চারদিক২৪ ডেস্ক
বিশ্ব যখন জলবায়ু পরিবর্তন, ক্রমবর্ধমান বায়ু দূষণ এবং গ্রীন হাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাসের জন্য জীবন পন লড়াই করছে তখন টেকসই পরিবহনের জন্য বৈদ্যুতিক যানবাহন বা ইভি অন্যতম সম্ভাবনাময় হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বেশ কিছু দেশের সরকার প্রণোদনা দিচ্ছে, গাড়ি নির্মাতারা নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিলিয়ন বিলিয়ন অর্থ বিনিয়োগ করছে এবং ভোক্তারা ক্রমবর্ধমানভাবে বৈদ্যুতিক এই বাস্তবতাকে গ্রহণ করছে। বিশ্বের অনেক প্রান্তে ইভি এখন আর কোন ভবিষ্যতের ধারণা নয়, এগুলো এখন দৈনন্দিন বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে।

তবুও বৈদ্যুতিক যানবাহনের ক্ষেত্রে পরিবেশগত প্রেক্ষাপট প্রচলিত ধারণার চেয়ে অনেক বেশি সুক্ষ্ম এবং গুরুত্বপূর্ণ। যদিও ইভি নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য পরিবেশগত কিছু সুবিধা প্রদান করে তবে, এগুলো এমন কিছু চ্যালেঞ্জ তৈরি করে যা সতর্কতার সাথে বিবেচনা করতে হবে। এর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করে কিভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়, কিভাবে ব্যাটারি তৈরি করা হয়, কিভাবে ব্যাটারি পুনর্ব্যবহার করার জন্য প্রস্তুত করা হয় এবং সমাজ কিভাবে দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিবহন ব্যবস্থার সাথে নিজেদের মানিয়ে নেয় তার ওপর। একটি সত্যিকারের টেকসই ভবিষ্যৎ গড়তে হলে বৈদ্যুতিক যানবাহনের শক্তি এবং সীমাবদ্ধতা উভয়ই বোঝা অপরিহার্য।
ক্রমবর্ধমান জলবায়ু সংকটের প্রভাব:
বিশ্বব্যাপী এনার্জি খাতে কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গমনের প্রায় এক চতুর্থাংশের জন্য পরিবহন দায়ী। পেট্রোল এবং ডিজেল চালিত প্রচলিত যানবাহন কার্বন-ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড এবং সূক্ষ্ম কণা পদার্থ নির্গত করে যা বৈশ্বিক উষ্ণতা এবং বায়ুর মান খারাপ হওয়ার জন্য দায়ী। তবে ইভির ক্ষেত্রে উল্লেখ্য পদার্থগুলোর নির্গমন সম্পন্নরূপে বন্ধ থাকে। সাধারণ পেট্রোল বা ডিজেল চালিত বাহনের ইঞ্জিন গুলো অভ্যন্তরীণ দহনের মাধ্যমে চলে থাকে বলে সেখান থেকে ধোঁয়া উৎপন্ন হয়, কিন্তু ইভি গুলো রিচার্জেবল ব্যাটারিতে সঞ্চিত বিদ্যুতে চলে বলে এখান থেকে কোন ধরনের ধোয়া উৎপন্ন হয় না। আপাত দৃষ্টিতে সাধারণ পার্থক্যটি জনস্বাস্থ্য এবং পরিবেশ উভয়ের জন্যই গভীরভাবে প্রভাব ফেলে।
জনবহুল শহরগুলিতে যেখানে যানজট একটি সাধারণ ঘটনা মাত্র সেখানে জ্বালানি চালিত যানবাহনের পরিবর্তে ইভি ব্যবহার করলে শহরের বায়ুদূষণ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেতে পারে। বায়ু পরিষ্কার থাকার অর্থ হলো শ্বাসকষ্ট জনিত অসুস্থতা হ্রাস, স্বাস্থ্যসেবার খরচ কমায় এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত হতে পারে শিশু বয়স্ক এবং দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন এমন ব্যক্তিদের জন্য। তাছাড়া ইভি গুলো প্রচলিত যানবাহনের চেয়ে অনেক বেশি নীরবে চলে এতে করে শব্দ কমায়, ফলে শহরের জীবনযাত্রার মান উন্নত হতে পারে, মানসিক চাপ কমতে পারে এবং আশেপাশের এলাকা গুলো আরো মনোরম হয়ে উঠতে পারে। সম্ভবত বৈদ্যুতিক যানবাহনের সবচেয়ে বড় পরিবেশগত সুবিধা হল গ্রীন হাউজ গ্যাস নির্গমন সম্পূর্ণরূপে কমিয়ে ফেলে। যদিও ইভি চালানোর জন্য বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়, বৈদ্যুতিক মোটরগুলো পেট্রল ইঞ্জিনের চেয়ে অনেক বেশি পরিবেশকে দূষণ করে।

প্রচলিত ইঞ্জিন গুলো জ্বালানি শক্তিকে গতিশক্তিতে রূপান্তরিত করে, কিন্তু বৈদ্যুতিক মোটরগুলো বৈদ্যুতিক শক্তির একটি বড় অংশকে ব্যবহারযোগ্য শক্তিতে রূপান্তরিত করে। এর মানে হলো শক্তির অপচয় কম হয়। বিদ্যুৎ যখন সৌর, বায়ু বা জলবিদ্যুৎ এর মত নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপন্ন হয় তখন এর পরিবেশগত সুবিধে আরো বেড়ে যায়। যে সকল দেশে এই ধরনের নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা হয় সে সকল দেশে নাটকীয়ভাবে পরিবেশে কার্বন নিঃসরণের মাত্রা কমে যায়।
ব্যাটারির চ্যালেঞ্জ:
‘লিথিয়াম আয়রন ব্যাটারি’ যা প্রতিটি আধুনিক বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রাণকেন্দ্র, এটি উৎপাদনের জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণে লিথিয়াম, কোবাল্ট, নিকেল, গ্রাফাইট এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পদার্থের প্রয়োজন হয়। এই উপাদানগুলো উত্তোলনে প্রচুর পরিমাণে শক্তি খরচ হয়, যা কিনা পরিবেশগত মান দুর্বল করতে বড় প্রভাব ফেলে। কিছু অঞ্চলে খনি উত্তোলন কার্যক্রমের সাথে সেই সকল অঞ্চলের পানির অভাব, বাসস্থান ধ্বংস এবং মাটির অবক্ষয়ের সম্পর্ক রয়েছে। ব্যাটারি উৎপাদনের ক্ষেত্রে অধিক পরিমাণে শক্তি ব্যয় হয়। একটি বৈদ্যুতিক যান তৈরি করতে পরিবেশে যেই পরিমান কার্বন নিঃসরণ হয়, এর চাইতে অনেক অল্প কার্বন নিঃসরণ হয় গ্যাসোলিন চালিত যান তৈরি করতে।
সমালোচকরা প্রায়শই এই বিষয়টিকে “বৈদ্যুতিক যান পরিবেশবান্ধব নয়” তার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেন, তবে এই যুক্তিটি একটি গাড়ির সম্পূর্ণ জীবন চক্রকে উপেক্ষা করে। যদিও বৈদ্যুতিক যান তৈরীর শুরুতে অনেক বেশি শক্তি প্রয়োজন পড়ে, তবে বছরের পর বছর ধরে গাড়ি চালানোর পরেও কোন ধরনের কার্বন নিঃসরণ হয় না। একটি বৈদ্যুতিক যান যত বেশি দিন ব্যবহৃত হয়, এর পরিবেশগত সুবিধা তত বাড়তে থাকে।
যেসব দেশে কয়লা বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান উৎস সেখানে একটি বৈদ্যুতিক যান চার্জ করার ফলে পরোক্ষভাবে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কার্বন নির্গমন হয় যদিও যানটি নিজে কোন ধোঁয়া উৎপন্ন করে না। আবার বিপরীতভাবে যে সকল দেশে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ছে সেখানে বৈদ্যুতিক জানগুলো উল্লেখযোগ্য ভাবে কম পরিবেশগত প্রভাব ফেলে। অর্থাৎ শুধুমাত্র বৈদ্যুতিক যানবাহনের প্রচারই যথেষ্ট নয়, টেকসই পরিবহনের ক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন অনেক বেশি জরুরী। গবেষকরা এমন ব্যাটারি তৈরি করছেন যেটি দ্রুত চার্জ হয়, বেশিদিন টেকে, কম দুষ্প্রাপ্য খনিজ পদার্থের প্রয়োজন হয় যাতে করে পরিবেশের উপর এর প্রভাব কমানো যায় এবং অধিক শক্তি প্রদান করতে পারে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রতিবন্ধকতা:
এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক দেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বৈদ্যুতিক যানবাহন ব্যবহারের সুযোগ এবং প্রতিবন্ধকতা উভয় দেখতে পাওয়া যায়। একদিকে যেমন বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানি করার ক্ষেত্রে জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরতা কমবে, এতে করে শহরের বায়ুর মান উন্নত হতে পারে এবং জলবায়ুতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে; অন্যদিকে বৈদ্যুতিক যান চার্জিং নেটওয়ার্কের বিনিয়োগ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সহায়তা না করলে বৈদ্যুতিক গাড়ি চালোনায় ব্যাপক অনিহা দেখা দেবে। কারণ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বৈদ্যুতিক সংকট অনেক বড় একটি প্রতিবন্ধকতা।
বৈদ্যুতিক যানবাহনে পরিবেশগত প্রভাবকে কেবল ভালো কিংবা খারাপ এই সাধারন তকমা দিয়ে উল্লেখ করা যাবে না। কারণ মূলত এগুলো কোন নিখুঁত সমাধানও নয় আবার পরিবেশগত কোন অলীক কল্পনাও নয় বরং বৈদ্যুতিক যান গুলো পরিবেশ বান্ধব পরিবহন ব্যবস্থার দিকে একটি বৃহৎ রূপান্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এটির সাফল্য নির্ভর করে দায়িত্বশীল খনিজ সম্পদ আহরণ, পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন, কার্যকর ব্যাটারি পুনর্ব্যবহার, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং সুচিন্তিত জননীতির ওপর। ক্রমবর্ধমান প্রমাণ এটাই নির্দেশ করে যে, বৈদ্যুতিক জানগুলো সাধারণত প্রচলিত যানবাহনের তুলনায় কম গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত করে এবং বায়ু দূষণও কম ঘটায় বিশেষ করে যখন বিদ্যুৎ ব্যবস্থা আরও পরিবেশবান্ধব হয়ে উঠেছে। দায়িত্বশীল উদ্ভাবন, সচিন্তিত নীতি এবং সচেতন জন অংশগ্রহণের মাধ্যমে বৈদ্যুতিক যানবাহন আগামী প্রজন্মের জন্য একটি স্বাস্থ্যকর পৃথিবী গড়ার বৈশ্বিক প্রচেষ্টায় শক্তিশালী চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।