জহির রায়হান: যার জীবন থেকে নেয়া যায় আজও

বিনোদন শিল্প-সাহিত্য

সাজিয়া আফরিন সৃষ্টি

তার নাম শুধু সিনেমা জগতে নয়, সাহিত্য থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের গর্বিত শহীদদের সাথে উচ্চারিত হয়। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত সবই তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন। একইসাথে দেখেছেন অত্যাচার, স্বৈরশাসন, প্রতিবাদ। সেখান থেকে অনুপ্রেরণা আর দেশের জন্য কিছু একটা করার সংকল্প নিয়ে তৈরি করেন ‘জীবন থেকে নেয়া’ সিনেমাটি। যেখানে তিনি প্রত্যক্ষভাবে দেশের আপামর জনগণকে এক হয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য ডাক দেন। তিনি জহির রায়হান।

দেশ স্বাধীনের পর ভারত থেকে দেশে ফিরে এসেছিলেন জহির রায়হান। ১৯৭২ সালের ২৫ জানুয়ারি সাংবাদিক সম্মেলনের ঘোষণার পাঁচ দিন পর ৩০ জানুয়ারি রোববার সকালে রফিক নামের এক অজ্ঞাত টেলিফোন কল আসে জহির রায়হানের কায়েতটুলির বাসায়। টেলিফোনে জহিরকে বলা হয়েছিল, আপনার বড়দা (শহীদুল্লা কায়সার) মিরপুর বারো নম্বরে বন্দী আছেন। যদি বড়দাকে বাঁচাতে চান তাহলে মিরপুর চলে যান। একমাত্র আপনি গেলেই তাকে বাঁচাতে পারবেন। সেদিন সন্ধ্যায় প্রেসক্লাবে তার চলচ্চিত্র প্রদর্শনী হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু, টেলিফোন পেয়ে জহির রায়হান দুটো গাড়ি নিয়ে মিরপুরে রওনা দিয়েছিলেন। তার সঙ্গে ছিলেন ছোট ভাই জাকারিয়া হাবিব, চাচাত ভাই শাহরিয়ার কবির, শ্যালক বাবুলসহ আরও তিনজন। মিরপুর ২ নম্বর সেকশনে পৌঁছানোর পর সেখানে অবস্থানরত ভারতীয় সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তথা তৎকালীন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও পুলিশের সদস্যরা নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে জহির রায়হানের টয়োটা গাড়িসহ থাকতে বলে অন্যদের ফেরত পাঠিয়ে দেন। এরপর আর জহির রায়হানকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। আজ তার নিখোঁজ হওয়ার ৫১ বছর পূর্ণ হলো।

১৯৫৭ সালে জাগো হুয়া সাভেরা চলচ্চিত্রে সহকারী পরিচালক হিসেবে অভিষেক হয় জহির রায়হানের। এই চলচ্চিত্রের পরিচালক ছিলেন আখতার জং কারদার। ১৯৬১ সালে চলচ্চিত্রে পরিচালক হিসেবে জহির রায়হানের অভিষেক হয় ‘কখনো আসেনি’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। এই চলচ্চিত্রের অভিনয় করেছিলেন খান আতাউর রহমান, শবনম, সুমিতা দেবী। জহির রায়হানের প্রথম উপন্যাস ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’ ১৯৬০ সালে প্রকাশিত হয়। ১৯৬২ সালে নির্মাণ করেছিলেন সোনার কাজল। তবে জহির রায়হান আলোচনায় আসেন ১৯৬৩ সালে কাঁচের দেয়াল চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। এটি ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের পুরস্কার পেয়েছিল এবং শ্রেষ্ঠ পরিচালকের সম্মাননা পেয়েছিলেন জহির রায়হান।

পাকিস্তানের চলচ্চিত্র রঙিন চলচ্চিত্রের জগতে প্রবেশ করেছিল জহির রায়হানের হাত ধরেই। ১৯৬৪ সালে তার নির্মিত উর্দু চলচ্চিত্র ‘সঙ্গম’ ছিল পাকিস্তানের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র। এই চলচ্চিত্রের ৬টি গানই তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল এবং বছরটি ছিল জহির রায়হানের জন্য দারুণ একটি বছর। একই বছরে প্রকাশিত হয়েছিল তার রচিত কালজয়ী উপন্যাস ‘হাজার বছর ধরে’। এই উপন্যাসের জন্য ১৯৬৪ সালে আদমজী সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছিলেন জহির রায়হান। এরপর একাধারে একুশে ফেব্রুয়ারি, বাহানা, বেহুলা, আনোয়ারা, চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন।

১৯৬৯ সালে বায়ান্নর রক্তস্নাত ভাষা-আন্দোলনের পটভূমিতে তিনি লিখেছিলেন তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘আরেক ফাল্গুন’। একই বছর প্রকাশিত হয়েছিল তার আরেক বিখ্যাত উপন্যাস ‘বরফ গলা নদী’।

১৯৭০ সালে মুক্তি পেয়েছিল বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’। ‘জীবন থেকে নেয়া’ সিনেমায় ফুটে উঠেছে বাঙালি জীবনের গল্প। সিনেমাটিতে সাধারণ একটি পারিবারিক গল্পের আড়ালে একটি রাষ্ট্রের গল্পই বলা হয়েছে। সেখানে পূর্ব বাংলার মানুষের অধিকার এবং সংগ্রামের কথা বলা হয়। তাই সিমেটিকে সবাই আমাদের মুক্তির আন্দোলনেরই একটা বড় অংশ হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। এই সিনেমাতেই অমর একুশের ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ গানটি যেমন ছিল, ঠিক তেমনি নজরুলের কারার এ লৌহ কপাট গানটিও ব্যবহৃত হয়েছিল।

১৯৬৫ সালে পাকিস্তান সরকার হাস্যকরভাবে রেডিও টিভিতে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার নিষিদ্ধ করে দেয়। তার মাত্র কয়েক বছর পরই জহির রায়হান তার সিনেমাটিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটিকে প্রথমবারের মতো কোনো সিনেমায় ব্যবহার করেন। মুক্তিযুদ্ধের পর এ গানটিই বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের মর্যাদা পায়। ১৯৫২ থেকে ১৯৭০ সালের প্রেক্ষাপটে সিনেমাটি নির্মাণ করা হয়েছে। যেখানে তুলে ধরা হয়েছে একগুঁয়ে স্বৈরচারি শাসকের অত্যাচারের প্রতিবাদে সকলকে এক হবার আহবানে জাতীয়তাবাদ ও দেশাত্মবোধ। এটিই ছিল ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ও অমর একুশ নিয়ে নির্মাণ হওয়া প্রথম সিনেমা।

ছবির একটি অনবদ্য দৃশ্য হলো একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাতফেরীতে শহীদ মিনারে ফুল দেওয়ার দৃশ্য। বাস্তব সেই দৃশ্য ১৯৭০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে নেওয়া। সিনেমার শেষাংশে যে মেয়ে শিশুটির জন্ম হয় তার নাম রাখা হয় ‘মুক্তি’। অত্যাচার নিপীড়নের দিন শেষে মুক্তি মিলবে এমন আশায় সকলকে এক হয়ে কণ্ঠস্বর জাগিয়ে তোলার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

১৯৭০ সালে তিনি নির্মাণ শুরু করেছিলেন বহুল আলোচিত ছবি ‘লেট দেয়ার বি লাইট’।   চিত্রনাট্য ছাড়া এই চলচ্চিত্রের প্রতি দৃশ্য থেকে সংলাপ সবই ছিলো জহির রায়হানের উপস্থিত মেধায় রচিত। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ায় চলচ্চিত্রটির নির্মাণ বন্ধ হয়ে যায়। চিত্রনাট্য না থাকার কারণে ছবিটি আজও পর্যন্ত অসমাপ্ত।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পর মার্চে ভারতের কলকাতায় চলে যান জহির রায়হান। কলকাতায় যাওয়ার পরে সেখানেই তিনি স্টপ জেনোসাইড, এ স্টেট ইজ বর্ন, ফাইটার্স ছবিগুলো নির্মাণ করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের উপরে তৈরি করা দলিলচিত্রগুলো জহির রায়হান ওখানে থেকেই তৈরি করেন। ভারত থেকে বর্ডার পার করে তিনি আসতেন বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের শরণার্থীরা সবাই বর্ষার ভিতরে কাঁদা নেপা মাঠ-ঘাট পেরিয়ে যাচ্ছে, এক বৃদ্ধা হাঁটতে পারছেন না একটা ভালুকের মতো করে হেঁটে যাচ্ছেন। মুক্তিযুদ্ধের বিখ্যাত এই ফুটেজগুলো সবাই টেলিভিশনে দেখা হয় সেগুলো জহির রায়হানেরই ধারণ করা।

মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি মুক্তিযুদ্ধের ফান্ড তৈরির জন্যে বিভিন্ন রকম কাজ করে গেছেন। যেমন- তার ছবি ‘জীবন থেকে নেওয়া’ কে মাদ্রাজ, বোম্বাই, কলকাতায় বিভিন্ন জায়গায় চালানো হয়েছে। সেখান থেকে প্রচুর অর্থ প্রাপ্তি হয়েছে। পুরো টাকাটি উনি প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারকে দান করেছিলেন।

তথ্যসূত্রঃ দ্য ডেইলি স্টার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *