বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার : সাম্প্রতিক প্রবণতা, প্রভাব ও চ্যালেঞ্জ বিষয়ে দৈনিক প্রথম আলোর সিনিয়র কনটেন্ট ক্রিয়েটর আবদুল্লাহ আল হোসাইন আলিফ এর সাথে কথা বলেছেন তানভীর সিদ্দিক টিপু।
বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার কবে থেকে শুরু হয়েছিল বলে আপনি মনে করেন?
ডিজিটাল প্রযুক্তি বলতে যদি অনলাইনের কথা বলেন, তাহলে বিডিনিউজ টোয়েন্টি ফোর ডট কম-এর হাত ধরেই সেটা শুরু হয়েছিল। তারাই বাংলাদেশের প্রথম গণমাধ্যম যেটা অনলাইনে এসেছে। অনলাইন আর ডিজিটাল সাংবাদিকতার মধ্যে কিছু পার্থক্য আছে। ডিজিটাল সাংবাদিকতা হচ্ছে ডিজিটাল প্লাটফর্মগুলো ব্যবহার করে (যেমন সোশ্যাল মিডিয়া) যে সাংবাদিকতা করা হয়। বাংলাদেশে এই ডিজিটাল সাংবাদিকতার সূত্রপাত মূলত বিবিসি বাংলার হাত ধরে।
আমি যখন দুহাজার পনেরো ষোলোতে বিবিসি বাংলায় কাজ করতাম, তখন থেকে আমি দেখতাম তারা ভিডিও স্টোরি করার জন্য, ডিজিটাল স্টোরি করার জন্য, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়ার জন্য বলতো। আমি রেডিওর জন্য কাজ করতাম। তারা এই শব্দগুলো ব্যবহার করলেও এগুলোর অর্থ আমরাও খুব একটা বুঝতাম তা না। বিবিসি বাংলায় যারা কাজ করতেন তারা নিজেরাও বিশদভাবে জানতেন না বিষয়টা সম্পর্কে। তখনও এটা ওভাবে প্রচলন ঘটেনি। দুহাজার ষোলোর পর থেকেই তারা শুরু করলো। ডিজিটাল জার্নালিজম ওই সময় থেকে শুরু। এরপরে আস্তে আস্তে বেশকিছু গণমাধ্যম আসা শুরু করলো। এখন তো মোটামুটি সব গণমাধ্যমই এটা ব্যবহার করছে।
বর্তমানে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে সাংবাদিকতায় (বিশেষ করে তথ্য সংগ্রহ, সংবাদ তৈরি ও সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে) কী কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে? করোনা মহামারীর সময় কি এই প্রযুক্তি ব্যবহারের বিশেষ কোনো ভূমিকা রেখেছিল?
সাংবাদিকতায় ডিজিটাল সরঞ্জামের ব্যবহার বিশেষ করে মোবাইল ফোন ব্যবহার করে সাংবাদিকতার মাধ্যমে সংবাদ সংগ্রহ, সংবাদ লেখা, সংবাদ সম্পাদনা সব ক্ষেত্রেই একটা আমূল পরিবর্তন এসেছে। একদম আমূল পরিবর্তন যদি বলেন সেটা অবশ্যই করোনা ভাইরাস অতিমারীর সময় থেকেই। মানুষ তখন ঘরবন্দি থাকার কারণে মোবাইল ফোনের ব্যবহার অনেক মাত্রায় বেড়ে গিয়েছিল। মোবাইল ফোনের পাশাপাশি ল্যাপটপ বা কম্পিউটারের উপরে নির্ভরশীলতা অনেক বেশি বেড়ে গিয়েছিল। পাশাপাশি সাংবাদিকতায়ও যারা সাংবাদিকতা করেন সংবাদ সংগ্রহ করেন সংবাদ লেখেন ওই জায়গাটাতেও বড়ো পরিবর্তন এসেছে। আগেও ছিল কিন্তু ওই সময় থেকে আমরা দেখেছি বেশি এসেছে। কারণ মোবাইল ফোন বেশি ব্যবহার ফলে করার ফলে সেটার ওপরে নির্ভরশীলতা তৈরি হয়েছে। আমি দেখেছি মোবাইল ফোনে অনেকে নিউজ লিখতো। সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে কনটেন্ট তৈরি করা সেটা সাংবাদিকতা এবং সাংবাদিকতার বাইরে দুই ক্ষেত্রেই একটা বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে করোনা ভাইরাস। টেলিভিশনের ক্ষেত্রেও করোনার সময় অনেক ইউনিট নিয়ে বড় পরিসরে বের হওয়া সম্ভব ছিল না। তখন মোবাইল ফোন ব্যবহার করেই কাজ করেছেন সাংবাদিকরা।
সাংবাদিকতার চাকরির ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি কোনো সুযোগ বা পরিবর্তন এনেছে কি না?
অবশ্যই বড় পরিবর্তন এসেছে। এখন চাকরির জন্য যারা প্রফেশনাল আছেন তাদের বড় একটা প্ল্যাটফর্ম লিঙ্কডইন। এর মাধ্যমে চাকরি বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে কোম্পানিগুলো এখন কর্মী নিয়োগও দিচ্ছে। একাউন্টগুলো সিভি হিসেবে কাজ করছে। আবার, একটা নির্দিষ্ট পজিশনে কোন ভ্যাকেন্সি হচ্ছে কিনা এগুলো আপনি তাৎক্ষণিকভাবে জানতে পারছেন। আবার আপনাকে যাদের প্রয়োজন হবে সহজেই খুঁজে নিতে পারবে। বর্তমান যুগে আপনাকে শুধু কাজ জানলেই চলবে না। আপনার যে কাজ সেটা শো করতে হবে এবং এই কাজটা শো করার সবচেয়ে বড় মাধ্যম হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া। সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে আপনার কাজটা দেখাতে হবে। দুনিয়া কিন্তু বসে নেই। সে তার মতো ছুটছে। ডিজিটাল প্রযুক্তি আসার কারণে কাজের ধরন পরিবর্তন হয়েছে। বিশেষ করে সাংবাদিকতা এখন সোশ্যাল মিডিয়া কেন্দ্রিক। পরিবর্তনের সাথে যারা খাপ খাওয়াতে না পারলে সে এমনিই পিছিয়ে যাবে। অবশ্যই এই পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়াতে হবে, এটা টিকে থাকার একটা বড় শর্ত। যারা খাপ খাওয়াতে না পারবে সেটা তাদের নিজস্ব ব্যর্থতা। পাশাপাশি অফিসগুলোতে পর্যাপ্ত ট্রেনিংয়ের অভাব রয়েছে। যারা নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে জানে না কিংবা এর কারণে পিছিয়ে পড়ছে তাদের নিজ উদ্যোগে প্রযুক্তিগুলোর সম্পর্কে জানতে হবে, সেগুলোর ব্যবহার জানতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত যারা একটু পিছিয়ে পড়া তাদেরকে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
আরেকটা বিষয়, আমাদের পুরনো ব্যক্তি যারা আছেন, তাদের মধ্যে আমার মনে হয় একটা ইগো সমস্যা আছে। সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে আমি বলতে পারি এটা অনেক মারাত্মক। তাদের অনেকেই মনে করেন, যে আমি যেটা শিখেছি সেটাই সর্বোত্তম। এই ধারণা থেকে যতদিন পর্যন্ত বের হয়ে আসতে না পারবেন ততদিন পর্যন্ত সমস্যার সমাধান হবে না। তারা এখনো হয়তো টিকে আছেন, কিন্তু পাঁচ বছর পরে বা সাত বছর পরে ওই ব্যক্তিরা যদি নিজেদের পরিবর্তন না করেন তারা টিকে থাকতে পারবে বলে আমার মনে হয় না।
ডিজিটাল প্রযুক্তির কারণে সাংবাদিকতায় কী কী ধরনের নেতিবাচক পরিবর্তন এসেছে? ডিজিটাল প্রযুক্তির কারণে ফেইক নিউজ বেশি প্রসার লাভ করেছে– এই বিষয়ে আপনার অভিমত?
ডিজিটাল প্রযুক্তির কারণে সংবাদ মাধ্যমের ক্ষেত্রে সবচেয়ে নেতিবাচক হয়ে দাঁড়িয়েছে গুজব। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে গুজব ছড়ানোর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে। গুজব প্রতিরোধে গণমাধ্যমগুলোর উপর নজরদারি করা প্রয়োজন। আগে কিন্তু গণমাধ্যমের একটা জবাবদিহিতা ছিল। এখন গণমাধ্যমগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দিকে ঝুঁকছে। সেখানে সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে তাদের দক্ষ লোকের অভাব রয়েছে। ফলে বড় বড় মিডিয়ার যে নিউজগুলো সোশ্যাল মিডিয়ায় যাচ্ছে সেগুলো শুধু সোশ্যাল মিডিয়াকে লক্ষ্য করেই করা হচ্ছে। সেসব সংবাদে অনেক ক্ষেত্রেই ভুল থাকছে কিংবা অসম্পূর্ণ তথ্য থাকছে। এটার জন্য যে দক্ষ জনবল কিংবা পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন তার কোনো ব্যবস্থা নেই। যার ফলে গুজব কিংবা অসম্পূর্ণ তথ্য এই নৈতিকতার প্রশ্নগুলো আসছে। কোনো একটা কনটেন্ট তৈরি করার উচিত কিনা এটা যেমন একটা বিষয় আর দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে এখানে যে ভাষাগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে কিংবা যে জিনিসগুলো দেখানো হচ্ছে ভিজুয়ালি সেগুলো আসলে নৈতিকভাবে কতটুকু যায়। এই দ্বাররক্ষকের জায়গায় বড় ঘাটতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
এই প্রযুক্তির কারণে সাংবাদিকতার গুণগত মান বা নীতি–নৈতিকায় কোনো পরিবর্তন বা প্রভাব রেখেছে কিনা?
যদি সংবাদপত্রের কথা বলি, আগে শুধু ছাপা ভার্সন ছিল। পরিসরটা ছোট ছিল। যখন অনলাইন এলো পরিধিটা আরো বেড়ে গেলো। লোকবলের সংখ্যা বাড়লো, নিউজের সংখ্যা বাড়াতে হলো, কারণ অনলাইনে প্রচুর নিউজ দিতে হয়। এখন নতুন শাখা হিসেবে সোশ্যাল মিডিয়া যুক্ত হয়েছে। যেখানে আপনি দশ থেকে পনেরো বছর আগেও স্বল্প পরিসরে নিউজ দিতেন, অল্প কিছু সাংবাদিক ছিল, মনিটরিং এর জায়গাটাও তখন সীমিত ছিল। কিন্তু এখন সবকিছুই বেড়েছে। পাশাপাশি নিউজ মিডিয়ার সংখ্যাও বেড়েছে। যার ফলে একটা হযবরল অবস্থা তৈরি হয়েছে। এটার বিশালতা বেড়ে যাওয়ার কারণে এই যে মানের প্রশ্নটা এখন আরো বেশি চলে এসেছে। এরসাথে অনেকগুলো টেলিভিশন নতুন অনলাইন প্লাটফর্মে এসে এটাকে একটা বিশৃঙ্খল অবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
পাঠক–দর্শক ডিজিটাল মাধ্যমগুলোতে কেমন ভূমিকা রাখছে?
আমাদের গণমাধ্যমে এখন যেমন দক্ষ লোকবল এবং নৈতিকতার ঘাটতি আছে ঠিক একইভাবে আমাদের পাঠক সমাজ কিংবা এখন যাদের অডিয়েন্স বলে তাদের যে লিটারেসি অর্থাৎ সোশ্যাল মিডিয়া লিটারেসি কিংবা মোবাইল ফোন কিংবা ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের যে জ্ঞান. এটা আসলে খুবই কম। যার ফলে এটার (সোশ্যাল মিডিয়া) সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না। নিউজ করতে গিয়ে যেটা দেখেছি, ডিজিটাল কনটেন্টের ক্ষেত্রে কিংবা ডিজিটাল চ্যানেলে আমি হয়তো নৈতিকতা মেনে একটা কনটেন্ট দিচ্ছি। কিন্তু আমি দেখছি যারা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী তারা আসলে এই কনটেন্টটার ভার নিতে পারছে না। দেখা যাচ্ছে নৈতিকতা মেনে যে কাজগুলো হচ্ছে সেগুলো তারা অনেক ক্ষেত্রে পছন্দ করছে না। যার ফলে এখন অনেকে অডিয়েন্সের কথা মাথায় রেখেই কনটেন্ট তৈরি করছে। ফলে সাংবাদিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমার মনে হয় এখানে অনেক বড় একটা ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে কোন সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী যারা কিংবা ইলেকট্রনিক ডিভাইস যারা ব্যবহার করে তাদের শিক্ষার জায়গাটায় ঘাটতি আছে।
মূলধারার গণমাধ্যমগুলো এই প্রযুক্তির কারণে কোনো ধরনের ক্ষতি বা চ্যালেঞ্জ–এর সম্মুখীন হচ্ছে কিনা?
চ্যালেঞ্জ তো আছেই। এই যে অডিয়েন্সের যে আচরণ কিংবা তাদের যে রুচির পরিবর্তন এটা ঠিক করার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমকে অবশ্যই এটার দায়িত্ব নিতে হবে। নীতির জায়গাটা ঠিক রাখতে হবে। পরিবর্তনের যে দায়িত্ব এটা আসলে আমি মনে করি গণমাধ্যমকেই নেওয়া উচিত। যেমনটা মানে ছাপা পত্রিকার ক্ষেত্রে ছিল, তারাই ঠিক করে দিত বা পাঠক এবং সংবাদপত্র উভয় মিলেমিশেই ঠিক করতো যে আমার নিউজের রূপটা কেমন হবে, আমার নীতি কোন জায়গায় থাকবে।
কিন্তু এখন এটা কিছু ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অনেকেই কনটেন্ট তৈরি করছে। যে কেউই যেকোনো ধরনের কনটেন্ট তৈরি করতে পারে, সেটা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। কিন্তু নিউজ কনটেন্ট যখন হবে সেখানে কিন্তু নীতির প্রশ্নটা চলে আসবে। সেই জায়গায় আমার মনে হয় নজরদারি বাড়ানো উচিত। সেটা কিভাবে করা যেতে পারে এটা আসলে অনেক আলোচনার বিষয়। এটা নিয়ে অনেক গবেষণা হওয়া উচিত। সরকার থেকে বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে গবেষণা হওয়া উচিত। কারণ এখনও আমাদের যে অডিয়েন্সের আচরণ সম্পর্কে খুব ভালো ধারণা আছে তেমনও না। অনেকগুলো পক্ষকে এখানে সংযুক্ত হতে হবে, সংযুক্ত হয়ে তারপরে আমার মনে হয় একটা পরিবর্তনটা আসবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতার বিভাগের পাঠ্যসূচিতে কোনো পরিবর্তন দরকার আছে কিনা?
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাংবাদিকতার চেয়ে গণযোগাযোগ পড়ানোর ওপরে বেশি জোর দেওয়া হয়। শুধু সাংবাদিকতা কেন্দ্রিক যে পড়াশোনা এটা কিন্তু কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। সাংবাদিকতা একটা বিস্তৃত জায়গা। সাংবাদিকতা যতটুকু পড়ানো হচ্ছে এইখানেও কিন্তু একটা বড় ঘাটতি আছে। আমি যদি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলার কথা বলি এগুলাতে ল্যাব সংক্রান্ত সুবিধাগুলো নেই। ফলে শিক্ষার্থীরা ব্যবহারিক জ্ঞানের দিক থেকে পিছিয়ে পড়ছে।
আবার, যারা সাংবাদিকতা পড়াচ্ছেন তাদের অনেকেরই সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা আদৌ আছে কিনা এটা একটা বড় প্রশ্ন। কারণ, সাংবাদিকতা শুধুমাত্র তাত্ত্বিক ইস্যু না। আমি সবসময় বলি, সাংবাদিকতা বিজ্ঞান না। আপনি কিছু তত্ত্ব জানবেন, পড়াবেন শেখাবেন এতে আসলে সাংবাদিকতা শেখা যায় না। শিখতে হলে ফিল্ড ওয়ার্ক করতে হবে। শিক্ষকদেরও সেই অভিজ্ঞতাটা থাকতে হবে। সেটা করতে সাংবাদিকতা জানা সাংবাদিকতা করা শিক্ষক যেমন নিয়োগ দিতে হবে, পাশাপাশি যারা অভিজ্ঞ সাংবাদিক তাদেরও সুযোগ দিতে হবে। যেন তাদের কাছ থেকে শিক্ষার্থীরা সরাসরি শিখতে পারে।
আরেকটা বিষয়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সেই পুরনো সময়েই পড়ে আছে। সাংবাদিকতার যে ট্রান্সফর্মটা হয়েছে, সেটি তো আগের জায়গায় নেই এবং হচ্ছে প্রতিনিয়ত সেটা পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে এই জিনিসগুলোর পরিচিতি ঘটাতে হবে। এই জায়গাগুলোতে ঘাটতি আছে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সাংবাদিকতায় এই প্রযুক্তির ব্যবহারে কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে কিনা?
বড় ধরনের একটা চাপ থাকে। আমরা দেখেছি যে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের শুরু থেকেই এটা নিয়ে বেশ উচ্চবাচ্য হচ্ছিল। কিন্তু এটা হওয়ার পরে আমরা দেখলাম সংবাদ প্রকাশের কারণে অনেক সাংবাদিককে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে । এটা নিয়ে উদ্বেগ আছে। যখন আপনি একটা জিনিস দেখবেন আপনার চারপাশে ঘটছে তখন আপনার মাঝে এই শঙ্কাটা স্বাভাবিকভাবেই থাকবে যে এটা আমার ওপরে প্রয়োগ হবে কিনা। আমিও এমন কিছু করতে যাচ্ছি কিনা যার কারণে আমি এই আইনের খড়গে পড়তে পারি। বিশেষ করে যখন আপনি ক্রাইম নিয়ে কাজ করছেন তখনই ঘটনাগুলো বেশি ঘটে।
কিছুদিন আগে আমি একটা গুমের স্টোরি করছিলাম। তো স্বাভাবিকভাবেই আমার বারবার ভাবতে হচ্ছে যে আমার প্রতিষ্ঠান সেটা গ্রহন করবে কিনা, আইডিয়াটা গ্রহন করবে কিনা। আমার ভাবতে হচ্ছে যে, যে ব্যক্তি গুম হয়েছে তার মতাদর্শ কী। আসলে হওয়া উচিত ছিল যে সে আদৌ গুম হয়েছে কিনা, এটাই বড় কথা। সে কোন মতাদর্শের আমার সেটা দেখার বিষয় না। কিন্তু আমার সেগুলো নিয়ে ভাবতে হচ্ছে। পাশাপাশি আমি তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রেও দেখা যায় একটা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি, যে আমি কি থেকে কি লিখতে বসেছি এবং এটার কি প্রভাব হতে পারে। তো সব মিলিয়ে একটা অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আমি নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি কিনা, আমার প্রতিষ্ঠান কোন ধরনের চাপের মুখে পড়ছে কিনা, এইসব জিনিসও ভাবতে হয় এখন। সব ক্ষেত্রে যে প্রতিষ্ঠান বলে বিষয়টা তা না। সুতরাং সাংবাদিকতার বাইরে গিয়েও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একজন সাংবাদিককে নিজের নিরাপত্তার কথাও ভাবতে হয়, প্রতিষ্ঠান অনেক সময় নিষেধ না করলেও নিজের নিরাপত্তার কারণেই ‘সেলফ সেন্সরশিপ’ চলে আসে।
বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারের ভবিষ্যত প্রবণতা কী হতে পারে বলে আপনি মনে করেন?
এখন সব সময় এই কথাটা বলা হয় যে প্রিন্ট মিডিয়া আর থাকছে না। প্রিন্ট মিডিয়া থাকছে কিনা এটা একটা বড় বিতর্কের বিষয়। একটা জিনিস নিশ্চিত যে আয়ের একটা বড় অংশ এখন ডিজিটাল প্লাটফর্মগুলোর দিকে চলে গেছে। কিন্তু এর মধ্যে আমরা দেখছি যে প্রিন্ট কিন্তু টিকে আছে। প্রিন্টের আয় হয়তো কমেছে, সার্কুলেশন কমেছে, কিন্তু টিকে আছে। দীর্ঘদিন ধরেই আমরা শুনছি যে এটা বন্ধ হয়ে যায়, বন্ধ হয়ে যাবে এবং করোনা মহামারীর সময় এই আশঙ্কাটা ছিল। কিন্তু করোনার ধকলটা কাটার পরে কিন্তু আমরা সেটা দেখতে পাচ্ছি না যে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। তবে এটা ঠিক যে একটা বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। পরিবর্তন তো অবশ্যই আসতেই থাকবে। সাংবাদিকতাও এর বাইরে না বিশেষ করে এখন যদি আপনি দেখেন যে ডিজিটাল মিডিয়া ডিজিটাল প্লাটফর্মকে ব্যবহার করে কনটেন্ট তৈরির দিকে ঝুঁকছে। এর বাইরেও যদি বলেন ভার্চুয়াল রিয়েলিটির ব্যবহার বা থ্রী সিক্সটি ডিগ্রী প্রযুক্তির ব্যবহারের কথা, খুব বেশি গণমাধ্যম যে এনেছে সেটা তা না। ইন্ডিয়ার টাইমস থেকে শুরু করে অল্প কিছু গণমাধ্যমের অল্প কিছু কনটেন্ট দেখবেন যেগুলো থ্রী সিক্সটি ডিগ্রী’তে করা। ওই জিনিসগুলোও কিন্তু আস্তে আস্তে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।
সামনের সাংবাদিকতাটা আসলে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে কেন্দ্র করে আরো অনেক বড় হবে। ইউটিউবের পাশাপাশি ফেসবুক কেন্দ্রিক সাংবাদিকতা তো আমরা দেখতে পাচ্ছি এখন। ফেসবুক পরিবর্তন হয়ে মেটা হলো। মানে সবকিছু একটা প্লাটফর্মে আসলো। তারা যেহেতু ভার্চুয়াল রিয়েলিটির দিকে ঝুঁকছে সেহেতু নিশ্চিত ভাবে বলা যায় সাংবাদিকতাও সেদিকেই ঝুঁকবে। এই পরিবর্তনগুলো আসতে থাকবে। আসলে প্রযুক্তির পরিবর্তন কখন কোন দিকে যায় সেটা তো বলা যায় না। কিন্তু পরিবর্তন হবে এটা নিশ্চিত।
