মুভি রিভিউ: আমেরিকান নিম্নবর্গীয়ের মাছিহা যখন ‘জোকার’

বিনোদন

তানিয়া সুলতানা:

ছবিটিকে ক্রিস্টোফার নোলানের দ্য ডার্ক নাইটের প্রিকুয়েল বলা যেতে পারে। যদিও পরিচালক ভিন্ন। দ্য ডার্ক নাইটে জোকার ব্যাটম্যানের চেয়েও জনপ্রিয়তা পায়, হিথ লেজারের মৃত্যুও এই আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার অন্যতম কারন। টড ফিলিপসের জোকারের জন্য লাখ লাখ তরুণের তাই এত অপেক্ষা।

নোলানের জোকার আর ফিলিপসের জোকার এক নয়। হিথকে আমরা দেখেছি প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী চতুর ভিলেইনের ভূমিকায় আর জ্যাকের চরিত্র হল অন্তর্মুখী, লাজুক এক ‘ওয়ানা বি’ কমেডিয়ানের– তাই যেন কতকটা নার্ভাস, গল্পের প্রটাগোনিস্টও সে। হুয়াই সো সিরিয়াস স্টাইলে হিথের তুলনাহীন শ্রাগ আর জ্যাকের উচ্চগ্রামের হাসিকান্নার নিয়ন্ত্রণহীনতার অদ্ভুতুড়ে অভিব্যক্তি — কোনটার সাথে আসলে কোনটার তুলনা চলে না। ফিলিপস গোথাম সিটির সাথে যেভাবে এর সিটিজেন জোকারকে সম্পৃক্ত করেছেন সেই কায়দা এক কথায় অভিনব। শহরের গলি ঘুলজি আর ফুটপাতের মতই হতশ্রী আর দরিদ্র আর্থার ফ্লেক। শহরতলী আর মেট্রো বাসের দেয়ালে দেয়ালে আকা গ্রাফিতি যেন আরথারের অব্যক্ততাকে জাহির করে চলেছে। আবার আরথারের অপারগতায় যেন গোটা শহর শীত বৃষ্টিতে ভিজে চলে।

এই শহর আরথার ফ্লেককে– যে কিনা সারাজীবনই একজন কমেডিয়ান হতে চেয়েছিল–জোকারে পরিণত করে। গোথাম সিটি এই শতকের দুই বিশ্বযুদ্ধ আর ভিয়েতনাম যুদ্ধের সাক্ষী। এর দিকে তাকালে সমাজের দুই জাতের মানুষের মধ্যে বিরাজমান দূরত্বকে অনতিক্রম্য মনে হয়। এর এক প্রান্তে জোকার আর প্রান্তে নগরপিতা থমাস ওয়েন।

থমাস ওয়েন ধনী প্রভাবশালী , কী নেই তার অন্যদিকে আরথারের কী আছে সেটা বলাই শ্রেয়–দুমড়ানো মুচড়ানো এক শরীর, তার থেকেও পোড় খাওয়া মন আর নারসিস্টিক মা আর রয়েছে এক বুক স্বপ্ন কমেডিয়ান হবার। আরথার তাই প্যারা সোশাল রিলেশন আর ফ্যান্টাসিতে বুদ হয়ে থাকে কমেডিয়ান টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব মারির সাথে। কিন্তু ক্রমেই সে বুঝতে শুরু করে কমেডি ব্যক্তিসাপেক্ষ। আরথারের কাছে যেটা নিমর্মতা অন্যের কাছে সেটাই হাসির খোরাকমাত্র। যে পিটুইটারি গ্ল্যান্ড দিয়ে মানুষ হাসে, আবার সেখান দিয়েই কাদে মানুষ। পোলাপান তাই জোকারকে পিটিয়ে আনন্দ পায়, কিংবা শিক্ষিত ভদ্র সমজের মাতাল দল নারীকে উত্যক্ত করে মজা পায়। মেট্রোতে তিন এলিট যুবককে হত্যা করে আলোচনায় আসে সে। সারাজীবন সে যেটা চেয়েছিল। এই হল আরথারের জোকারে পরিণত হবার নেপথ্য আলাপ।

এই হত্যার পর গোথামের মানুষ যেন জেগে ওঠে। নৈরাজ্যে গোটা শহর অচল হয়ে পড়ে। তবে কোন সিস্টেমেটিক আন্দোলন দেখা যায় না। জোকারই যেন মাছিহা, সে পূজনীয় হয়ে ওঠে সবার কাছে। এভাবে গণতান্ত্রিক একটা আন্দোলনের সম্ভাবনাকে এড়িয়ে যায় ছবিটি। এছাড়াও নিম্নবর্গ থেকে উঠে আসা আরথার সাইকোপ্যাথ ভিলেইন আর মেয়রের সন্তানকে সুশীল ব্যাটম্যান হিসেবে দেখানোর রাজনীতির পক্ষপাতও সাধারণ জনগণের কাতারে যায় না শেষ পর্যন্ত

তবে এর ঠাসবুনন গল্প , নিখুঁত দৃশ্যায়ন এবং শব্দ সংযোজন মুহূর্তগুলোকে করেছে গভীর। এই গভীরতা যেন অতলকে হাতরে ফেরে বারবার। সেইসাথে থ্রিলার ঘরানার ছবিটিতে সহিংস দৃশ্যে ব্ল্যাক কমেডির ব্যবহারও ছিল অনবদ্য।

তানিয়া সুলতানা: স্টামফেোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমে অধ্যয়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *