তানভীর সিদ্দিক টিপু
১৯৬৯ সালে নারায়ণ ঘোষ মিতা পরিচালিত ‘কখগঘঙ’ সিনেমার শুটিং হয়েছিল চুয়াডাঙ্গায়। সিনেমায় মূল চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন সারাহ বেগম কবরী, রাজ্জাক, আনোয়ার হোসেন প্রমুখ। সুরস্রষ্টা আলতাফ মাহমুদেরও উপস্থিতি ছিল এই ছবিতে।
সিনেমাটির সহকারী চিত্রগ্রাহক ছিলেন মোরশেদ আহমেদ। কাহিনীর প্রয়োজনে সিনেমাটির বড় একটি অংশ শুটিং হয়েছিল মোরশেদ আহমেদের চুয়াডাঙ্গা শহরের বাড়িতে। এই বাড়িতে এক মাস থেকে ছবির কাজ শেষ করেন অভিনেতা-অভিনেত্রীরা। বাড়ির সামনের রাস্তাটিই পরে ‘কবরী রোড’ নাম পেয়ে যায় মানুষের মুখে মুখে। তবে ৪৭ বছর ধরে ‘কবরী রোড’ নামের কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ছিল না। কবরী বলেছিলেন, তিনি এই সড়ক দেখতে একবার চুয়াডাঙ্গায় যেতে চান।
এর ঠিক ছয় বছর আগে মাত্র ১৩ বছর বয়সে নৃত্যশিল্পী হিসেবে প্রথমবার মঞ্চে উঠেছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের ‘মিষ্টি মেয়ে’। তারপর টেলিভিশন ও সবশেষে সিনেমায়। সুভাষ দত্তের পরিচালনায় ‘সুতরাং’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে ১৯৬৪ সালে কবরীর চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে। ১৯৭৩ সালে ঋত্বিক ঘটক পরিচালিত ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ছবিতে অভিনয় করেন কবরী। ১৯৭৫ সালে নায়ক ফারুকের সঙ্গে ‘সুজন সখী’ সিনেমা ছাড়িয়ে যায় আগের সব জনপ্রিয়তাকে। একে একে তিনশোর বেশি ছবিতে অভিনয় করেন তিনি। অর্জন করেছেন একটি অভিনয় ও আজীবন সম্মাননাসহ দুটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, ছয়টি বাচসাস পুরস্কার এবং মেরিল-প্রথম আলো আজীবন সম্মাননা পুরস্কার।
একটা সময় রাজনীতির অঙ্গনেও পা রাখেন চলচ্চিত্রের এই জনপ্রিয় নায়িকা। ২০০৮ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতিবিদ হিসেবে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। তবে, এতকিছুর পরও জীবন সায়াহ্নে ভুগেছেন একাকীত্বের কণ্টকাঘাতে। ২০১৯ সালে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “আমার একটা দুঃখ রয়ে গেল, জীবনে আমি একজন ভালো বন্ধু পেলাম না, ভালো স্বামী পেলাম না। সন্তানেরা অনেকটা যার যার মতো করে আছে। কিন্তু সঙ্গ দেওয়ার মতো একজন ভালো মানুষ আমি পাইনি, যাকে বলতে পারি, এসো, এক কাপ চা খাই, একটু গল্প করি। এটাই হয়তো মানুষের জীবন। তবে মানুষের চাওয়ার তো শেষ নেই। মনে হয়, যদি আমার একজন বন্ধু থাকত, তাহলে যখন-তখন তার সঙ্গ পেতাম। এই আনন্দটুকু আমি পাইনি।
কখনও ব্যস্ততা আবার কখনও নিঃসঙ্গতায় ভরা জীবনে হয়তো ভুলেই গেছিলেন চুয়াডাঙ্গার সেই সড়কের কথা! অথবা করে করেও আর সেখানে যাওয়া হয়ে উঠেনি! যদিও এরই মধ্যে ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে চুয়াডাঙ্গা পৌরসভা কবরী রোডকে প্রশাসনিক স্বীকৃতি দিয়েছিল।

করোনায় আক্রান্ত হয়ে ১৩ দিনের মাথায় গত শুক্রবার (১৬ এপ্রিল) রাতে ঢাকার শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি। কে জানে, হয়তো একাকীত্বকে সঙ্গী করে চলে যাওয়া কবরীর জন্য ‘বন্ধুত্ব’ নিয়ে অপেক্ষা করবে ‘কবরী রোড’।
তথ্য ও ছবি: বিবিসি, প্রথম আলো, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডট কম
