বিশ্বকাপে প্রযুক্তির খেলা

খেলা ফিচার

বেজে উঠেছে ফুটবল বিশ্বকাপের দামামা। কাতারে অনুষ্ঠিত ‘ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ ২০২২’ শীর্ষক এ আয়োজনে অংশ নিচ্ছে বিশ্বসেরা ৩২টি দল। মাসব্যাপী ফুটবলের এ বৈশ্বিক আয়োজনকে আকর্ষণীয় এবং স্বাচ্ছন্দ্যময় করে তুলতে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির নানা সুবিধা, যেন প্রযুক্তিময় হয়ে উঠেছে মরুর বুকে ফুটবলের এ শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই। লিখেছেন তানভীর সিদ্দিক টিপু

ফুটবলজ্বরে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আক্রান্ত বাংলাদেশের দর্শকও। আর্জেন্টিনা নাকি ব্রাজিল, ফ্রান্স নাকি জার্মানি- এমন বিতর্কে ঝড় উঠছে চায়ের কাপেও। ফুটবলের এই বিশ্বসেরা আয়োজনকে আরও আকর্ষণীয় করতে এবার যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির হরেক সুবিধা। মাঠ থেকে রাস্তা, যানবাহন, অপরাধ দমন- সবকিছুতে নানা প্রযুক্তির ব্যবহার হচ্ছে এবারের বিশ্বকাপে। আধুনিকতা আর প্রযুক্তির সমন্বয়ে এবারের বিশ্বকাপ হয়ে উঠেছে আরও রঙিন।

ফুটবলে প্রযুক্তির স্পর্শ
মাঠের ভেতর প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারের দেখা মিলবে কাতারে। বল থেকে শুরু করা যাক। আল রিহলা। ইতিহাসের প্রথম প্রযুক্তি সজ্জিত ফুটবল। আরবি শব্দ থেকে উদ্ভূত ‘আল রিহলা’ নামটি জুড়ে দেওয়া হয়েছে এবারের বিশ্বকাপ ফুটবলের সঙ্গে। যেখানে আছে সাসপেনশন সিস্টেম। বলটি ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভিএআর প্রযুক্তি অনুযায়ী খেলা তদারককারীদের কাছে রিয়েল টাইম ডাটা পাঠাতে পারবে। প্রতিটি বলে থাকবে সেন্সর। প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ বার তথ্য পাঠাবে ভিএআর অপারেশন সেন্টারে। এর থ্রিডি অ্যানিমেশন ফুটবলের সংস্পর্শে প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে জড়িত খেলোয়াড়দের সঠিক অবস্থানের জানান দেবে। যেখান থেকে কঠিন অফসাইডও সহজে সিদ্ধান্ত নেবেন রেফারি।

ক্যামেরার চোখে বন্দি
কাতার নামের দেশের পুরোটাই ক্যামেরাবন্দি। যেখানেই যাবেন, যা করবেন ১৫ হাজার ক্যামেরা অনুসরণ করবে আপনাকে। বিশ্বকাপের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা নিয়ামস আব্দুল রাহমান জানিয়েছেন, এস্পায়ার কমান্ড কন্ট্রোল সেন্টার নজরদারিতে রাখবে ১০ লাখ ভ্রমণকারীকে। বিশ্বকাপ আয়োজক কমিটির প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা তিনি বলেন, এখানে যা হবে তা নতুন দিনের সূচনা করবে। কাতার যা করবে তা বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনকে পথ দেখাবে।

সেমি অটোমেটেড অফসাইড টেকনোলজি
আরেক প্রযুক্তি সেমি অটোমেটেড অফসাইড টেকনোলজি। আল রিহলা ফিফার আধা-স্বয়ংক্রিয় অফসাইড প্রযুক্তির কার্যকারিতায় সাহায্য করবে। এই বলের মধ্যে থাকবে মোশন সেন্সর। ১২টি ক্যামেরার নজর থাকবে ম্যাচ বলে। এর মাধ্যমে বলটি অফসাইড রেখা অতিক্রম করছে কিনা, তা যাচাই করতে পারবে। এই যাচাইকরণটি সংঘটিত হবে খেলার তদারককারীদের কাছে থাকা কম্পিউটারের মধ্যে। যার সমন্বয়ে দ্রুততম সময়ে অফসাইড অ্যালার্ট পাবেন রেফারি। তাতে বাঁচবে ভিএআরে যাচাই-বাছাই করার সময়টুকু।

পরিধানযোগ্য ইলেকট্রনিক প্রযুক্তি
বিশ্বকাপ চলাকালে যে কোনো চিকিৎসা সংক্রান্ত জরুরি পরিস্থিতি এড়াতে প্রস্তুত রাখা হচ্ছে পরিধানযোগ্য কতগুলো ইলেকট্রনিক ডিভাইসের সিরিজ। স্নাগ-ফিটিং শার্টের কাপড়ে সরাসরি কম বিদ্যুতের সেন্সর থাকছে। এর মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে শার্ট পরিধানকারীর হৃদস্পন্দন, শ্বাস-প্রশ্বাস এবং হাইড্রেশন পরিমাপ করা যাবে। এই শার্টগুলোয় ব্লুটুথেরও ব্যবস্থা থাকবে, যেটি সরাসরি বেস স্টেশনের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করবে। এতে করে অত্যাবশ্যক লক্ষণগুলো রিয়েল টাইমে পর্যবেক্ষণ করা যাবে।

রোবট রেফারি
কাতার বিশ্বকাপে আরও নিখুঁতভাবে অফসাইড ধরতে ইতোমধ্যে রোবট দ্বারা পরীক্ষা চালিয়েছে ফিফা। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে কাতার বিশ্বকাপে খেলার মাঠে দেখা মিলবে এসব রোবট লাইন্সম্যানের।

গোললাইন প্রযুক্তি
গোললাইন প্রযুক্তি এবার আরও আধুনিক। এবার ব্যবহার করা হবে ১৪টি ক্যামেরা। যার মাধ্যমে বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে থ্রিডি ভিশন দেখতে পাবেন সমর্থকরা।

দেশ ঘুরে দেখার অ্যাপ
বিশ্বের জমজমাট এই উৎসবের অংশ নিতে কাতার ভ্রমণকারীদের জন্য থাকছে নাভবাডি অ্যাপ। এটি দেশ ঘুরে দেখার জন্য প্রয়োজনীয় সব তথ্য সরবরাহ করবে। স্টেডিয়ামগুলোর অবস্থানসহ হাসপাতাল, রেস্তোরাঁ, যানবাহন ইত্যাদির খোঁজ পাওয়া যাবে অ্যাপে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো দেশ এমনটা করল।

ফিফা প্লেয়ার্স অ্যাপ
এবার যোগ হচ্ছে ফিফা প্লেয়ার্স অ্যাপ। যার মাধ্যমে ম্যাচ শেষে দ্রুততম সময়ে নিজের পারফরম্যান্স জানতে পারবেন ফুটবলাররা। ফিফপ্রোর সঙ্গে যৌথভাব যা তৈরি করেছে ফিফা।

শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সাত স্টেডিয়াম
আয়োজক হওয়ার পর কাতারকে যে প্রশ্নের সবচেয়ে বেশি উত্তর দিতে হয়েছে, তা হলো মরুর বুকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ হবে তাপমাত্রা? তার জন্য বিশেষ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে কাতার। কাতার এবার ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর এবং প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত কতগুলো স্টেডিয়াম তৈরি করেছে। ড. কুল নামের এই প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে কাতার ইউনিভার্সিটি কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং। প্রায় ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের স্থিতিশীল তাপমাত্রা নিশ্চিত করার জন্য ভেন্যুগুলোতে থাকবে উন্নত শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা। এটি ভক্ত ও খেলোয়াড় উভয়কেই খেলায় দেখা এবং খেলায় অংশ নেওয়ার জন্য একটি স্বাচ্ছন্দ্যময় পরিবেশ দেবে। আটটি স্টেডিয়ামের মধ্যে ৭টিতেই এ প্রযুক্তি থাকবে।

প্রতিবন্ধীদের জন্য খেলা উপভোগের ব্যবস্থা
বোনোকল হলো বিশ্বের প্রথম ব্রেইল বিনোদন প্ল্যাটফর্ম, যেখানে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের ডিজিটাল সামগ্রী ব্যবহার করার জন্য যাবতীয় সহায়তা প্রদান করা হয়। ফোরামটি সব ডাটা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ফুটবল ভক্তদের বোঝার সহায়ক করে আপডেট দিতে থাকবে। ফলে তারা অন্য সবার মতো খেলা উপভোগ করতে পারবে।
ফিলিক্স পাম হচ্ছে হাতে পরিধানযোগ্য একটি সংবেদনশীল যোগাযোগের যন্ত্র। ফিলিক্স পাম হাতের তালুতে প্যাটার্নযুক্ত তথ্য পাঠানোর মাধ্যমে এক ধরনের স্পর্শের অনুভূতি তৈরি করে। সংক্ষেপে যার নাম হচ্ছে হ্যাপটিক প্রতিক্রিয়া; যার ফলে পরিধানকারী ব্যক্তিরা স্পর্শ বা গতি অনুভব করতে পারবেন। হ্যাপটিক প্রতিক্রিয়াগুলো হবে রিয়েল টাইম। এটি প্রতিবন্ধীদের নিখুঁতভাবে খেলা উপভোগে সাহায্য করবে। এ ছাড়া প্রতিবন্ধী তরুণদের নিরাপদ ও আরামপ্রদ স্থান দেওয়ার জন্য স্টেডিয়ামে সেন্সরি ভিউয়িং রুম স্থাপন করা হয়েছে।

কার্বন-নিউট্রাল ওয়ার্ল্ড কাপ
কাতার অঙ্গীকার করেছে, তারা প্রথম কার্বন-নিউট্রাল ওয়ার্ল্ড কাপ হোস্ট করতে যাচ্ছে। কার্বন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি এই ইভেন্টের কার্বন ফুটপ্রিন্ট মুছে ফেলতে গ্রিন প্রজেক্ট গ্রহণ করা হয়েছে। যে কোনো দুটি স্টেডিয়ামের মধ্যকার দূরত্ব ১ ঘণ্টার কম ড্রাইভিং দূরত্বের মধ্যে রাখা হয়েছে। এতে ভক্তরা একই দিনে দুটি বা তার বেশি ম্যাচ উপভোগ করতে পারবে।

ওয়াইফাই ও স্মার্ট চার্জিং স্টেশন
বিশ্বকাপের সময় পুরো কাতারকে ওয়াইফাই জোনের আওতায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে আয়োজকদের। সৌরবিদ্যুৎ চালিত এলপাম উইন্ড টারবাইন বাতাস ও সূর্য শক্তিকে সমন্বয় করবে। এই যন্ত্রের পরিষেবা হচ্ছে ভক্তদের ছায়া প্রদান করা এবং ইউএসবি চার্জিং ডক হিসেবে কাজ করা। এমনকি এটি তথ্য বহন করার জন্য স্পিকার, ওয়াইফাই, শীতলীকরণ, নজরদারি ক্যামেরা এবং লাইটের কাজ দেবে। তা ছাড়া অত্যাধুনিক প্রযুক্তি পণ্য বা সেবার বিজ্ঞাপন তো থাকছেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *