বই পর্যালোচনা: মোনাজাতউদ্দিনের “পথ থেকে পথে”

শিল্প-সাহিত্য

আবু রায়হান মুজাহিদ:

সাংবাদিকতার জগতে একটি স্মরণীয় নাম মোনাজাতউদ্দিন। যার পরিচয় ‘চারণ সাংবাদিক’ হিসেবে। তিনি ছিলেন তৃণমূল মানুষের সংবাদ কর্মী। গ্রাম-গঞ্জের পথ থেকে পথে ঘুরে ঘুরে এই তথ্যানুসন্ধানী সংবাদকর্মী তাঁর সাংবাদিক জীবনে নানা মাত্রিকতার রিপোর্ট করেছেন। খবরের অন্তরালে যে সব খবর লুকিয়ে থাকে সেই সব তথ্যানুসন্ধান এবং রিপোর্টিংয়ের মাধ্যমে তিনি দেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে নতুন মাত্রা যোগ করেছিলেন। গ্রামিণ সাংবাদিকতার মধ্য দিয়েই তিনি সুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন দেশে ও বিদেশে।পাশাপাশি লিখেছেন জীবনের অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ নানা ঘটনা।মোনাজাতউদ্দিনের মৃত্যুর আগে ৯টি ও পরে ২টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর বইগুলোর মধ্যে ‘পথ থেকে পথে’ অন্যতম। প্রচলিত ধারার গল্প এবং উপন্যাস থেকে একটি ব্যতিক্রম ধর্মী বই এটি।  বইটির মাঝে বেশ কয়েকটি বাস্তব কাহিনী সংবলিত জীবনের গল্প রয়েছে।

মোনাজাতউদ্দিন পথ থেকে পথে হেটে বেড়াচ্ছিলেন, তার চলার পথ বর্ণনাতীত, তিনি রাজপথে হাটেননি, হেটেছিলেন জনপথে কখনও বা মেঠোপথে । সংগ্রহ করেছেন মাটির মানুষ, মাঠের মানুষ, সংগ্রামী মানুষদের গল্প। বইটির প্রতিটি গল্প’ই সেই মানুষগুলোর গল্প। তিনি তুলে ধরেছেন সংগ্রামী মানুষদের। গল্পগুলো সংগ্রহ করার জন্য পাড়ি দিতে হয়েছে তাকে কন্টকাকীর্ণ বহুপথ। একজন সাংবাদিক হিসেবে ভবিষৎ প্রজম্মের সাংবাদিকদের  তিনি বার্তা দিয়েছেন বইটির মাঝে  কীভাবে দেশ ও দেশের মানুষের পাশে দাড়ানো যায়। বইটির প্রায় প্রতিটি গল্পেই  একটা বার্তা বারবার দেওয়া হয়েছে  যে, সংবাদের প্রতিটি প্রতিবেদন’ই বস্তুনিষ্ঠ হতে চাই, বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদন’ই পারবে সমাজ পরিবর্তনে ভুমিকা রাখতে।

বইটিতে আছে বিভিন্ন প্রান্তের বিভিন্ন সংস্কৃতি এবং বিভিন্ন মানুষ জনের গল্প… খেটে খাওয়া মানুষের গল্প, অনাহারে ভোগা মানুষদের গল্প, রাজনৈতিক ব্যাক্তিবর্গের গল্প, দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষদের গল্প । বইটিতে থাকা কিছু কথা এখনো বারবার  কানে বাজে…

” আর আমি, অসম সমাজের আমি, সম্পদের সুষম বন্টনহীন সমাজের আমি, জ্যান্ত মানুষের দুর্গতি-দুর্ভাগ্য পন্য করে খাই। এবং এই কাজটি করি কৌশলে, সবার চোখের আড়ালে, ফর্সা কাপড়ে দেহ ঢেকে। আমার মেকআপ খুব কড়া। ধরা যায় না”।

মোনাজাতউদ্দিন কটাক্ষ করছিলেন তার নিজেকে আর তার মতো সচেতন মানুষদেরকে যারা নির্বিকার আর নিস্পৃহ থাকে সকল অন্যায়, অবিচার আর দুর্দশার প্রত্যক্ষ করে। পথ-রাস্তা-সড়ক বলতে যা বুঝায় আমাদের সামনে তা নেই, যতদূর চোখ যায় শুধু বালুচর।  ভরাট – প্রায় এবং শুকিয়ে ব্রহ্মপুত্রের চরের ওপর দিয়ে হেটে চলছি আমরা দুজন । আমি আর রিভু নামের এক তরুণ। আমরা কেবল’ই চার-পাঁচ মাইল হেঁটে এসেছি,  সামনে আরো দশ বারো মাইল।  যাব আমরা মনতলা গ্রামে।  ব্রহ্মপুত্র- পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর কিছু কিছু   তথ্য সংগ্রহ করব  প্রধানত আমরা দেখতে চাই,  কুড়িগ্রামের মতো একটি অবহেলিত জেলার অভাবী চিলমারি সদর থেকে পনেরো ষোলো  মাইল দূরের একটি গ্রাম-জনপদে তথ্যশূন্যতার ব্যাপরটি কি রকম। যেখানে পৌঁছায়নি বিদ্যুৎ-সুবিধা, এবং টেলিভিশন ও চলে না।

প্রতিটি গল্পেই এমন অনুসন্ধানের গন্ধ, অনুসন্ধান করতো গিয়ে বেরিয়ে আসে মানবিক লোমহর্ষক কিছু তথ্যসহ জানা – অজনা বহু তথ্য । তথ্যগুলো জানতে হলে পড়তে হবে বইটি । বইটির মধ্যে থাকা গল্প গুলোর মাঝে কিছু গল্প আছে খুবই ইন্টারেস্টিং এবং কিছু গল্প আবার বিরক্তিকরও। সব মিলিয়ে বইটি সম্পর্কে জানতে হলে পড়তে হবে বইটি, তাছাড়া ব্যতিক্রমধর্মী একটি বই হওয়ায় এবং জনসাধারণের সংগ্রামময় গল্প হওয়ায় অনুভব করার মতো একটি বই। বইটি নিঃসন্দেহে ভালো। শব্দ বানানে কিছু ভুল রয়েছে আর কিছু ক্ষেত্র আঞ্চলিকতার টান রয়েছে। কিন্তু বিশেষ করে ভাষার কারুকার্য কোনো ভাবেই উপেক্ষা করার মতো নয়। কিছু কিছু অংশের শব্দচয়ন এবং বাক্য চয়ন বইটির সৌন্দর্যতা আরো বৃদ্ধি করেছে  ।  যার কারনে ছোট-খাট ভুলগুলো এড়িয়ে যাবার মতো।

কুমিল্লা জেনারেল হাসপাতালে নামক গল্পে ইত্তেফাকের সাংবাদিক  গোলাম মোস্তফা চৌধুরী প্রহৃত হওয়ার রহস্য এবং হাসপাতালের যতসব অনিয়ম নিয়ে রিপোর্ট করতে গিয়ে সেজেছেন  রোগী সাজে,  পরবর্তীতে উদ্ধার করেছেন সেই রহস্যগুলো এবং ছাপিয়েছেন  সংবাদের পাতায়।বইটির অধিকাংশ গল্পই  মোনাজাতউদ্দীন এর  সংবাদ সংগ্রহের গল্প যদিও তাতে একঘেয়েমিতা প্রকাশ পেয়েছে  তবুও গল্পগুলো বিভিন্ন টাইপের হওয়ায় বলা যায় না যে একঘেয়েমি প্রকাশ পাওয়ার কথা।

বইয়ের গল্পগুলো বাস্তবতা ঘিরে এবং গল্পগুলো অনুভব করার মতোও। একজন পাঠক হয়ে আমার মতে মোনাজাতউদ্দিন এর “পথ থেকে পথে”  বইটি অবর্ণনীয়।  এবং অসাধারণ।  বইয়ের প্রতিটি গল্প’ই ইন্টারেস্টিং ছিলো এবং রহস্যময়। এক-একটি গল্প পড়াশুরু করলে গল্পের প্রতি আগ্রহ বেড়ে যায় পুরা গল্পটি শেষ করার। বিরক্তিবোধ না আসাটাই স্বাভাবিক। প্রতিটি গল্পেই তিনি মূলত বার্তা পাঠিয়েছেন প্রতিটি সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে, তিনি শিখিয়েছিলেন কি ভাবে  সত্য এবং বস্তু নির্ভর  সংবাদ কিভাবে সংগ্রহ করতে হয়।

বইটিতে  মুলত লেখক মোনাজাতউদ্দীন শেয়ার করেছেন তার সংবাদ সংগ্রহের  গল্পগুলো,  এবং কতটা কন্টকাকীর্ণ পথ অতিক্রম করেছেন সেই গল্পগুলো।  বইয়ের মাধ্যমে তিনি উৎসাহ দিয়েছেন পরবর্তী প্রজম্মের সাংবাদিকদের কিভাবে দেশও জনপদের পাশে দাড়াতে হবে,  এবং বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ জনপদের মাঝে পৌঁছাতে হবে। জামালপুরে ইজ্জত আলীর অনুসন্ধান করতে গিয়ে পাওয়া তথ্যে  নিউজ করে দূর্ভিক্ষ লাঘবে  ভুমিকা রেখেছিলেন। তার নিউজের উপরে ভিত্তি করে পৌঁছানো হয়েছে সেখানে খাদ্য দ্রব্য।

এভাবে প্রতিটি গল্পেই তিনি নিপিড়ীত মানুষের পাশে দাড়ানোর বার্তা পৌঁছিয়েছেন।  সবমিলিয়ে  বইটি একটি অসাধারণ বই,  এবং  তরুণ সাংবাদিকদের অনুপ্রেরণা মূলক একটি বই।

আবু রায়হান মুজাহিদ: স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের ৬৫তম ব্যাচের শিক্ষার্থী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *