রিদিতা সাহা-
দুপুর গড়িয়ে ঘড়ির কাঁটায় তখন বিকাল ৩টা। রমনা পার্কের ভিতরে নানা শ্রেণি পেশার মানুষের ব্যস্ততা। কেউ হাঁটছেন প্রিয়জনের সাথে, আবার কেউ গল্প জমিয়েছে বন্ধুদের সাথে। এর মধ্যে হঠাৎ এক ব্যক্তির হাঁকডাক কানে ভেসে এল। এই পানিই…ঠান্ডা পানি!
পাশ দিয়ে কোনো মানুষ হেঁটে গেলেই বলছেন, ‘মামা পানি নেন ঠান্ডা পানি। ঠিকমতো হাঁটাচলা করতেই তার কষ্ট হয়। তারপর ও মানুষের জটলা দেখলেই তিনি পানি বিক্রির আশায় ছুটে যাচ্ছিলেন দর্শনার্থীদের কাছে। বলছি রমনা পার্কে ঘুরে ঘুরে পানি বিক্রি করে সংসার চালানো আব্দুল গনির কথা।
তীব্র যানজট, কালো ধোঁয়া আর ময়লার দুর্গন্ধে আজ ঢাকার আকাশ-বাতাস আচ্ছন্ন, এমন বাতাসে যেখানে নিশ্বাস নেওয়ার অবস্থা নেই, সেখানে বিশুদ্ধ বাতাসের আশায় রাজধানী ঢাকার ফুসফুসখ্যাত রমনা পার্কে ছুটে আসেন নগরবাসী। রমনা পার্কে কোনো প্রকার খাদ্য দ্রব্য বিক্রয়ে নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ত্রিশ বছর ধরে এই পার্কে নানা রকম শুকনা খাবার ও পানি বিক্রি করে আসছেন আব্দুল গনি, যা তার জীবিকা নির্বাহের একমাত্র মাধ্যম।
খুব অল্প বয়সে জীবিকার তাগিদে ঢাকায় আসেন আব্দুল গনি। তখন থেকেই তিনি রমনার ভেতরে এবং রমনার আসেপাশে শুকনা খাবার এবং পানি বিক্রি করা শুরু করেন। এভাবে তার সংসার যখন ভালোই চলছিলো তখন হঠাৎই এক অপ্রত্যাশিত দূর্ঘটনার কবলে পরে নিজের দুটি হাতই হারাতে হয় তাকে। এরপর তার পরিবারে নেমে আসে আর্থিক দুর্যোগ। পরিবারের দুরবস্থা দূর করার জন্য তিনি ফিরে আসেন তার পুরোনো পেশায়। এবার বিক্রি করা শুরু করেন শুধু পানি।
জন্ম বরিশালে। এক মেয়ে, দুই ছেলে এবং স্ত্রী নিয়ে মোট পাঁচ সদস্যের পরিবার আব্দুল গনির। ছোট ছেলে এসএসসি পরীক্ষার্থী, বড় ছেলে গাড়ি চালক এবং একমাত্র কন্যার বিবাহ সম্পন্ন করেছেন তিনি। একসময় শুধু মাত্র পানি বিক্রি করে পাঁচ সদস্যের সংসার চালানো তার জন্য কষ্টের হয়ে ওঠে। শারীরিক অক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সন্তানদের প্রতি দ্বায়িত্বপালন থেকে সরে দাঁড়াননি তিনি। প্রতিনিয়ত পরিবারের সদস্যদের ভালো রাখার জন্য শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন আজও।
প্রতিদিন ঢাকার নতুন বাজার থেকে রমনা পার্কে পানি বিক্রি করতে আসেন আব্দুল গনি। রমনার ভেতর এইসব জিনিস বিক্রি করার অনুমতি না থাকার সত্ত্বেও পেটের দায়ে প্রতি নিয়ত তিনি করে যাচ্ছেন এই কাজটি। তার শারীরিক অক্ষমতাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সহানোভুতিরর চোখে দেখেন বলেই আজও কাজটি করতে পারছেন।
এই ব্যেপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ” আমার পেট কি জানে আমার দুইটা হাত নাই। পেটের যন্ত্রনা মেটানোর জন্যইতো কষ্ট ভুইলা কাজ করি। পেটের যন্ত্রনার কাছে দুইটা হাত না থাকা কিছুই না। এই যে রোজার মাস তখনতো বিক্রি বন্ধ, তখনতো না খাইয়ে রোজা থাকতে হবে। ”
আব্দুল গনির মতো এমন অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ির জন্য রমনা পার্ক তাদের জীবিকা র্নিবাহের একমাত্র অবলম্বন । কিন্তু আব্দুল গনির গল্প অন্যরকম। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন মনোবল দৃঢ় থাকলে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কোনো বাঁধা হতে পারে না।
