একটি সিসি ক্যামেরা: ক্ষমতা বনাম ক্ষমতাহীনতার দৃশ্যায়ন

কলাম

তপন মাহমুদ  লিমন

খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। অনেক ঘটনার আড়ালে চাপা পড়ে গেছে বা যাবে। আমরা এক রনিকে (নুরুল আজম) দেখেছিলাম। চড়ের পর চড় দিয়ে যাচ্ছে একজনকে। কখনও চুল ধরে টানছে, মাথা ঝাকাচ্ছে। টেবিল চাপড়াচ্ছে। তার কথা না শোনায় সহিংসভাবে শাসাচ্ছে। আর অসহায় একজন রাশেদ মিয়া হাত জোর করছে। বারবার। তবু রক্ষা পাচ্ছেন না মারের হাত থেকে। ওইখানে তিনি একাই ছিলেন, চাইলে একা রনিকে প্রতিহত করার চেষ্টা করতে পারতেন। কিন্তু কেন করবেন? কারণ তিনি জানেন, রনি ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক। তার অনেক ক্ষমতা। তিনি রাষ্ট্রের জন্য মহাগুরুত্বপূর্ন ব্যক্তি! তার মত দায়িত্বশীলরাই তো এমন গুরুত্বপূর্ন পদের অধিকারী হতে পারেন। তারাই তো দেশের বর্তমান। তারাই ভবিষ্যত। তাই তো, রাশেদ মিয়াকে অসহায়ের মত বারবার করুনা ভিক্ষা করতে হয়। চড়ের পর চড় নিরবে হজম করতে হয়।

ধন্যবাদ সিসি ক্যামেরাটাকে। দৃশ্যগুলো ধরে রেখেছে। মানুষ নয় বলে হয়তো, মুখ ঘুরিয়ে নিতে পারে নি। আর গোটা জাতি দেখছে, একজন রনির কাছে রাশেদরা কত অসহায়। কিন্তু সবখানে ওই নিরপেক্ষ বস্তুটা, মানে সিসি ক্যামেরাটা থাকেনা। ফলে অনেক চড়, অনেক মার, অনেক অপমান ইতিহাসের গর্ভে হারিয়ে যায়। অনেক রাশেদ নিরবে ডুকরে কাঁদে। অনেক রাশেদ আপোষ করে নেয় চুপেচাপে। আর রনিরা বড় হতে থাকে অর্থে, বিত্তে, ক্ষমতায়। একেবারে চারা ছাত্রলীগ থেকে মহীরুহ আওয়ামী লীগ হয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখে। এমনটা আগেও ঘটেছে। ক্ষমতাসীন দলের লোকজনরা এমন ঘটনা বারবার ঘটাতে থাকে। এমন অনেকে চারা ছাত্রদল থেকে বটবৃক্ষ বিএনপি হয়েছে। আর সেসময়, সিসি ক্যামেরাটা এমন জনপ্রিয় হয়নি। আর সামাজিক যোগাযোগের যুগও ছিলনা সেটা। বর্তমান সময়ের বিবেচনায় বেশ অন্ধকার যুগই বলা যায়। ফলে, খুব কম ঘটনাই আলোতে আসার সুযোগ পেত।

বাংলাদেশের সব মানুষ ‘ঘাষে মুখ দিয়ে চলে না’। ফলে তারা হয়তো ঠিকই আন্দাজ করতে পারে কেন রনি রাশেদকে মেরেছিল। কেন রনিরা রাশেদদের উপর চড়াও হয়। তাই রনি যতই বিবৃতি দেন না কেন, আমাদের বুঝতে খুব বেশি সময় লাগে না, মারের কারণ কি ছিল! তবুও রনির বয়ান সত্য ধরে নিলেও কিছু প্রশ্ন তো তোলাই যায়? ব্যবসায়ীক অংশীদারকে কি যখন তখন চড়-থাপ্পর দেয়া বৈধ? জায়েজ? ধারের টাকা পরিশোধ না করলে এভাবে অফিসে গিয়ে চড় থাপ্পর করা, মারধর করা, অপমান-অপদস্থ করা কি স্বাভাবিক? রনি ক্ষমতাসীন দলের মানুষ। ছাত্রলীগের মত এত বড় একটা সংগঠনের মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক। তিনি চাইলে অনায়াসে আইনের আশ্রয় নিতে পারতেন। সালিশ বসাতে পারতেন। কারণ, বিরোধীরা যতই বলার চেষ্টা করুক না কেন, দেশে আইনের শাসন নাই, সরকার তো তা স্বীকার করছে না। তাই সরকার দলের লোক হয়ে আইনের পথে না হেঁটে, মার-ধরের পথে হাঁটা কি উচিত হল? তাহলে তো সরকারের ভাবমূর্তিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তাই না? যদিও এক নেতার দু’একটা চড় থাপ্পরে আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগের মত এত বড় প্রতিষ্ঠানের ভাবর্মূর্তির কি বা এসে যায়? কারণ এমন ইতিহাস প্রাগৈতিহাসিক আমল থেকে নিকট অতীতেও দেখা গেছে, ব্যক্তির দোষের ভার দল নেয় না। তবে ভাল কাজ করলে সদলে লাফিয়ে পড়ে তার ভাগ নিতে।

যাই হোক, শুনেছি রনি ছাত্রলীগের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। খুশির খবর। কিন্তু সত্য হল, একজন রনি কোন সমস্যাই না। সমস্যা এই ব্যবস্থায়। একজন রনি চলে যাবেন। আরেকজন ‘রনি’ আসবেন। তাতে কি চড়-থাপ্পরের সংস্কৃতি বন্ধ হবে? এতদিনে যা হয় নি, তা যে খুব শিগগিরই হয়ে যাবে, তা কি করে আশা করতে পারি আমরা? এমন আলাদিনের চেরাগ নিয়ে কে বদলে দিবেন অনায্য ব্যবস্থাটা? একজন ছাত্রলীগের নেতা, যার প্রধান পরিচয় একজন ছাত্র (হওয়া উচিত), তিনি চাইলেই একজনকে ৯/১০ লাখ টাকা ধার দিয়ে দিতে পারেন। বাহ! কোথা থেকে আসে এত টাকা? ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের নেতা কর্মীদের আঙুল ফুলে কলা গাছ হবার ঘটনা নতুন নয়। ব্যাংকের ‘মালিক’ পর্যন্ত হয়েছেন অনেকে।

আহমদ ছফার একটা উপন্যাস আছে। নাম ‘ একজন আলি কেনানের উত্থান পতন’। উপন্যাসের শুরুটাই একজন সাধারনের অসাধরণ হয়ে ওঠার গল্প দিয়ে। একজন ক্ষুধার্ত বৃদ্ধ, নাম তার আলি কেনান, এক পথচারীর সামনে গিয়ে চোখে চোখ রেখে বলে, ‘দে তোর বাপরে একটা ট্যাহা’। পেয়ে যায়। বদলে যায় তার দৃষ্টিভঙ্গি। সে বুঝে ফেলে, জোর দিয়ে চাইলে অনেক কিছু ঘটে যেতে পারে। নিরবেই সে হয়ে ওঠে ক্ষমতাবান। সাধারণ নৌকার মাঝি থেকে হয়ে ওঠেন আশ্চর্য প্রভাবশালী পীর। গড়ে তোলেন তার বিশাল সাম্রাজ্য।

রনিদের উত্থানের গল্পটা আসলে এরকমই। রাতারাতি উত্থান হয় তাদের। আলি কেনান হয়ে উঠতে পারবে কিনা, সেটা সময়ের ব্যপার। তবু, তারাও খুব দ্রæতই ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে যান। ক্ষমতার অস্বাভাবিক ব্যবহার করতে শুরু করেন। একই সাথে নিজেও ব্যবহার হতে থাকেন নানান উপায়ে। আদতে তিনি আর পুরনো রনি থাকেন না। বদলে যান। ক্ষমতার গরমে মাথার উপরে সিসি ক্যামেরা আছে কি নেই, সেটা ভাবারই সময় পান না। ভুলে যান কোনটা ন্যায়, কোনটা অন্যায়। নায্যতার সংজ্ঞা তার কাছে বদলে যায়। কারণ তার সামনে যে অসংখ্য কলাগাছ, যারা আঙুল ফুলেই হয়েছেন।

তাই প্রতিনিয়ত, এরকম হাজারো রনির জন্ম হয় বাংলাদেশে। তারা এক একজন আলি কেনান। তাদের উত্থান বিস্ময়কর! আর সে বিস্ময়ে তাদের কানে এমনই তালা লেগে যায়, তারা কখনই, পতনের শব্দ শুনতে পান না। তারা হয়তো ভাবারই সময় পান না, দেয়ালের এক কোনে মুনকার-নকিরের মত, আমলনামা ধারণ করার জন্য ওঁত পেতে আছে সিসি ক্যামেরা।

তবে, প্রকৃত সিসি ক্যামেরা হল মানুষের চোখ। যা প্রতিনিয়ত দেখছে। ধারণ করছে অসংখ্য দৃশ্য। অসংখ্য রনির এমন উন্মত্ত ক্ষমতার প্রদর্শনী বন্দী হয় জনগনের সিসি ক্যামেরায়। হয়তো মানুষ বলে, সে দৃশ্য সামনে আনতে দশবার ভাবতে হয়। তাই অনেক কিছু আড়ালেই থেকে যায়। কিন্তু এই আশ্চর্য ক্ষমতাবান চোখের লেন্সে যা একবার ধরা পড়ে, সহজে কি ভুলে মানুষ, যখন তা হয় অপমানের?

প্রতিনিয়ত ক্ষমতার দাপট আর এর বিপরীতে ক্ষমতাহীনদের অসহায়ত্বের যে দৃশ্যপট নির্মিত হচ্ছে, তা আসলে কিসের বার্তা দেয়? এসব দৃশ্য আমাদের চোখ খুলে দেয়। আমাদের বুঝতে দেয় যে, ক্ষমতার কাছে, ক্ষমতার দাপটের কাছে, সাধারণ মানুষ কত অসহায়! হাতজোর করে যেখানে পার মেলে না। শরীরের ক্ষত হয়তো দ্রুতই শুকিয়ে যায়, কিন্তু শব্দহীন সিসি ক্যামেরায় অধারণযোগ্য মনের ক্ষত সারাবে কে? যুগ যুগ ধরে চলা অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের দৃশ্য কি ধারণ হবে কোন সিসি ক্যামেরায়? নাকি শব্দহীন সিসি ক্যামেরার মতই আমাদের চোখগুলো? শুধু দেখে যায়, দেখাতে পারে না।

পরিশেষে, একটা প্রশ্ন ছুড়তে চাই, যারা রনির পক্ষে সাফাই গাওয়ার চেষ্টা করছেন তাদের কাছে। তারা অনেকেই বলছেন, চট্টগ্রামে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিবির মুক্ত করার ক্ষেত্রে রনির বিশেষ ভ’মিকা ছিল। ঠিক আছে মানলাম। আওয়ামী লীগের জায়গা থেকে, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের জায়গা থেকে এটা অবশ্যই প্রশংসার দাবীদার বটে। কিন্তু শুধু এ কারণে সে কোন মানুষকে অন্যায়ভাবে, অমানবিকভাবে, অপমানজনকভাবে মারার ‘ক্লিয়ারেন্স’ পায়? এভাবে তাকে কি দায়মুক্ত করা যায়?

লেখক: সহকারি অধ্যাপক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *