সংগঠনগুলো আমাদেরকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে: বাপ্পারাজ

বিনোদন

মাজহারুল ইসলাম তামিম
ঢাকাই চলচ্চিত্রের দর্শকপ্রিয় অভিনেতা বাপ্পারাজ। ১৯৮৬ সালে বাবা নায়করাজ রাজ্জাকের পরিচালনায় ‘চাঁপাডাঙ্গার বউ’ ছবিতে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রে আগমন ঘটে তার। বাবার পরিচয়ে নয়, নিজ অভিনয় দক্ষতা দিয়েই বাঙালি দর্শকের মনে ঠাঁই করে নিয়েছেন। সর্বশেষ তাকে ‘পোড়ামন-২’ সিনেমায় দেখা গিয়েছে। অভিনয়ে তিনি এখন আগের মতো নিয়মত নন। এছাড়া কর্মস্থল এফডিসিতেও আসেন না। এই অভিনেতা ভাগাভাগি করেছেন একান্ত কিছু কথা।

গত বছর আপনি ও আপনার পরিবারের সদস্যরা করোনার কবলে পড়েছিলেন। এখন কী অবস্থা:
বাপ্পারাজ: আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। সবাই সেফ আছি। ঠিক ঠাক।’

অভিনয়ে আগের মতো দেখা যায় না কেন?
বাপ্পারাজ: অন্যান্য দেশে শিল্পীদের বয়স হয়ে গেলেও তাদের উপর বেস করে ক্যারেক্টার ঠিক করা হয়। আমাদের এখানে ঐ ট্রেন্ডটাই নেই। গড়পড়তা গল্প লেখা হয়। এখন আসলে গড়পড়তা সিনেমা করে লাভ নেই। অনেক তো করলাম। ঐভাবে আর করার ইচ্ছা নেই। ডিফারেন্ট কিছু হলে করবো।

অভিনয় মিস করেন না?
বাপ্পারাজ: যেহেতু শিল্পী ডেফেনেটলি মিস করি।

‘কার্তুজ’ নামে একটি সিনেমাও পরিচালনা করেছিলেন। এরপর নির্মাণেও দেখা যায় নি। পরিচালনা তো চালিয়ে যেতে পারতেন?
বাপ্পারাজ: ওটা তো নিজেদের প্রোডাকশন হাউজের কাজ ছিল। আব্বা (নায়করাজ রাজ্জাক) বলেছিলেন এজন্য করেছিলাম। ঐ ছবির পর আব্বা অসুস্থ হয়ে গেলো। এরপর নানা কারণে আর প্রোডাকশনও হয় নি, পরিচালনাও করা হয়ে ওঠে নি।

বাপ্পারাজ মানেই প্রেমে ব্যর্থ কোনো লোক, দর্শকদের এই ধারণাকে আপনি কীভাবে দেখেন?
বাপ্পারাজ: মজার ব্যাপার হলো, আমি ১৯৫ টির মতো সিনেমায় অভিনয় করেছি। এর মধ্য সর্বোচ্চ ১৫/২০ ছবিতে এরকম ক্যারেক্টার ছিল। কিন্তু সংখ্যায় কম হলেও ঐ ছবিগুলোই মানুষের মনে দাগ কেটে যায়। এরপর ধারণা হয়ে গেছে সব ছবিতে আমি এরকমই। এটা নিজের কাছেও অবাক লাগে।

চলচ্চিত্রের এখনকার অবস্থা নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
বাপ্পারাজ: সিনেমায় টিম ওয়ার্ক খুব গুরুত্বপূর্ণ। একজন প্রযোজক, পরিচালক, শিল্পী মিলেই একটা কাজ দাঁড়ায়। এখন হয়ে গেছে কি, যার যার কাজ আলাদা। আর দুঃখের ব্যাপার হলো আমাদের ফিল্মের সব কিছুই সমিতি নির্ভর হয়ে গেছে। সমিতি সব কিছুর সিদ্ধান্ত নিবে। এটা ঠিক না। এসব করে সংগঠনগুলো আমাদেরকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। কিছুদিন আগের কথাও বলি, আমাদের একটা পরিবার গঠন হলো, হেন হলো তেন হলো। পরে কিন্তু কিছুই হলো না। তারপর শিল্পী সমিতি নিয়ে আলাদা একটা শিল্পী ঐক্যজোট হলো। ঐটাও টিকলো না। আবার ভাগ হয়ে গেলো সবাই। পরিবার তো আমরা সবাই ছিলামই। নতুন করে পরিবার গঠন করার কোনো দরকার ছিল না। মাঝখান দিয়ে তৃতীয় পক্ষ এখান থেকে ফায়দা লুটে নিয়ে চলে গেছে। আমরা কিন্তু আমাদের জায়গাতেই পড়ে রয়ে গেছি। এরকমই হয়।

এই সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় কী?
বাপ্পারাজ: মূল সমস্যাটা হলো সবাই চান নেতা হতে। একটা পজিশন নিতে চান, চেয়ার পেতে চান। এটার জন্য মারামারিও করি। অযোগ্য লোকজন পজিশন হোল্ড করে আছে তো, তাই এই দুরাবস্থা। আর এখন কিন্তু কয়টা ছবি রিলিজ হলো, কে কি ছবিতে কাজ করলো সেটা নিয়ে মাথাব্যথা নেই। এর থেকে বড় ব্যাপার হচ্ছে নেতা কি করছে, কয় বালতি সিন্নি বিতরণ করলো, গরু জবাই দিল কিনা, ইফতারি দিল কিনা। এগুলো। ইফতারি-গরুর গোস্তের দরকার নেই। আমাদের দরকার সিনেমা। ইন্ডাস্ট্রির লোকদের কাজের দরকার। আমাদের আব্বাদের সময় দেখতাম চলচ্চিত্র শিল্পীরা টাকা তুলে দান করতো। এখন নিজেদেরকে এমন একটা অবস্থায় নিয়ে গেছি যে আমরাই দুঃস্থ, আমাদেরকেই মানুষজন ডোনেট করছে। আমার কাছে মনে হয়, এতটুকু জায়গার মধ্যে এতোগুলো সংগঠনের কোনো দরকার নেই। আমাদের কার সাথে কিসের দাবি? এসব কারণেই কি এফডিসিতে আসেন না? বাপ্পারাজ বলেন, আব্বা মারা যাওয়ার পর লাইফে একটা পার্ট খুব প্রকাশ্যে দেখা হয়ে গেছে। ইন্ডাস্ট্রির কথাই বলছি। আমার আর ঐদিকে মন টানে না। যাদেরকে আপন ভাবতাম, আমাদের লোক মনে করতাম। একটা সময় দেখলাম তারা আমাদের লোক না। আমাদের আপন না। শুধু ব্যবসার খাতিরেই আমাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। আর কিছু না।

আপনার বাবা নায়করাজ রাজ্জাকের স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখতে তেমন কোনো উদ্যোগ বা পরিকল্পনা চোখে পড়ে নি। এ নিয়ে আক্ষেপ আছে?
বাপ্পারাজ: রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো মানুষকে মূল্যায়ন করা বা স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখার কোনো ব্যবস্থা আমাদের এখানে নেই বললেই চলে। শুধু আমার আব্বা না। দেশে অনেক গুণী লোকজন ছিল, তাদের চলে যাওয়ার পর ওখানেই সব শেষ। তারপর আর কোনো কিছু হয় না। অথচ দেশের জন্য, ইন্ডাস্ট্রির জন্য তিনি অনেক বড় অবদান রেখেছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *