সিগন্যাল শোষণ করে থাকে। একটি রাউটার এবং ল্যাপটপের মাঝখানে একজন ব্যক্তির হাঁটাচলা খুব একটা পার্থক্য তৈরি করে না তবে, একটি ভিড়ে ঠাসা কনফারেন্স রুম, জমজমাট স্পোর্টস গ্যালারি বা ব্যস্ত এয়ারপোর্ট লাউঞ্জ ওয়ারলেস পারফরম্যান্সকে উল্লেখযোগ্য ভাবে দুর্বল করে দিতে পারে। কারণ সেখানে ডিভাইস এবং এক্সেস পয়েন্ট এর মাঝে বহু লোক দাঁড়িয়ে থাকে কিংবা হাঁটাচলা করে। এটি একটি কারণ যার জন্য ইন্টারনেট সংযোগটি দ্রুত গতির হওয়া সত্ত্বেও পাবলিক ওয়াইফাই প্রায়শই ধীর গতির বলে মনে হয়। অনেক পরিবার যে সবচেয়ে বড় ভুলটি করে তা হল, ভুল রাউটারটি কেনা নয় বরং রাউটারটিকে ভুল জায়গায় রাখা। রাউটার গুলো প্রায় টেলিভিশনের পেছনে লুকিয়ে রাখা হয়, ক্যাবিনেটের ভিতরে রাখা হয়, মেঝেতে রাখা হয় বা আলমারিতে ঠেলে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় কারণ মিটমিট করে জলা আলো দেখতে সুন্দর বলে মনে হয় না। দুর্ভাগ্যবশত এই অবস্থানগুলো সিগন্যালের বিস্তারকে মারাত্মকভাবে সীমাবদ্ধ করে ফেলে। তাই সেই সব স্থানের পরিবর্তে বাড়ির কেন্দ্রে রাখলে সিগন্যাল আরো সমানভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে। রাউটারটিকে মেঝের পরিবর্তে তাক বা টেবিলের উপরে অর্থাৎ উঁচুতে রাখতে পারলে এর বিস্তৃতি উন্নত হয়, কারণ আসবাবপত্র সিগন্যাল কে কম বাধা প্রদান করে থাকে।

 

আধুনিক বাড়িগুলোতে ক্রমশ কয়েক ডজন স্মার্ট প্রযুক্তি ডিভাইস সংযুক্ত করা হয়ে থাকে, যেমন স্মার্ট বাল্ব, সিকিউরিটি ক্যামেরা, ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট, স্মার্ট টেলিভিশন, গেমিং কনসোল, রেফ্রিজারেটর, রোবট ভ্যাকুয়াম, ওয়াশিং মেশিন এমন আরো ডজন খানেক ডিভাইসএ ওয়্যারলেস নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা যায়। আলাদাভাবে এগুলি খুব কম ব্যান্ড উইথ ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু একসাথে এগুলি একটি জটলা পরিবেশ তৈরি করে যেখানে অনেক ডিভাইস রাউটারের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য প্রতিযোগিতা করে। আজকের রাউটার গুলো  আগের প্রজন্মের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। তবুও খুব খারাপ পুরনো রাউটার গুলো একসাথে কয়েক ডজন ডিভাইস সংযুক্ত করলে এর পরিষেবা প্রদান করতে হিমশিম খেতে হতে পারে। এ ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা অনেক বেশি জরুরী।

 

আমাদের বাড়িগুলো যেহেতু ক্রমশ গ্যাজেটমুখী হয়ে উঠছে, সেহেতু ওয়্যারলেস পারফরমেন্সের প্রভাব গুলো বোঝা এখন আর শুধু প্রযুক্তিপ্রেমীদের কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি একটি ব্যবহারিক জীবন দক্ষতায় পরিণত হয়েছে। ওয়াই ফাই এর অনেক সমস্যার সমাধানের জন্য প্রযুক্তিগত দক্ষতা বা ব্যয়বহুল আপগ্রেড এর প্রয়োজন হয় না বরং কয়েকটি ছোটখাটো এবং সহজ পরিবর্তন এই সমস্যাগুলোকে সমাধান করতে সক্ষম হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *