বুধবার বিকেলে প্রয়াত কবি শঙ্খ ঘোষের দেহ নিয়ে যাওয়া হয় নিমতলায়। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া শুরুর আগে কবির ভাই নিত্যপ্রিয় ঘোষের সল্টলেকের বাড়িতে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয়। তার পর সেখান থেকেই নিমতলায় উদ্দেশে রওনা দেয় কবির দেহবাহী গাড়ি। খবর আনন্দআজারের।
আজ সকাল সাড়ে ১১টা নাগাদ কলকাতায় নিজের বাড়িতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন কবি। বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর। বেশ কয়েক দিন ধরেই করোনায় আক্রান্ত হয়ে বাড়িতেই নিভৃতবাসে ছিলেন তিনি। পাশাপাশি, বার্ধক্যজনিত কারণেও শারীরিক ভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। মঙ্গলবার রাত থেকেই তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে। আজ (বুধবার) সকালে কবিকে ভেন্টিলেটরে দেওয়া হলেও চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। প্রয়াত হন কবি। সেই সঙ্গে বাংলা সাহিত্যের একটা অধ্যায়ের অবসান হলো।
বুধবার দুপুরে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় কবির শেষকৃত্য করা হবে বলে আগেই ঘোষণা করেছিল ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সরকার। তবে কবির শেষবিদায়ের সময় তোপধ্বনি করা হবে না বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কবির প্রতি শোকজ্ঞাপন করে মুখ্যমন্ত্রী আরও জানিয়েছেন, পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদার কবিকে শেষ সম্মান জানানো হলেও ‘গান স্যালুট’ বাদ রাখা হবে। কারণ, তোপধ্বনি পছন্দ করতেন না কবি। পাশাপাশি, কবির পরিবারের ইচ্ছানুযায়ী আড়ম্বরহীন ভাবেই তাঁকে শেষ সম্মান জানানো হবে বলেও জানিয়েছে রাজ্য প্রশাসন।
শঙ্খ ঘোষের আসল নাম চিত্তপ্রিয় ঘোষ। তার বাবা মণীন্দ্রকুমার ঘোষ এবং মা অমলা ঘোষ। ১৯৩২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের বর্তমান চাঁদপুর জেলায় তাঁর জন্ম। বংশানুক্রমিকভাবে পৈতৃক বাড়ি বরিশালের বানারীপাড়ায়। তবে শঙ্খ ঘোষ বড় হয়েছেন পাবনায়। বাবার কর্মস্থল হওয়ায় তিনি বেশ কয়েক বছর পাবনায় অবস্থান করেন এবং সেখানকার চন্দ্রপ্রভা বিদ্যাপীঠ থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। ১৯৫১ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলায় স্নাতক এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।
কর্মজীবনে শঙ্খ ঘোষ যাদবপুর ও বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। ১৯৯২ সালে তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে নানা ভূমিকায় দেখা গেছে কবিকে। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশ্বভারতীর মতো প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনাও করেছেন।
বাংলা কবিতার জগতে শঙ্খ ঘোষের অবদান অপরিসীম। ‘দিনগুলি রাতগুলি’, ‘বাবরের প্রার্থনা’, ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’, ‘গান্ধর্ব কবিতাগুচ্ছ’ তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। রবীন্দ্রবিশেষজ্ঞ হিসেবেও তাঁর নামডাক ছিল। ‘ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ’ তাঁর উল্লেখযোগ্য গবেষণা গ্রন্থ। ‘শব্দ আর সত্য’, ‘উর্বশীর হাসি’, ‘এখন সব অলীক’ উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধগ্রন্থ। তাঁর লেখা ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’, ‘গান্ধর্ব কবিতাগুচ্ছ’, ‘জন্মদিনে’, ‘আড়ালে’, ‘সবিনয়ে নিবেদন’, ‘দিনগুলি রাতগুলি’, ‘বাবরের প্রার্থনা’ বছরের পর বছর দুই বাংলায় চর্চিত, জনপ্রিয়।
২০১৯ সালে প্রথমা প্রকাশন থেকে রের হয় ‘সন্ধ্যানদীর জলে: বাংলাদেশ’। ‘সন্ধ্যানদীর জলে’ বইটি মূলত বাংলাদেশ প্রসঙ্গেই নানান সময়ে লেখা তাঁর স্মৃতিকথা, ভ্রমণপঞ্জি ও অন্তরঙ্গ বিশ্লেষণময় লেখাগুচ্ছের সংকলন। ‘একুশে, একাত্তর ও নববর্ষ’, ‘ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান’, ‘গানের ভিতর দিয়ে’, ‘শিক্ষা আন্দোলন’ ও ‘স্মৃতি, ভ্রমণ’—এই পাঁচটি পর্বে বিভক্ত হয়েছে বইটি।
দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে একাধিক সম্মানে সম্মানিত হয়েছেন শঙ্খ ঘোষ। ১৯৭৭ সালে ‘বাবরের প্রার্থনা’ কাব্যগ্রন্থটির জন্য তিনি দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার পান। ১৯৯৯ সালে কন্নড় ভাষা থেকে বাংলায় ‘রক্তকল্যাণ’ নাটকটি অনুবাদ করেও সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার পান তিনি। এ ছাড়া রবীন্দ্র পুরস্কার, সরস্বতী সম্মান, জ্ঞানপীঠ পুরস্কার পেয়েছেন। ১৯৯৯ সালে বিশ্বভারতীর দ্বারা দেশিকোত্তম সম্মানে এবং ২০১১ সালে ভারত সরকারের পদ্মভূষণ সম্মানে সম্মানিত হন শঙ্খ ঘোষ।
