তানভীর সিদ্দিক টিপু:
পঞ্জিকায় সেদিন মাঘের বাইশ। শীত তখন যাবো যাবো করলেও কবে যাবে ঠিক করে উঠতে পারেনি। এরকম শীতের দিন, ঘড়িতে সকাল আটটা। ঢাকা মহানগরীর গাবতলি বাসস্ট্যান্ডে আমাদের প্রায় ৩৫ জনের একটা জমায়েত। ওখানে কর্তব্যরত একজন পুলিশ কর্মকর্তা বাস কাউন্টারে জানতে চাইলেন আমাদের উদ্দেশ্য। কাউন্টার থেকে তাকে জানানো হলো আমরা ‘পিকনিক’ করতে যাচ্ছি!
দূর থেকে সবার মধ্যে পিকনিকের আমেজ চোখে পড়লেও আসলে আমাদের উদ্দেশ্য ছিল ছবি তোলা। স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের সংগঠন ‘জেআরএন ভিজুয়ালস’ একটি ‘ফটো ওয়াক’ আয়োজন করেছিল। এতে অংশগ্রহণকারী সবাই সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষার্থী। সাথে অভিভাবক হিসেবে ছিলেন আমাদের তিন শিক্ষক। বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোশাররফ হোসেন, সামিয়া আসাদি ও তানিয়া সুলতানা।
এই আয়োজনের জন্য বেছে নেওয়া হয় বালিয়াটি জমিদার বাড়িকে। যা প্রায় দুই ‘শ বছরের ইতিহাস নিয়ে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে ঢাকা বিভাগের অন্তর্গত মানিকগঞ্জ জেলায়।
সকাল আটটার কিছু পরে আমাদের জন্য নির্ধারিত বাস মানিকগঞ্জের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। নির্ধারিত টি-শার্ট এবং সকালের নাশতা সবার মাঝে বণ্টন করা হয়। সমস্বরে গান গেয়ে, একে অপরের সাথে খুনসুটিতে সময় কেটে যায়। সকাল দশটার কিছু পরে আমরা জমিদার বাড়ির দরজায় পা রাখি। টিকিট কেটে ভিতরে প্রবেশ করার মুহূর্ত থেকেই শুরু হয়ে যায় ছবি তোলার প্রতিযোগিতা। আমরা তো ছবি তুলতেই এসেছি!
ভিতরে প্রবেশ করেই সবাই মিলে ‘গ্রুপ’ ছবি তোলা হয়। তারপর শিক্ষার্থীদেরকে তিনটি দলে ভাগ করা হয়। তিনজন প্রশিক্ষকের অধীনে তিনটি দল ছড়িয়ে পরে পুরো জমিদারবাড়ি জুড়ে। বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী এইচ এস সাকিব, শরীফ সৌরভ ও ইয়ামিন মজুমদার ফটোওয়াকের প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। তারা শিক্ষার্থীদের বালিয়াটি জমিদার বাড়ির বিভিন্ন স্থানে ছবি তুলতে সহায়তা করেন।
একদলের সদস্যদের দেখা যায় ছবি তোলায় ব্যস্ত, তো অন্যদল ভিডিও করে ধারণ করে রাখছে। কাজের ফাঁকে একে অপরের ছবি তুলে দিতে কিংবা নিজের ছবি তুলিয়ে নিতেও একটুও কার্পণ্য করেনি কেউ।
পুরো জমিদার চত্বরটি উঁচু প্রাচীরে ঘেরা। ঐতিহ্যবাহী প্রাসাদটির ২০০ কক্ষের প্রতিটি কক্ষেই রয়েছে প্রাচীন শিল্পের সুনিপুণ কারুকাজ। প্রাসাদ চত্বরটি প্রায় ১৬ হাজার ৫৫৪ বর্গমিটার জমির ওপর ছড়িয়ে থাকা সাতটি দালানের সমাবেশ। প্রতিটি দালানই ঊনবিংশ শতকে নির্মিত। এই দালানগুলো খ্রিষ্টীয় মধ্য ঊনবিংশ শতক থেকে বিংশ শতকের প্রথমভাগের বিভিন্ন সময়ে জমিদার পরিবারের কয়েকজন সদস্যের দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। আমরা ঘুরে ঘুরে এই নিদর্শনটির সৌন্দর্য উপভোগ করেছি। পাশাপাশি এই চুনসুরকি খসে পড়া বাড়িগুলোকে ক্যামেরার ফ্ল্যাশে বারবার ঝলসে দিচ্ছিল কেউ কেউ।
বেলা দুইটা পর্যন্ত চলে আমাদের ছবি তোলার পর্ব। এরপর বাসে চেপে স্থানীয় একটি হোটেলে দলবেঁধে দুপুরের খাবার খাওয়া হয় সবার। ক্লান্ত শ্রান্ত দেহে বাড়ি ফেরার পালা এবার। তবে কিছুদূর যেতেই একটা ইটের ভাঁটা চোখে পড়ে। চোখের তারায় লেপটে থাকা ঘুমের পেঁজা তুলোর মেঘ সরিয়ে সবাই নেমে পড়ে ছবি তুলতে। দু-একজন অবশ্য ঘুমকেই সঙ্গী করে বাসে বসে থাকে। সেই ঘুম ভাঙে আসাদ গেটে এসে। ভাঙে কোলাহলও।
প্রবেশ মূল্যঃ
বালিয়াটি জমিদার বাড়িতে জনপ্রতি ২০ টাকা প্রবেশ মূল্য প্রদান করতে হয়। বিদেশী নাগরিকদের জন্য তা ২০০ টাকা।
যেভাবে যাবেনঃ
ঢাকার গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে আরিচা বা মানিকগঞ্জগামী যে সব বাস সাটুরিয়া হয়ে যায় সেইসব বাসে করে যেতে পারবেন। ভালো হয় গাবতলী থেকে সাটুরিয়া গামী এস বি লিংক অথবা সেলফি পরিবহনে গেলে। সাটুরিয়া পার হয়ে সাটুরিয়ার জিরো পয়েন্টে নেমে যেতে হবে। বাসের সুপারভাইজারকে বালিয়াটি জমিদার বাড়ির কথা বললেই নামিয়ে দিবে। জিরো পয়েন্ট থেকে জমিদার বাড়ির দূরত্ব ১ কিলোমিটার। ইজিবাইক বা সিএনজি দিয়ে ২০-৩০ টাকা ভাড়া দিয়েই যেতে পারবেন বালিয়াটি প্যালেসে।
