‘বোমা, মৃত্যু ও ভালোবাসার শহর’

বিনোদন শিল্প-সাহিত্য

সিনেমা পর্যালোচনা
‘যে একবার কলকাতা ছেড়ে যায়, সে কখনো ফিরে আসে না।’ প্রেমিকা অন্নপূর্ণাকে, যাকে ভালবেসে বিয়ে করেছিলেন আদিল হায়দার, এই কথাটা বলেছিলেন একবার। কিন্তু তার এই কথা যে, এতটা নির্মম হবে তা হয়তো ভাবতে পারেন নি। তাই তো, অনেক স্বপ্ন নিয়ে সিরিয়ার একটি কনস্ট্রাকশন কোম্পানির চাকরি নেন। অন্নপূর্ণাকে নিয়ে পাড়ি জমান সুদূর মধ্যপ্রাচ্যের প্রচীন শহর “হোমসে”। আর সেখানেই জন্ম নেয় তাদের কন্যা নুড়ি।

একমাত্র সন্তানকে নিয়ে ভালই কাটছিলো দিনকাল। হঠাৎ এক ঝড়ে জীবনের সাজানো ব্যঞ্জনবর্ণ গুলো ওলট-পালট হয়ে যায়। বোমার আঘাতে আহত আদিলকে রেখেই মেয়ে নুড়িকে নিয়ে ফিরে আসতে হয় অন্নপূর্ণাকে। কিন্তু কিছুদিন বাদেই মৃত্যুর খবর আসে আদিলের।

‘মনুষ্য বোমা’ একদিকে কেড়ে নিলো ভালবাসার মানুষকে, আর অন্যদিকে প্রিয় কন্যাটিও বোমার আঘাতে শ্রবণ আর হাঁটার ক্ষমতা হারিয়ে শয্যাশয়ী, যাকে নিয়েই চলতে থাকে অন্নপূর্ণার আরেক সংগ্রাম।

মেয়ের চিকিৎসা খরচ জোগার করতে দৈনিক ১২-১৩ ঘন্টা কাজ করা শুরু করেন অন্নপূর্ণা। বাসের এটেনডেন্ডসহ পার্লারের কাজ, তবুও হিমশিম জীবন। এই কঠিন সময়েও অনৈতিক উপায়ে কাজের হাতছানিতে সাড়া দিয়ে নিজেকে প্রমাণ করলও, জীবেনে তার মূল্য কি পেয়েছেন তিনি? অন্নপূর্ণা কি জীবন যুদ্ধে হেরে গেছেন?

ভালোবাসার শহর নামের স্বল্পদৈর্ঘের ছবিটিতে হয়তো অনেক কিছুই তুলে ধরতে চেয়েছেন, পরিচালক ইন্দ্রনীল রায় চৌধুরী। কিন্তু আমি এখানে তিনটি বিষয়ে আলোকপাত করবো:

১. মানুষের সাজানো সপ্নগুলো অস্ত্র, বোমার কাছে, কতই না অসহায়। মানুষ অসহায় বিশ্বরাজনীতি আর বিশ্ব নেতাদের কাছে, যারা তারা ক্ষমতার জন্য মানুষের ভালবাসার শহরগুলোকেও ধ্বংস করে চলেছে প্রতিনিয়ত। বোমার আঘাতে শষ হয়ে যাচ্ছে আদিল-অন্নপূর্ণার মত কত স্বপ্ন।

২. মানুষের ভালবাসা জাতি ধর্ম সব ব্যবধান ঘোচাতে পারে চাইলে। এক ধর্মের মানুষ অন্য ধর্মের মানুষকে ভালোবেসে বিয়ে করতে পারে। করছেও তো মানুষ। আর এটা যে খুব সাধারণ ভাবেই হতে পারে, ছবিটিতে যেন সেভাবেই তুলে ধরা হয়ছে।

৩. সমাজে অন্নপূর্ণার মত হাজারো নারী কত লড়াই করে প্রতিটা দিন পার করছেন। আপোষহীন এই লড়াইয়ের কত গল্প ছড়িয়ে ছিটেয়ে আছে আমাদের গ্রাম, শহর, আনাচে কানাচে। অনকেটা নীরবে কত স্বপ্ন পুড়ে যায় রোজ! যেখানে রোজ প্রলোভন, লালসা, চোখরাঙানির সঙ্গে মর্যাদা ও স্নায়ুর যুদ্ধ চলে।

তবুও আমাদের এই বোধ হোক, পৃথিবীতে ভালবাসার শহরগুলো টিকে থাকুক। চিহ্ন বহন করুক প্রত্যেকটি সভ্যতার, প্রত্যেকটি ভালবাসার। কারণ শহর হারালে, কত ভালবাসাও হারিয়ে যায়।

ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী পরিচালিত ৩২ মিনিট এর স্বল্পদৈর্ঘের ছবি “ভালবাসার শহর” অন্নপূর্ণা চরিত্রে অভিনয় করেছেন জয়া আহসান। আদিলের ভূমিকায় ছিলেন ঋত্বিক চক্রবর্তী। ছবিটি ২০১৭ সালে ইউটিউবে মুক্তি দেয়া হয়েছিল।

পর্যালোচনা করেছেন স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের ৬৭ বাচের শিক্ষার্থী তানভির আহমেদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *