ডিয়েগো ম্যারাডোনা: অতি- প্রাকৃতিক মানুষ, ফুটবলার ও বিপ্লবী

কলাম

সময়টা খেয়াল রাখার মতো। ছিয়াশি সাল। সামরিক শাসন, নতুন আসা রঙ্গিন টিভি। চারিদিকে শুধু ভিলেন আর শয়তানদের হাসি। এমন সময় বিশ্বের ফুটবল মঞ্চ তো বটেই, আউল–বাউল–লালনের দেশ বাংলাদেশেও ম্যারাদোনা আসলো। দেখতে কিছুটা বাঙ্গালী উঠতি মধ্যবিত্তের মতো, বেটে, গাট্টাগোট্টা। নিজের চারপাশে নিয়মিত ভাবে পরাজিত মধ্যবিত্ত যেন তার ইচ্ছা পূরনের এক যাদুকর পেয়ে গেলো। সাদা চামড়া ইউরোপিয়ানদের শাসন–শোষন তার স্মৃতিতে। এখানকার মানুষ কয়েকশ বছর ধরে খালি পশ্চিমাদের কাছে হেরে গেছে। কিন্তু তাদের স্বপ্নের রাজকুমার হয়ে আসা ম্যারাদোনা জিততে জিততে মাঠে হাজির হয়েছে। জার্মানদের হারিয়ে ৮৬ এর বিশ্বকাপে চমক। ল্যাটিন জাদু বাস্তবতা যেন সত্যিকার বাস্তবে হাজির।

আমাদের আসলাম, মুন্না, সাব্বিরদের জনপ্রিয়তাও তখন তুঙ্গে। করপোরেটদের হাতে তখনো ক্রিকেট নামের নেশাদ্রব্যটি পৌঁছায়নি। গ্রাম–বাংলার মাঠে–ঘাটে কাদা মেখে বৃষ্টিভেজা ফুটবলের জয়–জয়কার। গ্রামের সম্প্রসারিত অংশ তখন শহর। সেখানে মহল্লায় মহল্লায় আবাহনী মোহামেডান সমর্থক গোষ্টির মধ্যে নিয়মিত ঝগড়া ফ্যাসাদ, আনন্দ– দ্বন্দ লেগে আছে। আমরা যা বিশ্ব দরবারে করতে চাইছি, ম্যারাডোনা তা করে দেখিয়ে দিচ্ছেন। আমাদের মনেও তখন একজন ম্যারাডোনা হওয়ার স্বপ্ন দানা বাঁধছে।

৯০ এ ম্যারাডোনা যেন আরও আলো ঝলমলে। চোরাই পথে হাত দিয়ে গোল দিয়ে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে দিলো। ইশ্বরের হাতে দেওয়া ওই গোলেও আমরা খুশি। জিতলেই হোল, কেমনে জিতলাম সেটা ব্যাপারা না। এর পরে ম্যারাডোনার পথে অনেক কাঁটা বিছানো হলো। সে নিজেও অনেক কাঁটাপথে হাঁটা দিলো। পায়ে বিদ্ধ কাঁটার মতো ভুল–সঠিক অনেক পথে হাঁটলেন আমাদের জাদুর বাস্তবতার নায়ক। গুগো শ্যাবেজ, ফিদেল ক্যাস্ট্রোর সঙ্গে বন্ধুত্ব থেকে শুরু করে মাদক আর খ্যাপাটে আচরন এই সব কিছু মিলেমিশে একাকার হলো তার জীবনে। ৮৬ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত এক ভিনদেশের ফুটবল নায়কের ভিউকার্ড, পোষ্টারে ছেয়ে গিয়েছিলো ঢাকা–চট্টগ্রাম থেকে বগুড়া হয়ে পুরো বাংলাদেশ।

তারা মৃত্যু হলো ফিদেল ক্যাস্ট্রোর মৃত্যুর ঠিক চার বছর পর, একই দিনে। ম্যারাডোনার পর অনেক খেলোয়ার আসলেন। মেসি, রোনালডো, সালাহ থেকে রোনালদিনহো। কিন্তু কেউ ম্যারাডোনাকে ছাপিয়ে যেতে পারলেন না। পারবেন কী করে। ম্যারাডোনা তো সময়ের সন্তান, প্রকৃতির দান। এক অতি-প্রাকৃতিক মানুষ,–ফুটবলার–বিপ্লবী। বিদায় বস।

[লেখাটি লেখকের অনুমতি নিয়ে ফেসবুক থেকে নেয়া হয়েছে।]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *