এস.কে.শাওন:
তাঁর জীবন গল্পের সবচেয়ে মজার দিকটা হলো ফুটবলটা আক্ষরিক অর্থেই তাঁর রক্তে ছিল।তাঁর পিতা বেলজিয়ামের দ্বিতীয় ডিভিশনের হয়ে ফুটবল খেলতেন। এমনকি তাঁর মাতাও পেশায় ফুটবলার ছিলেন।খেলতেন বেলজিয়াম নারী ফুটবলের প্রথম ডিভিশনে।বলছিলাম বেলজিয়ান ফরোয়ার্ড এডেন হ্যাজার্ডের কথা।ফুটবলার হওয়াটা একরকম হ্যাজার্ডের নিয়তিই ছিল একথা বললে তা মোটেই অযৌক্তিক হবে না।বড় কারণ হলো হ্যাজার্ডের মা-বাবার স্বপ্নই ছিল তাঁদের সন্তানেরা ফুটবলার হবে।সেই লালিত স্বপ্ন বাস্তব হয়ে ধরা দিয়েছে।হ্যাজার্ডরা চার ভাই ফুটবলকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

ফরাসি ক্লাব লিলের একজন স্কাউট হ্যাজার্ডের ফুটবল প্রতিভায় মুগ্ধ হন।সেজন্য মাত্র ১৪ বছর বয়সে হ্যাজার্ড ফরাসি ক্লাব লিলের ইয়ুথ ক্লাবে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান।এতো কম বয়সে বেলজিয়াম থেকে ফ্রান্সে পাড়ি জমানোর ব্যাপারে অবশ্য তাঁর বাবা-মা এরও সম্মতি ছিল।কারণ তাঁরা জানতেন ফুটবলার হিসেবে বিকশিত হতে হলে বেলজিয়ামে পরে থাকলে চলবে না।
২০০৭ সালে হ্যাজার্ডের বয়স যখন ১৬ বছর তখন লিলের সাথে তিন বছরের জন্য চুক্তিবদ্ধ হন তিনি।২০০৭-০৮ মৌসুমটা তাঁর কেটেছে বিভিন্ন দলের হয়ে খেলে।কখনো খেলেছেন লিলের অনূর্ধ্ব-১৮ দলের হয়ে,কখনো খেলেছেন রিজার্ভ দলে।আবার লিলের মূল দলেও দুটি ম্যাচ খেলেছেন।২০০৮-০৯ মৌসুমে লিলের নতুন কোচ রুডি গার্সিয়া দায়িত্ব পাওয়ার পর বেশ কিছু তরুণ খেলোয়াড়কে মূল দলে সুযোগ দেন।তাঁর মধ্যে হ্যাজার্ডও একজন।বদলি হিসেবে ফরাসি লিগ আর কাপে তিনি মাঝে মাঝে মাঠে নামার সুযোগ পেতেন।সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে এডেন তাঁর যোগ্যতার প্রমাণ দেন।ঐ মৌসুমে ফরাসি লিগে লিল ৫ম স্থান অধিকার করে।আর সেই লিগে সেরা উদীয়মান ফুটবলারের মুকুট জুটে হ্যাজার্ডের কপালে।
ফরাসি লিগে ৫ম হওয়ায় লিল ইউরোপা লিগে খেলার সুযোগ পায়।সেখানে একটি টাইয়ের প্রথম লেগে লিল হ্যাজার্ডের চোখ ধাঁধানো গোলে লিভারপুলকে ১-০ গোলো পরাস্ত করে।তখনই বহু ইউরো পরাশক্তির নজর কাড়েন হ্যাজার্ড।তাঁকে ধরে রাখতে তখন লিলের হিমশিম খেতে হয়।২০০৯-১০ মৌসুমে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ফরাসি লিগের সেরা উদীয়মান ফুটবলারের পুরস্কার জিতেন হ্যাজার্ড।
২০১১-১২ মৌসুমটি লিলের দলগত পারফরম্যান্স সন্তোষজনক না হলেও হ্যাজার্ডের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স ছিল চোখে পড়ার মতো।সেই সুবাদে বিশাল অংকের ট্রান্সফার মানি দিয়ে হ্যাজার্ডকে দলে ভিড়ায় চেলসি।স্ট্যামফোর্ড ব্রীজে হ্যাজার্ডকে মানিয়ে নিতে খুব বেশি কষ্ট হয়নি।সেই ফলশ্রুতিতে,ইংল্যান্ডে নিজের প্রথম মৌসুমে লিগ ও ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতায় ১০ গোল ও ১৪ এসিস্টে নিজের আগমনী বার্তাটা প্রকাশ করেন হ্যাজার্ড।
২০১৪-১৫ মৌসুমে হোসে মরিনহোর চেলসি লিগ জেতার পর খেলোয়াড়দের ভোটে প্রিমিয়ার লিগের সেরা ফুটবলার নির্বাচিত হন হ্যাজার্ড।তবে তাঁর দুঃসময়ের গল্পের নাম ২০১৫-১৬ মৌসুম।সেবার টানা ৩০ ম্যাচে গোল খরায় ভুগতে থাকা হ্যাজার্ডের শেষ দেখে ফেলেছিলেন ফুটবল বোদ্ধারা।কিন্তু হ্যাজার্ড যে অন্য মাপের খেলোয়াড়!তারই প্রমাণস্বরূপ ২০১৬-১৭ মৌসুমে হ্যাজার্ডের ১৬ গোল আর ৫ এসিস্ট চেলসিকে এনে দেয় প্রিমিয়ারর লিগের আরও একটি শিরোপা।
চেলসির হয়ে ৩৫২ ম্যাচে ১১০ টি গোল করেন হ্যাজার্ড,শিরোপা জিতেছেন ৬টি।সম্প্রতি চেলসির সাথে ৭ বছরের সম্পর্কের ইতি টানেন তিনি।সব জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে১০০ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে তাকে দলে ভিড়ায় রিয়াল মাদ্রিদ। লস ব্লাঙ্কোসদের ম্যানেজার জিনেদিন জিদান অনেক দিন ধরেই দলে চাচ্ছিলেন তাকে।আর হ্যাজার্ডও মুখিয়ে ছিলেন তাঁর ছোটবেলার আদর্শের অধীনে খেলার জন্য।
২৮ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড সম্ভাবনাময় তরুণ থেকে পরিণত হয়েছেন সময়ের সেরা খেলোয়াড়ে। রিয়াল মাদ্রিদের হয়েও তাঁর সাফল্যের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকুক, এটাই প্রত্যাশা হ্যাজার্ড ভক্তদের।
