ফারাজ নির্মাণ প্রসঙ্গ: শিল্পের দায় ও স্বাধীনতার দ্বান্দ্বিক অবস্থান

কলাম

তানিয়া সুলতানা

আমি শিল্পের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। আমি কোনরকম সেন্সরশিপে বিশ্বাসী নই। শনিবার বিকেলের যেমন মুক্তি চেয়েছি, ফারাজের মুক্তিও চাই। তবে অবিন্তা কবিরের মা রুবা আহমেদ সম্প্রতি ফারাজের নির্মাণ এবং মুক্তি প্রসঙ্গে এমন কিছু কথা বলেছেন, যা নিয়ে প্রতিটি সংবেদনশীল মানুষের ভাবা উচিত।

হলি আর্টিজেন হত্যাকাণ্ডের জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গুরুত্ব এবং ব্যাপকতা রয়েছে। তা সত্ত্বেও একজন সন্তানহারা মায়ের সাথে আমাদের অবস্থানগত এবং আবেগীয় পার্থক্যকে মূল্যায়ণ করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বলে তার ব্যক্তিগত ট্রমাকে খাট করে দেখার সুযোগ নেই। কেননা, রুবা আহমেদের ট্রমাকে শেষতক রুবা আহমেদকেই মোকাবেলা করতে হয় এবং হবে। তাই আমি কেবল শিল্পের স্বাধীনতার কথাই বলতে চাই না, এর দায় রয়েছে কিনা সেটাও পুণর্বিবেচনা করে দেখতে হবে।

আজকাল শোক বা দুর্ঘটনা নিয়ে সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রেও অনেক নতুন নতুন গাইডলাইন তৈরি হয়েছে। পীড়িত ব্যক্তির সাথে কিভাবে কথা বলা যাবে/ যাবে না। ঘটনার বর্ণনার রীতি নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে যেন সংবাদ পড়তে গিয়ে পীড়িত ব্যক্তি শোকগ্রস্ত বা বিষণ্ণ হয়ে না পড়েন।

হানসাল মেহতা আমার পছন্দের পরিচালক, আমি তার কাজ দেখেছি। তবে অবিন্তার মা রুবা আহমেদ তার সন্তান এবং পরিবার এমনকি বাংলাদেশের ভুল রেপ্রিজেন্টেশনের বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। সবথেকে বড় কথা এসব ক্ষেত্রে পরিবারগুলোর সাথে কথা বলে তাদের সম্মতি নেবার বিষয়ে আইন কী বলে জানি না তবে, স্বাভাবিক ভব্যতা বলে মনে করি।

রুবা আহমেদের এই বক্তব্যকে অনেকে নিছকই আবেগ তাড়িত কবলে মূল্যায়িত করেছেন। মা -মেয়ের সম্পর্কে আবেগ না থাকাই তো অস্বাভাবিক। আবেগেকে অনেক বড় জিনিস বলে অন্তত আমার মনে হয়। আমরা যে দেশমাতৃকার জন্য জীবন উৎসর্গ করি সেখানে কি আবেগ নেই একেবারেই? ওনার ট্রমা এত বড় যে নিজের সন্তানের সুন্দর স্মৃতিও উনি হাতড়াতে পারেন কিনা কে জানে! মানুষের কোন কোন আবেগও কিন্তু নতুন যুক্তি তৈরি করে বা নিশানা তৈরি করে। সেই জায়গা থেকে ওনার যুক্তি অবশ্যই ধোপে টেকে, তবে ব্যবসার কাছে টেকে না হয়ত।

প্রিয় পাঠক, লক্ষ করুন, আমি কোথাও বলিনি ফারাজকে আটকে দেয়া উচিৎ। কিন্তু রুবা আহমেদের অবস্থানগত লড়াই কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। কেউ কেউ আবার অবিন্তা কবিরের মায়ের এই প্রচেষ্টাকে উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবছেন। এধরনের সন্দেহ করাটা দোষের নয়। আমি নিজেও সন্দেহবাতিক। আবার তৃতীয় বিশ্বের একজন মানুষ হিসেবে, রুবা আহমেদ গত ছয়মাস যে আইনি লড়াই করছেন সেখানেও ওনার শ্রেণিগত অবস্থান, শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়টি নিশ্চিতভাবে ওনাকে সাহায্য করেছে।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বীরাঙ্গণাদের যত বাজেভাবে রূপালি পর্দায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, সে বিষয়ে বীরাঙ্গণাদের কথা বলার অবকাশ কোথায়? দরিদ্র, কম শিক্ষিত, পীড়িত কিংবা তাদের মা-স্বজনের জন্য এই লড়াইয়ের সুযোগ কই! একটা চলচ্চিত্র নির্মাণ করার ক্ষেত্রে কেন সংশ্লিষ্ট পরিবারের সম্মতি নেয়া হবে না! যতই ফিকশন হোক, নিদেনপক্ষে এইটুকু তো প্রাক-নির্মাণ যজ্ঞের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সম্মতি নেয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ । শুধুমাত্র এই জায়গাটি আমার কাছে সত্যি গুরুত্বপূর্ণ।

তাহলে শনিবার বিকেল নিয়ে আমার অবস্থান কী? আমি দুইটি ছবিরই মুক্তির অপেক্ষায় আছি।শনিবার বিকেল নিয়ে নিহত ২২ জনের পরিবার কোন আপত্তি তোলেনি বলে আমি আগ বাড়িয়ে কিছু বলতে চাই না। ডুব নিয়ে আপত্তি তুলেছিলাম কারণ, মেহের আফরোজের আপত্তি ছিল।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *