উপহার সর্বস্ব ভালবাসার দিন নয়, উপলব্ধি জরুরি

কলাম

তানিয়া সুলতানা

লেখাটি আরো বারোদিন আগে দেবার কথা ছিল। দেরিটা অনিচ্ছাকৃত নয়, পরিকল্পনামাফিক। নিউজফিড থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারির রেশ ফিকে হলেই লেখাটি লিখব বলে ভেবে রেখেছিলাম। আমি মানুষটাই এমন, কচ্ছপের মতন চলতে থাকি, জগতের শান্ত সমাহিত সুর আমাকে টানে। সামনে যেমন চলি পেছন পানে, ডানে বামে চাইবার অবসরও রাখি। খরগোশের মতন লাফিয়ে লাফিয়ে চলতে গেলে বরং হাঁপ ধরে যায়।

তবে আধুনিকতা, মেট্রোজীবন মানেই তো ছুটে চলা, জ্যাম, অফিস, ঘড়ির কাঁটা, রেস্টুরেন্টে খানাপিনা, আড্ডা, উইকেন্ড, গিফট, কেনাকাটা, সেলিব্রেশন, সেলফি, ইন্সটা/ সোশ্যাল মিডিয়া। এমন জীবনেও প্রেম আসে, লোকে বাসা বাঁধতে চায়, বাবা-মাকে নিয়ে ভবিষ্যত দাঁড় করাতে চায়, বাচ্চা- কাচ্চা আনে, এর কোনটাই মিথ্যে নয়। ফলে জীবনের জন্য টাকা, না টাকার জন্য জীবন এমন প্রশ্ন সামনে চলে আসে, জীবনের সমীকরণ জটিল করে দেয় মাধ্যমিকের সরল অংকের মতনই। আর তাই নিয়েই আমাদের আজকের এই অবতারণা।

আধুনিকতার আবেগহীন নিয়ত ছুটে চলায় আমরা যে ক্রমশ যন্ত্রে পরিণত হই, শেষকালে কিন্তু যন্ত্রই আনফিট হয়ে পরে। নিয়ত ছুটে চলা, এই ধাবমানতা আমাদের চরম দুঃখ ও বিষাদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একটি কথা ভুলে গেলে চলবে না যে প্রিয়জন, পরিবার, বন্ধু, স্বজনদের ভাল রাখার এবং ভালবাসার প্রয়োজন থেকেই আমরা অগ্র-পশ্চাৎ না ভেবে খেটেখেটে মরি। কিন্তু তাদের নিত্য প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে অনেককিছু ভুলেও যাই— ভুলে  জীবন সংগীকে জড়িয়ে ধরা, সন্তানের সাথে ক্যারম খেলা হয় না। মাকে ইনসুলিন পুশ করার সময় আরো ১০ মিনিট গল্প করার প্রবৃত্তি হয় না। ফলে পরিবারে থেকেও, পরিবারের মানুষের জন্য উপার্জন করেও আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি, দূরত্ব বাড়ে। ছোটছোট কাজের জন্য কৃতজ্ঞতার হাসি বিনিময় কিংবা কেবলই মুগ্ধ দৃষ্টি বিনিময়। মা কিংবা শাশুড়ির সাথে অতীত দিনের স্মৃতি রোমান্থনের সুযোগ কই ব্যস্ত নাগরিক জীবনে!

এইসব বাঁধন আলগা মানুষ নিজের শান্তি থেকে, বাসনা থেকে এমনকি নৈতিকতা থেকে বিচ্যুত হতে পারে সহজেই। পরিবার স্বজনদের প্রতি কৃতজ্ঞ না হয়ে উল্টো পরিবারের জন্য এত কষ্ট করে ‘কী পেলাম’ নামক হতাশায় ডুবে যেতে পারে। ফলে নিজেকে এত বেশি ব্যস্ত রাখলেই যে কেবল লাভ এই চিন্তা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। আপনি হয়তো অনেক কাজ করছেন কিন্তু দিনশেষে তৃপ্ত হতে পারছেন না। নিজের কাজ নিয়ে, কাজের মান নিয়েও সন্তুষ্ট হতে পারছেন না। নিজের সন্তানের বিশেষ দিনে স্কুলে থাকতে পারা, বাচ্চার ছোটছোট অর্জন আবিষ্কার করার মধ্য দিয়ে নিজের ফেলে আসা শৈশবকে ছুঁয়ে দেখার যে অপার্থিব সুখ, সেটা কর্মী হিসেবেও আপনার দক্ষতা বা দেবার ক্ষমতা বাড়িয়ে দিতে পারে। একটা সময় বাসার সমস্যা বাসায় মিটিয়ে ঠিক সময়ে অফিস করাটাকে প্রফেশনালিজম বলে তারিফ করা হত। কিন্তু এখন চারদিকে সংকটটা অন্যখানে, পারিবারিক সম্পর্ক যখন শিথিল হয়ে যাচ্ছে আধুনিক পশ্চিমা জীবনে, সন্তানরা যখন আলাদা হয়ে যাচ্ছে, যুগল জীবনে যখন ভয় আর অনিশ্চয়তা বাসা বেঁধেছে, তখন পরিবারের কোন বিশেষ দায়িত্ব পালন না করে অফিসে আসতে বাধ্য করাটা অমানবিকতা বলেই বিবেচিত হচ্ছে। পরিবর্তন আসছে অফিস পলিসিতে। উইকেন্ড বড় হচ্ছে ইউরোপে। পশ্চিমা দেশগুলোতে এমন অনেক অফিস মনে করে বিশেষ পরিস্থিতিতে, প্রয়োজনে কর্মীকে হোম অফিসেরও সুযোগ দেয়া যেতে পারে। আমরা যত ব্যস্ত হব, ভ্যালেন্টাইন, মা দিবস, বাবা দিবস, জন্মদিন বা নিজেদের বিশেষ বার্ষিকী উদযাপনের বিষয়গুলো তত জনপ্রিয় হবে। এই বিশেষদিনগুলোকে নিছকই পশ্চিমা সংস্কৃতি ভেবে দূরে সরিয়ে রাখা এখন আর সম্ভব না। কারণ এই বিষয়গুলো গড়ে উঠেছে আধুনিক জীবনের সংকট থেকে, পুবপশ্চিম বরং আমাদের দিকভ্রান্ত করে তুলতে পারে!

ফলে, পরিবার ও স্বজনকে সময় দেবার জন্য এই বিশেষ দিনগুলো তো নেহাৎ মন্দ নয়। বরং এ ধরনের দিবসে বিশেষ ছুটি বা ভিন্ন কিছু আয়োজন করা উচিত কর্মীদের জন্য। পরিবারের প্রতি সম্পৃক্ত হলে কর্মীদের মাঝে কাজের স্পৃহা বেড়ে যেতে পারে। তা না হলে এই বিশেষ দিবসগুলোতে কেক, চকলেট, ফুল কিংবা কেবল উপহার কেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে। যত ব্যস্ত হয়ে পড়বেন গণমাধ্যম এবং মুনাফালোভী চক্র ততবেশি শক্তিশালী হয়ে উঠবে। আপনাকে দিবস উদযাপনের একটা কাঠামোতে ফেলে দেবে। যাতে খরচ হবে বিস্তর কিন্তু লাভালাভ যা হবার ওদেরই হবে। আপনার জন্য নতুন কিছু সংযোজিত হবে না। বিশেষ দিন উদযাপনের দর্শনটাকে ধারণ না করে, না বুঝে কেবল মাকে কিংবা বাবাকে, প্রিয়জনকে উপহার দিয়ে সাময়িক তুষ্টি অর্জন হয়তো বা সম্ভব, কিন্তু দিনশেষে পকেট গড়ের মাঠ হলেও হিসেব মিলবে না। কেননা, সম্পর্কের যত্ন নিতে হয় প্রতিদিন, যেটা কেবল উপলব্ধি দিয়েই সম্ভব, উপহার দিয়ে নয়!

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *