মিশু চৌধুরী
২২ গজে বদলে যাওয়া স্বপ্ন,
বিশ্বকাপের সাফল্য ছাড়িয়ে বাংলাদেশের মেয়েদের নতুন ক্যারিয়ারের নাম নারী ক্রিকেট।
বিশ্বজুড়ে এখন ফুটবল বিশ্বকাপের উন্মাদনা। গ্যালারিতে উচ্ছ্বাস, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তর্ক-বিতর্ক আর সংবাদমাধ্যমের শিরোনামজুড়ে ফুটবল। ঠিক সেই সময়ই শেষ হয়েছে নারী টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। আলো হয়তো কিছুটা কম ছিল, কিন্তু বাংলাদেশের মেয়েরা মাঠে এমন এক বার্তা দিয়েছে, যা শুধু একটি টুর্নামেন্টের সাফল্য নয়, বরং বাংলাদেশে নারী ক্রিকেটের ভবিষ্যতের এক নতুন ঘোষণা।নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ৬ উইকেটে নারী দলের আত্মবিশ্বাসী জয়, যেখানে জুয়াইরিয়া ফেরদৌস ৩৩ বলে ৫০ রানের ম্যাচজয়ী ইনিংস খেলে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সফল রান তাড়া সম্পন্ন করেন। এটি ছিল তাঁর প্রথম বিশ্বকাপ, তাই ইনিংসটি অনন্য।

বাংলাদেশের টোটাল রান কম থাকায় ম্যাচে না জেতার সম্ভাবনাই ছিল বেশি। তবে এই কম রান নিয়েও মেয়েরা পাকিস্তানকে ২৩ রানে হারিয়ে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে এবং শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে শেষ পর্যন্ত লড়াই করে যাওয়ার মানসিকতা দেখিয়েছে। স্বর্ণা আক্তার মাত্র ২২ বলে ৩৯ রান করেন। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ জানিয়ে দিয়েছে, তারা আর শুধু বিশ্বকাপে অংশ নিতে যায় না; জিততে যায়, প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে যায়। এই ম্যাচে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিলেন লেগ স্পিনার মেঘলা এবং অফস্পিনার নাহিদা। তাঁরা যথাসময়ে ৩টি করে উইকেট নিয়ে নিজেদের সেরাটা দেখিয়েছেন। সঠিক সময়ে অভিজ্ঞ নাহিদাকে ব্যবহার করে জ্যোতি বুঝিয়েছেন কেন তিনি অধিনায়ক।
এই সাফল্য শুধু স্কোরবোর্ডে সীমাবদ্ধ নয়, এটি বদলে দিচ্ছে হাজারো কিশোরীর স্বপ্ন। যে ক্রিকেটকে একসময় অনেক পরিবার স্রেফ শখ হিসেবে দেখত, ক্রিকেট খেললে মেয়েদের বিয়ে হবে না, এমন নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়ে যেসব মেয়েরা ক্রিকেট ছেড়ে দিয়েছিল, সেই ক্রিকেটই এখন ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে সম্মানজনক ও সম্ভাবনাময় পেশা।

একসময় কোনো মেয়ে যদি বলত, ‘আমি বড় হয়ে ক্রিকেটার হতে চাই’, অনেকেই প্রশ্ন করতেন, ‘তারপর?’ সেই ‘তারপর’-এর কোনো উত্তর ছিল না। কারণ সুযোগ সীমিত ছিল, কাঠামো ছিল দুর্বল, আর ক্রিকেটে মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিত হওয়ার মতো কোনো বাস্তবতা ছিল না।
এখন সেই বাস্তবতা বদলে দিয়েছে ক্রিকেট বোর্ড। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ধারাবাহিক উন্নতির পাশাপাশি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) নারী ক্রিকেটকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় এনেছে। জাতীয় দলের পাশাপাশি এখন রয়েছে বাংলাদেশ ‘এ’ দল, বয়সভিত্তিক দল এবং প্রতিভা বিকাশের বিভিন্ন স্তর। স্কুল ক্রিকেটে জোর বাড়ানো হচ্ছে; নতুন ক্রিকেটার খুঁজে বের করতে কোচ ও নির্বাচকদের কার্যক্রম আরও সক্রিয় করা হয়েছে। আটটি বিভাগে সাবেক নারী ক্রিকেটারদের মেন্টর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে। উদ্দেশ্য একটাই, একজন মেয়ে যেন ছোটবেলা থেকেই একটি সুস্পষ্ট ক্রিকেট যাত্রার পথ খুঁজে পায়, খুঁজে পায় নতুন পথের ঠিকানা।
ঘরোয়া ক্রিকেটের পরিধিও আগের চেয়ে বিস্তৃত হয়েছে। নারী প্রিমিয়ার লিগ, এনসিএল, বিসিএলসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতা ক্রিকেটারদের নিয়মিত ম্যাচ খেলার সুযোগ করে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সফল হতে হলে প্রতিভার পাশাপাশি দরকার নিয়মিত প্রতিযোগিতা, ম্যাচের চাপ সামলানোর অভিজ্ঞতা এবং পেশাদার পরিবেশ।
পরিবর্তন এসেছে আর্থিক দিকেও। নতুন প্রেসিডেন্ট তামিম ইকবাল এসেই নারী ক্রিকেটারদের বেতন, কেন্দ্রীয় চুক্তি, ম্যাচ ফি এবং অন্যান্য সুযোগ সুবিধা আগের তুলনায় দ্বিগুণ করে দিয়েছেন। একই সঙ্গে ফিটনেস, পুষ্টি, মানসিক প্রস্তুতি ও দক্ষতা উন্নয়নের মতো বিষয়েও গুরুত্ব বাড়ানোর পরিকল্পনা চলছে। অর্থাৎ, একজন নারী ক্রিকেটারকে শুধু খেলোয়াড় হিসেবে নয়, একজন পূর্ণাঙ্গ পেশাদার ক্রীড়াবিদ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় দিকটি হলো, ক্রিকেট এখন আর শুধু খেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।

একজন নারী ক্রিকেটার খেলোয়াড়ি জীবন শেষ করেও ক্রিকেটের সঙ্গেই যুক্ত থাকতে পারেন। কোচ, আম্পায়ার, ম্যাচ রেফারি, নির্বাচক, ধারাভাষ্যকার কিংবা মেন্টর হিসেবে ক্রিকেটকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন নতুন পেশার সুযোগ। ফলে একজন মেয়ের জন্য ক্রিকেট এখন একটি দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ারের নাম।(আন্তর্জাতিক) নারী আম্পায়ার হিসেবে আমার অভিজ্ঞতাও একই কথা বলে। এখন একজন মেয়ে যদি নিষ্ঠা, পরিশ্রম ও ধৈর্য নিয়ে ক্রিকেটে এগিয়ে আসে, তবে তার সামনে সম্ভাবনার পরিধি অনেক বড়। খেলোয়াড়ি জীবন শেষ হলেই পথ শেষ হয়ে যায় না; বরং তখনই শুরু হতে পারে ক্রিকেটের আরেকটি অধ্যায়। আম্পায়ারিং, coaching (কোচিং), ম্যাচ রেফারিং কিংবা ক্রিকেট প্রশাসনে কাজ করার অফুরন্ত সুযোগ রয়েছে। তবে সেই পথের ভিত্তি তৈরি হয় একজন ক্রিকেটার হিসেবেই।
বাংলাদেশ নারী দলের অধিনায়ক নিগার সুলতানা জ্যোতির স্বপ্ন ছিল, বাংলাদেশ যেন বিশ্বকাপ খেলতে কোয়ালিফায়ার পেরোনোর অপেক্ষায় না থাকে, বরং সরাসরি বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নেয়। সেই স্বপ্ন এখন বাস্তব হওয়ার পথে। এটি শুধু একটি টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়ার অর্জন নয়, বরং বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটের ধারাবাহিক অগ্রগতির প্রতীক। ২০২৮ নারী টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপে মেয়েরা সরাসরি পাকিস্তানে অংশগ্রহণ করবে।
একটা সময় ছিল, যখন গ্রামের কোনো মেয়ে ক্রিকেট ব্যাট হাতে নিলে সেটি ছিল ব্যতিক্রমী দৃশ্য। আজ সেই দৃশ্য চিরচেনা। দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা, স্কুল ও একাডেমিতে অসংখ্য মেয়ে ক্রিকেট শিখছে। তারা শুধু জাতীয় দলের জার্সি পরার স্বপ্ন দেখছে না, তারা বিশ্বাস করছে ক্রিকেট দিয়েও নিজের ভবিষ্যৎ গড়া সম্ভব।

নারী ক্রিকেটের এই পরিবর্তন এক দিনে আসেনি। এর পেছনে রয়েছে খেলোয়াড়দের পরিশ্রম, পরিবারের সমর্থন, কোচদের অবদান, ক্রিকেট বোর্ডের পরিকল্পনা এবং সবচেয়ে বড় কথা, আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের প্রতিনিয়ত প্রমাণ দিয়ে চলা।
বিশ্বকাপের কয়েকটি জয় হয়তো ইতিহাসের পাতায় পরিসংখ্যান হয়ে থাকবে। যেমন আপনাদের নিশ্চয়ই ২০১৮ সালে ভারতকে হারিয়ে এশিয়া কাপ জয়ের কথা মনে আছে। এই জয় বদলে দিয়েছিল পুরো নারী ক্রিকেটকে। তবে জয়ের আসল মূল্য তৈরি হয়েছিল অন্য জায়গায়। হয়তো তখন কোনো গ্রামের এক কিশোরী প্রথমবারের মতো তার বাবাকে বলেছিল, ‘আমি ক্রিকেট খেলতে চাই।’ হয়তো কোনো পরিবার প্রথমবারের মতো মেয়ের হাতে ব্যাট তুলে দিয়েছিল এই বিশ্বাসে যে, ক্রিকেটও হতে পারে তার ভবিষ্যৎ।
বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো ট্রফি এবং একটি বিশ্বকাপ জয়। কিন্তু আমার কাছে সবচেয়ে বড় অর্জন হলো, তারা একটি প্রজন্মকে বিশ্বাস করাতে পেরেছে, স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে যে, তোমরা চাইলেই আসতে পারো, লর্ডসের মাঠে ম্যাচ খেলতে পারো। তোমরা চাইলেই হতে পারো মারুফা, জ্যোতি কিংবা নাহিদা।
এই স্বপ্নের ২২ গজে আসুক একঝাঁক তরুণী। নেশা নয়, এটি হতে পারে পেশা, একটি পরিচয়, একটি ভবিষ্যৎ।