
ফাইজা নোহান
বৃষ্টি নামার ঠিক আগমুহূর্ত। ইদ্রাকপুর দুর্গের পুরোনো দেয়ালে তখনও লেগে আছে বিকেলের আলো। হঠাৎ কালো মেঘে ঢেকে গেল আকাশ। কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হলো ঝুম বৃষ্টি। শত শত বছরের ইতিহাসের সাক্ষী সেই দুর্গের ভেতরে দাঁড়িয়ে আমরা যেন অন্য এক সময়ের বাংলাকে অনুভব করছিলাম।
৯ মে ২০২৬। স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যাল বাংলাদেশের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের ৮৩ ব্যাচের শিক্ষার্থীদের জন্য দিনটি ছিল শ্রেণিকক্ষের বাইরের এক ভিন্ন শিক্ষার দিন। ফিচার ও ক্রিয়েটিভ রাইটিং কোর্সের অংশ হিসেবে বিভাগের শিক্ষিকা শবনম জান্নাতের নেতৃত্বে আমরা বের হয়েছিলাম মুন্সীগঞ্জের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মানুষের জীবনযাত্রাকে কাছ থেকে জানার উদ্দেশ্যে।
সকাল ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে যাত্রা শুরু। রাজধানীর কোলাহল পেছনে ফেলে বাস ছুটতে থাকে মুন্সীগঞ্জের দিকে। জানালার বাইরে একের পর এক সবুজ মাঠ, গাছপালা আর গ্রামীণ জনপদের দৃশ্য। প্রায় দেড় ঘণ্টার পথ পেরিয়ে পৌঁছে যাই বেতকা এলাকায়।

প্রথম গন্তব্য ছিল কাঠের ঘর তৈরির কারখানা। সারি সারি কাঠ, করাতের শব্দ আর কর্মব্যস্ত কারিগর পুরো পরিবেশটাই যেন শ্রম আর সৃজনশীলতার এক জীবন্ত কর্মশালা। চোখের সামনে কাঠের টুকরোগুলো ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ ঘরে। কারখানার কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, একসময় কাঠের ঘরের চাহিদা অনেক বেশি থাকলেও এখন পাকা ভবনের বিস্তারে সেই চাহিদা কমেছে। তবু ঐতিহ্য ও নান্দনিকতার কারণে এই শিল্প এখনো টিকে আছে।
সেখান থেকে আমরা যাই মুন্সীগঞ্জের অন্যতম ঐতিহাসিক স্থাপনা ইদ্রাকপুর দুর্গে। ১৬৬০ সালে মুঘল সুবেদার মীর জুমলার নির্মিত এই দুর্গ একসময় নদীপথ রক্ষা এবং জলদস্যুদের আক্রমণ প্রতিহত করার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। বিশাল দেয়াল, গোলাকার বুরুজ আর স্থাপত্যের দৃঢ়তা আজও সেই সময়ের শক্তি ও গৌরবের গল্প বলে।
জাদুঘর খোলার অপেক্ষায় আমরা কিছু সময় কাটাই দুর্গের ভেতরের পুকুরপাড়ে। কেউ ছবি তুলছিল, কেউ গল্পে মেতে উঠেছিল, আবার কেউ পুকুরের পানিতে নেমে উপভোগ করছিল মুহূর্তটিকে। পরে জাদুঘরে সংরক্ষিত প্রত্ননিদর্শনগুলো দেখে ইতিহাস যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।
দুর্গ পরিদর্শনের সময়ই শুরু হয় প্রবল বৃষ্টি। বজ্রপাতের শব্দে কিছুটা আতঙ্ক তৈরি হলেও বৃষ্টিভেজা মুন্সীগঞ্জের রূপ ছিল মুগ্ধ করার মতো। ভেজা মাটির গন্ধ, সবুজ প্রকৃতির সতেজতা আর দূর থেকে ভেসে আসা নদীর বাতাস মুহূর্তটিকে করে তোলে আরও স্মরণীয়।
দুপুরের খাবারের জন্য আমরা যাই স্থানীয় একটি রেস্তোরাঁয়। ভ্রমণের ক্লান্তি দূর করতে মোরগ পোলাও যেন ছিল আদর্শ আয়োজন। খাবারের টেবিলে গল্প আর হাসির রেশ ছড়িয়ে পড়ে পুরো দলে।
খাওয়াদাওয়ার পর আমাদের যাত্রা বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনী গ্রামে। এখানেই জন্ম নিয়েছিলেন উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বৌদ্ধ পণ্ডিত অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান। অতীশ দীপঙ্কর মেমোরিয়াল কমপ্লেক্সে পৌঁছে আমরা কথা বলার সুযোগ পাই অধ্যক্ষ করুনানন্দ থেরোর সঙ্গে।
তিনি অতীশ দীপঙ্করের জীবন, শিক্ষা এবং বৌদ্ধ দর্শনের মানবিক দিকগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। করুণা, সহমর্মিতা, আত্মসংযম ও জ্ঞানচর্চার গুরুত্ব সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য আমাদের সামনে ইতিহাসকে নতুনভাবে উন্মোচন করে। বইয়ের পাতায় পড়া একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব যেন সেদিন বাস্তবের মানুষ হয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন আমাদের আলোচনায়।

মেমোরিয়াল কমপ্লেক্সের আরেক আকর্ষণ ছিল দুই কুকুর পিকু ও রোমিও। মন্দির প্রাঙ্গণের স্থায়ী বাসিন্দা এই দুই প্রাণী দর্শনার্থীদের কাছে বেশ পরিচিত। শান্ত পরিবেশের মধ্যে তাদের উপস্থিতি জায়গাটিকে দিয়েছে এক অন্যরকম প্রাণচাঞ্চল্য।
মন্দিরের পাশেই ছিল সবুজে ভরা করল্লার ক্ষেত। বৃষ্টির মধ্যে কৃষকদের ক্ষেত থেকে টাটকা করল্লা তুলতে দেখে আমরা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকি। অনেকেই সেখান থেকে করল্লা কিনে নেন। কৃষকের শ্রম, প্রকৃতির উদারতা আর গ্রামের সরল জীবনযাপন যেন এক ফ্রেমে ধরা পড়ে সেই মুহূর্তে।

ফেরার পথে স্থানীয় মৃৎশিল্পের দোকানগুলোতেও থামা হয়। মাটির তৈরি হাঁড়ি, কলস, শোপিস ও নানা অলংকার স্থানীয় কারিগরদের দক্ষতার পরিচয় বহন করছিল। কেউ কেউ স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে সঙ্গে করে নিয়ে নেন সেসব শিল্পকর্ম।
দিনের শেষ গন্তব্য ছিল একটি ক্ষীর ভান্ডার। মুন্সীগঞ্জের বিখ্যাত দই ও মিষ্টির স্বাদ গ্রহণের মধ্য দিয়ে শেষ হয় দিনের সফর। তবে শেষ হয় না অভিজ্ঞতার রেশ।
এই শিক্ষা সফর শুধু পাঠ্যসূচির অংশ ছিল না; ছিল ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখার, মানুষের জীবনকে বোঝার এবং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে নতুনভাবে আবিষ্কার করার একটি সুযোগ। কাঠের ঘরের কারখানা, ইদ্রাকপুর দুর্গ, অতীশ দীপঙ্করের স্মৃতিবিজড়িত জন্মভূমি কিংবা গ্রামীণ কৃষিজীবন—সব মিলিয়ে মুন্সীগঞ্জ আমাদের সামনে উন্মোচন করেছে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মানুষের জীবনের এক অনন্য গল্প।

দিন শেষে ঢাকার পথে ফেরার সময় বাসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, একটি দিনের ভ্রমণ কত শত বছরের ইতিহাস, কত মানুষের শ্রম আর কত অজানা গল্পের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিল। আর তাই মুন্সীগঞ্জ সফর আমাদের কাছে শুধু একটি ভ্রমণ নয়; বরং শেখা, অনুভব করা এবং নতুনভাবে বাংলাদেশকে আবিষ্কারের এক স্মরণীয় অভিজ্ঞতা।