’করোনাভাইরাসে ব্যাহত শিক্ষা, মানসিক চাপে শিক্ষার্থীরা’

শিক্ষা

তানভীর সিদ্দিক টিপু

আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ওয়ার্ল্ড ভিশন ‘চিলড্রেন ভয়েসেস ইন দ্য টাইম অব কোভিড-১৯’ শিরোনামে এক জরিপ প্রকাশ করেছে। তাতে বলা হয়, মহামারির সময়ে স্বাভাবিক জীবনে ছন্দপতনের জন্য সরাসরি তিনটি কারণকে উল্লেখ করেছে শিশুরা। সেগুলো হলো শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া, সামাজিক দূরত্বের কারণে মানসিক চাপ এবং পরিবারে দারিদ্র্য বেড়ে যাওয়া। শতকরা ৭১ ভাগ শিশু ও তরুণ বলেছে, স্কুল বন্ধের কারণে তারা নিজেদের বিচ্ছিন্ন ও নিঃসঙ্গ অনুভব করছে। করোনা সংক্রমণে ৯১ শতাংশ শিশু ও তরুণ মানসিক চাপ ও শঙ্কার মধ্যে রয়েছে, হতাশায় ভুগছে।

ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৯১টি দেশে স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, যা সরাসরি প্রায় ১৫০ কোটি বিলিয়ন শিক্ষার্থীর জীবনকে প্রভাবিত করেছে। বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের কারণে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে সব ধরণের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, দীর্ঘ সময় স্কুলের বাইরে থাকার কারণে অনেক শিশুর মধ্যেই আচরণগত পরিবর্তন আসতে পারে।

প্রায় একই কথা বলছিলেন স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক জোবাইদা নাসরিন। তিনি করোনা মহামারীতে উদ্ভূত পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ুয়া দুই ছেলেকে নিয়ে এক প্রকার যুদ্ধই করতে হচ্ছে তাকে। ছেলেদের অনলাইনে পড়ালেখা চলমান থাকলেও, তাদের মানসিক বিকাশ আর সামাজিক মিথস্ক্রিয়া সঠিকভাবে হচ্ছে না বলেই মনে করেন তিনি।

তিনি বলছিলেন, ‘শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই হতাশায় ভুগছে। শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের মাঝে অনেক দূরত্ব থেকে যাচ্ছে। যা কার্যত শিক্ষাকে ব্যাহত করছে। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষকরাও ঘরে বন্দী। ফলে মানসিকভাবে তারাও ভেঙে পড়ছে। কিন্তু তাদেরকেই আবার শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দেওয়ার কাজটি করতে হচ্ছে।’

ঢাকার শিশু হাসপাতালের ডেভেলপমেন্টাল পিডিয়াট্রিশিয়ান ডা. রিয়াজ মোবারক বলছেন, ‘দীর্ঘদিনের আবদ্ধ অবস্থা শিশুর সকল ধরনের বিকাশ বাধাগ্রস্ত করছে। একটা শিশু যখন হাঁটতে শেখে, কথা বলতে, দৌড়াতে শেখে, ছবি আঁকে, নাচে এইসব জিনিস শিশুর বিকাশের একটা অংশ। শিশুর সকল ধরনের বিকাশ, বুদ্ধির বিকাশ এই পরিস্থিতিতে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া শিশুর সময় কাটানোর জন্য আরেকটা শিশুর দরকার হয়। আরেকটি শিশুর সংস্পর্শে আসার সুযোগ শিশুরা সবচেয়ে বেশি পায় স্কুলে, প্রতিবেশী এবং আত্মীয়দের পরিবারে। সেই সুযোগ তার একেবারেই কমে গেছে।’

জোবাইদা নাসরিনের মতে শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তির প্রতি অনেক বেশি আসক্ত হয়ে পড়ছে। শিশুরাও এর বাইরে নয়।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ন্যাশনাল ট্রমা কাউন্সিল সেন্টারের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ইসরাত শারমিন রহমান বলেন, অনেক বাবা-মাই তাদের কাছে আসছেন যারা বলছেন যে, প্রযুক্তি আসক্তি বাড়ছে।

বেকারত্ব ও দারিদ্রের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় শিশুরা স্কুল থেকে ঝরে পরবে। শিশুশ্রম, বাল্যবিয়ে, পাচারের শিকার হবে বলে মনে করেন ইউনিসেফের শিশু সুরক্ষা কর্মকর্তা শাবনাজ জাহেরিন। তার মতে, ‘মন্দা, বেকারত্ব ও দারিদ্রের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় শিশুরা স্কুল থেকে ঝরে পরবে। শিশুশ্রম, বাল্যবিয়ে, পাচারের শিকার হবে। আমরা মনে করছি ১০ থেকে ১৮ যে বয়সটা, কিশোর বয়সে যারা আছে তারা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।’

করোনাভাইরাস মহামারির কারণে গত বছর ১৭ই মার্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এর পর দফায় দফায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছুটি বাড়ানো হয়েছে। সবশেষ শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানায় যে, আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত সব ধরণের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে।

ছবি: ঢাকা ট্রিবিউন এর সৌজন্যে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *