তানিয়া সুলতানা:
এক সময় মানুষের মূল কাজ ছিল টিকে থাকা। সে যুগে পুরুষ নয় নারীরা ছিল পরিবারের প্রধান। পরিবারের প্রধান হিসেবে তাদের মূল দায়িত্ব ছিল গোটা পরিবারের খাবারের যোগান দেয়া। বন-বাদার থেকে ফল-মূল, শাকা- সবজী সংগ্রহ করত মেয়েরাই। তারাই প্রথম শিখল কোন ধরনের লতা-পাতা আর ফল-মূলে কি গুণাগুণ রয়েছে। উচ্ছিষ্ট খাবার আর ফলমূলের আঁটি থেকে মেয়েরা তাদের বসবাসের আঙিনায় শুরু করল কৃষিকাজ। তখনো লাঙল আবিষ্কার হয়নি। এসময় ছেলেদের বড় কাজ ছিল শিকার। এযুগের মতন তখনো শিকার ততটা সহজ ছিল না। প্রায়ই তাদেরকে খালি হাতে ফিরতে হত। আরেকটি সমস্যা হল শিকারের মাংস পচনশীলও বটে। অর্থ্যাৎ সে যুগে মানুষ ছিল প্রকৃতির এক ক্ষুদ্রতম অংশমাত্র। সে প্রকৃতিকে আজকের মত করে নিয়ন্ত্রণ করত না। কিন্তু চিত্রটা বদলে গেল লাঙল আবিষ্কারের পর। ছেলেরা লাঙল চালানোর সুবাদে কৃষির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিল (চট্টোপাধ্যায়: ২০০৯)। ঘরের আঙিনা থেকে কৃষি সম্প্রসারিত হলো। বন কাটা শুরু হলো। মানুষ আর প্রকৃতির অংশ থাকল না। নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিল। সম্পত্তি আর পুঁজির ধারণা তৈরি হলো, তৈরি হলো কৃষক সামন্ত আর বাকীরা পরিণত হলো তার প্রজায়। তাই বলা হয় পুঁজিবাদ আর পুরুষতন্ত্র এদুটি হাত ধরাধরি করে হাটে। আর এর ফলে সবচে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয় নারী আর প্রকৃতি। আদর্শগত জায়গা থেকে পুরুষের সাথে তাদের অধস্তন সম্পর্ক তৈরি হতে থাকে।
আমরা যদি গোটা বিশ্বের দিকে তাকাই, দেখব, আজকের এই উন্নয়ন এক পাক্ষিক। আর তার পেছনে রয়েছে বলপ্রয়োগ, উপনিবেশ আর হঠকারিতার ইতিহাস। তাতে উন্নত বিশ্ব লাভবান হলেও ক্ষতির মাশুল গুনতে হয়েছে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে। উন্নত বিশ্বের ব্যাপক প্রাযৈক্তিক উৎকর্ষের ফলাফল আজকের এই জলবায়ু পরিবর্তন। যার মাশুল গুনছে মূলত তৃতীয় বিশ্ব, বিশেষত নারী। বলা হয় যেকোন জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে একজন নারী পুরুষের তুলনায় ১৪ গুণ বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হন (কোল্টন: ২০১৫)। ধরুন যেকোন জলবায়ু পরিবর্তনে খাদ্যের অভাব দেখা দিলে, পুরুষেরা চাইলেই অতি সহজে মাইগ্রেট করতে পারে। কিন্ত নারীকে গোটা পরিবার নিয়ে পুরো পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে হয়। কিংবা ইকোফেমিনিস্টদের মতে উন্নয়নের রাজনীতিতে পুরুষতন্ত্রের (পুরুষের নয়) নিপাত ঘটাতে হবে। প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হয় এমন কোনো স্থাপনা, কল-কারখানা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা যাবে না। আর উন্নয়নকে হতে হবে পৃথিবী রক্ষার স্বার্থে। যা কিছু প্রকৃতির বিরুদ্ধে যায় তা কখানোই টেকসই উন্নয়ন নয়। মানুষ যত বেশি প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণে নিতে চাইছে প্রকৃতি ততটাই নির্দয় হয়ে উঠতে বাধ্য হচ্ছে। আর তার কুফল ভোগ করছে আবার নারীরাই। যেমন জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে খাবার পানির অভার চূড়ান্ত হচ্ছে। এর ফলে পরিবারের জন্য পানি সংগ্রহ করা হয়ে উঠছে দুঃসাধ্য। ফলে নারী শিশুদের স্কুলে যাবার পরিবর্তে পানি সংগ্রহ হয়ে উঠছে মূল কাজ (গেইলিং: ২০১৫)।
কেবল দূর-দুরান্ত থেকে পানি সংগ্রহ নয় বাস্তবতা হলো এখনো পর্যন্ত পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশে নারীকেই কৃষিকাজের বেশিরভাগটা সামলাতে হয়। এখনো ঘরের আঙিনায় তাকে শাক-সবজী চাষ করতে হয়। গবাদি পশুর খাবার এবং পানি সংগ্রহের ভারও তার ওপর। পার্থক্য কেবল এই যে, আগে তারা পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভেতর দিয়ে না গিয়ে, প্রকৃতিকে জেনে. বুঝে তার একটি অংশ হিসেবে কাজগুলো করত। আর এখন সে একজন পুরুষ কৃষকের কণ্যা বা স্ত্রী হিসেবে করছে। কৃষক বা জেলে হিসেবে নারীকে কখনোই পরিচয় দেবার সংস্কৃতি তৈরি তো হয়ইনি। উল্টো সেটাকে রাখঢাক করার চেষ্টা চলছে। ফসলের মাঠে নারী ক্রমশ বিলীন হয়ে পড়ছে। বাংলাদেশে কৃষিকাজে নারীর শ্রম এবং মেধাকে মূল্যায়ণ না করার পেছনের রাজনীতি জমির মালিকানাও বটে। একারনেই এখন সম্পদের অংশীদার হিসেবে নারীর কথা আবার নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। বলা হচ্ছে সম্পত্তিতে নারীর অধিকার এবং ক্ষমতায়ণ নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের মতন সমস্যার অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত এই জনগোষ্ঠীর সহায়তা করা সম্ভব।
তথ্যসূত্র:
- চট্টোপাধ্যায়, দেবীপ্রসাদ (২০০৯), মাতৃতান্ত্রিক সমাজ: সে- যুগে মায়েরা বড়ো, নালন্দা:ঢাকা।
- কোল্টন, আলেক্সান্দ্রা (২০১৫), ‘এ ফেমিনিস্ট অ্যাপ্রোচ টু ক্লাইমেট চেঞ্জ’, বিরদিhttp://birdeemag.com/a-feminist-approach-to-climate-change/
- গেইলিং, নাতাশা (২০১৫), ‘হুয়াই ক্লাইমেট চেঞ্জ ইজ এ ফেমিনিস্ট ইস্যু’, ক্লাইমেট প্রগ্রেসhttp://thinkprogress.org/climate/2015/06/24/3672960/climate-change-womens-rights-united-nations/
তানিয়া সুলতানা: স্টামফেোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমে অধ্যয়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক।