ইতিহাসের স্বাক্ষী ধানমন্ডি-৩২

ফিচার

নুজহাত তাবাসসুম:

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কাজে কিংবা একটু সময় কাটাতে ধানমন্ডি ৩২ একটিবার হলেও যায়নি এমন মানুষ খুঁজে  পাওয়াটা দুর্লভ । লেকের পাশে গাছ-গাছালিতে ঢাকা এমন শান্ত পরিবেশ প্রতিটি মানুষকেই দেশপ্রেমী করে তোলে । সারাটি বেলা বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের আনাগোনায় মুখরিত হয়ে থাকে লেকের পাশের পার্কের পরিবেশ । ছোট থেকে শুরু করে বড়-বৃদ্ধ সকলেই যায় তাদের অবসর সময়  কাটাতে । লেকের পরেই অবস্থিত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান এর বাড়ি । এই বাড়ির প্রতিটি ইটে জড়িয়ে আছে ইতিহাস, জীবনের গল্প । জড়িয়ে আছে শোকে আচ্ছন্ন ভয়ালো ভেঙ্গে যাওয়া স্বপ্ন । কিন্তু সেই ইতিহাস ,স্বপ্ন ভাঙ্গার গল্প গুলো অনেকেরই অজানা ।

১৯৬২ সালের আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন, ৭০ সালের নির্বাচন ও ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলনসহ যুদ্ধের প্রথম উত্তাল দিনগুলো ৩২ এর বাড়িটিকে ঘিরেই পরিচালিত হচ্ছিল। ৩২ এর বাড়িটিকে ঘিরেই রয়েছে বাংলাদেশ ও বাঙালির গৌরবগাঁথা । বাংলাদেশ ও বাঙালি কর্তৃক নির্মম হত্যাকাণ্ডের কলঙ্কচিহ্ন দেখতেও যেতে হবে সেখানেই। এই বাড়ি থেকেই  বঙ্গবন্ধু  স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে  তার রাষ্ট্রীয় কর্ম পরিচালনা করতেন। শেষ পর্যন্ত ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তাকে সপরিবারে এই বাড়িতেই প্রাণ দিতে হয়।

​ছায়া সুনিবিড়, সবুজ গাছে ঘেরা সাদা রঙের তিনতলা মূল বাড়ি এবং এর পাশের সম্প্রসারিত আরেকটি ভবন নিয়েই জাদুঘর। তিন তলা বাড়ির ভবনে ঢুকতে প্রথমেই চোখে পড়ে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি । মূল বাড়ির প্রথম তলার শুরুতেই রয়েছে শেখ মুজিবুর রহমানের বিশাল এক ছবি। প্রথম তলায় রয়েছে ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্টে নিহত সবার ছবি এবং কিছু আসবাবপত্র। এই ঘরটি আগে ছিল ড্রইং রুম। এখানে বসে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু দেশ-বিদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে বৈঠক করতেন। এই ঘরের পাশের ঘরটি ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের পড়ার ঘর। সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতেই দেখা যাবে বুলেটের চিহ্ন , এই সেই সিঁড়ি  যেখানে  নৃশংস ভাবে হত্যা করা হয় আমাদের জাতির পিতাকে । বঙ্গবন্ধুর মরদেহ যেখানে পড়েছিল সেই জায়গাটিকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করে রাখা হয়েছে। সিঁড়িটি চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে।দোতলায়  রয়েছে বঙ্গবন্ধুর শয়নকক্ষ।বঙ্গবন্ধুর শয়নকক্ষে তার বিছানার পাশেই ছোট টেবিলে সাজানো আছে তাঁর সবসময়ের সঙ্গী পাইপ, তামাকের কৌটা। এ কক্ষে আরো আছে টেলিফোন সেট, রেডিও। কিছু রক্তমাখা পোশাক। সামনের খাবার ঘরের পাশেই আছে শিশু রাসেলের ব্যবহার করা বাইসাইকেল। দোতালা তে  আরও রয়েছে শেখ জামালের রুম । সেখানেও আছে বুলেটের চিহ্ন, শেখ জামালের স্ত্রীর বিয়ের শাড়ীটা প্রদর্শনের জন্য রাখা আছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার কক্ষও একই তলায়।শেখ রেহানার ঘর মোটামুটি সাধারনই। কিন্তু শেখ হাসিনার ঘর রিনোভেশন  এর জন্য বন্ধ করে রাখা হয়েছে।তিন তলায় উঠে যে সুন্দর করে সাজানো রুমটি চোখে পরবে সেটি শেখ কামালের । সেই রুমে দেখা যাবে বিভিন্ন  গানবাজনার বাদ্যযন্ত্র ।
এ ভবনের মোট নয়টি কক্ষে বিভিন্ন সামগ্রীর মধ্যে আরও আছে বঙ্গবন্ধুর পুত্রবধূ সুলতানা কামালের বৌ-ভাতের সবুজ বেনারসি শাড়ি, রোজি জামালের  বিয়ের জুতা, ভাঙা কাচের চুড়ি, চুলের কাঁটা, শিশুপুত্র রাসেলের রক্তমাখা জামা, বঙ্গবন্ধুর রক্তমাখা সাদা পাঞ্জাবি, তোয়ালে, লুঙ্গি, ডায়েরি ইত্যাদি। বাড়ির রান্নাঘরের হাঁড়িগুলো বেশ পরিপাটি করে সাজানো রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ব্যবহার্য আসবাবের মধ্যে আরো আছে খাবার টেবিল, টেবিলের ওপর থালা, বাটি। আছে সোফা।

বাড়ির পেছনেই জাদুঘরের সম্প্রসারিত নতুন ভবন। এর নাম ‘শেখ লুৎফর রহমান ও শেখ সায়েরা খাতুন গ্যালারি’। বঙ্গবন্ধুর বাবা-মায়ের নামে রাখা হয়েছে নতুন ভবনের নাম। ২০১১ সালের ২০ আগস্ট এ অংশটি আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেয়া হয়। ছয় তলা ভবনের দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ তলা পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর জীবনের বিভিন্ন সময়ের আলোকচিত্র রয়েছে। পঞ্চম তলায় পাঠাগার ও গবেষণা কেন্দ্র।

নুজহাত তাবাসসুম: স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের ৬৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *