তপন মাহমুদ লিমন:
ক’দিন ধরে এটা নিয়ে বেশ ভাবছি? ভাবছি একটা মনুষ্যহীন পৃথিবীর কথা। মানুষ ফুরালে কি পৃথিবীর গুরুত্ব হারিয়ে যাবে? যাবে হয়তো। মানুষের কাছে! কিন্তু সেও বা কিভাবে? মানুষ না থাকলে এটা নিয়ে ভাববে কিভাবে? কিন্তু আগ বাড়িয়ে আমরা এখন কি ভাবতে পারবো একটা মানুষহীন পৃথিবীর কথা! কারণ আমরা তো ধরেই নিয়েছে, ধর্মমতে হোক কিংবা ভিন্ন চিন্তায়, মানুষই এই পৃথিবীর প্রধান জীব! সৃষ্টিকর্তার বিশেষ ইচ্ছায় মানুষের সৃষ্টি। আর এই মানুষকে ঘিরেই বাকি সব আয়োজন। এই বিশ্বাসকে মাথায় নিয়েই, মানুষ বাকি সব কিছুর উপর তার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রনকে জায়েজ করেছে। নিজেদের মত করে পৃথিবী সাজিয়েছে। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র বানিয়েছে। আর বানিয়েছে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র’র সূচনাকারী ব্যক্তিগত সম্পত্তির উত্তরাধীকার। ফলে প্রজন্মান্তরে মানুষ তার প্রজাতির অস্তিত্ব বজায় রাখছে। প্রকৃতির অন্য সবাই যেখানে এটা করছে স্বাভাবিক প্রকৃতির নিয়মে, একমাত্র ব্যতিক্রম মানুষই তার বংশ বিস্তারে মাথায় রাখছে সম্পদের উত্তারিধীকার! সেটা আরো বিস্তৃত হচ্ছে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে। মানুষ তার প্রজাতির অস্তিত্ব রক্ষার আয়োজন করেই দায়িত্ব শেষ করতে পারছে না। তাকে পরিবার, সমাজ, এমনকি রাষ্ট্রকেও রক্ষার আয়োজন করতে হচ্ছে। চেতনে বা অবচেতনে পৃথিবীর প্রায় সব মানুষ এই প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে গেছে। একমাত্র মানুষের লড়াই পৃথিবীর অন্য সব প্রাণীর থেকে আলাদা। হয়তো এটাই তাকে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালনকারীর মর্যাদা দিয়েছে।
তাহলে কি মানুষ ধরেই নিয়ছে, মানুষ মানেই পৃথিবী? মানুষের অস্তিত্বহীনতায় পৃথিবীও কি অস্তিত্বহীন হয়ে পড়বে? বিজ্ঞান বলে পৃথিবীর একটা জীবন-চক্র আছে! তাতে মানুষ কি অপরিহার্য? কিন্তু কি করে বলি? পৃথিবী থেকে কত প্রাণীরও তো বিলোপ হয়েছে! অতিকায় ডায়নোসারও তো ধ্বংস হয়েছে! তাই মানুষ না থাকলে পৃথিবীর জীবনচক্র যে শেষ হয়ে যাবে না, সেটা বলাই যায়! তাহলে মানুষহীন পৃথিবীটা কি আরো সুন্দর আরো সবুজ আরো বাসযোগ্য হয়ে উঠবে?
এই পর্যায়ে আপনার মনে যদি প্রশ্ন আসে, তাহলে বাসযোগ্য হয়ে কি লাভ? আমি বলবো, যাক, আপনি মানুষ আছেন। কিন্তু আপনার ভাবনায় একটা সীমাবদ্ধতা আছে! আপনি ভাবছেন না, বিপন্ন প্রায় প্রাণীগুলো হয়তো বেঁচে যাবে! গাছে গাছে কাঠবিড়ালী আবার ভরে উঠবে! পাখির ডাকে আবার প্রানচঞ্চল হয়ে উঠবে পৃথিবী! কিছুদিন আগেই একটা ডকুমন্টারি দেখছিলাম, রাশিয়ার চেরোনবিল নিয়ে। পারমানবিক দূর্ঘটনার পর এই অঞ্চলকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছিল! কিন্তু আমাদের মানুষের ধারণাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আবার সবুজ, বাসযোগ্য হয়ে উঠেছে চেরোনবিল! মানুষের কোন সাহায্য ছাড়াই!
আপনি একটা পাখি হয়ে যান কিংবা একটা কাঠবিড়ালী! ভাবুন, কবি জীবনানন্দের মত কোন কপোতাক্ষের তীরে আপনি ফিরে এলেন কোন ‘শঙ্খচিল বা শালিকের বেশে’। কপোতাক্ষে তখন কোন দূষণ নেই। আপনি ভাসলেন! উড়লেন! কারণ পৃথিবীর সবচেয় ভয়ংকর দুষন সৃষ্টিকারী এবং শিকারী মানুষ আর পৃথিবীতে নেই! মনে রাখবেন, বাঘও ক্ষুধা মিটে গেলে আর শিকার করে না, যতক্ষণ না আবার ক্ষুধা লাগে! মানুষই একমাত্র যার ক্ষুধার কোন শেষ নেই! কোন কালেই কি ছিল না? ছিল! যখন পশু শিকার করে তারা জীবন কাটাতো। সবাই তখন যা পেত ভাগ করে খেতো! সেটা ছিল আদিম সাম্যবাদী সমাজ। কিন্তু যখন থেকেই নিজের করে নিতে শিখলো প্রকৃতির অন্য সব কিছুকে তখন থেকেই তার পতন শুরু! অথচ এটাকেই বলছে উন্নতি!
মানব সভ্যতার উন্নতির এই ধারণায় কুঠারাঘাত করেছে করোনা। সবাই ভাববেন এর মোকাবেলা করার সামর্থ মানুষের নেই?এটাই কি মানুষের সীমাবদ্ধতা? না। মানুষের সীমাবদ্ধতা হল, সে তার সীমাবদ্ধতাটাই বুঝতে অক্ষম।অন্যসব প্রজাতির উপর নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রন আরোপকেই আমরা সাফল্য মনে করি!কিন্তু এই মনুষ্য সমাজ নিজ প্রজাতিকে সম্মান, মর্যাদা দিতে শেখেনি আজ পর্যন্ত! সমান ভাবতে পারে না, এক অন্যকে! মনুষ্য প্রজাতির সামষ্টিক কল্যাণ নিয়ে খুব কমজনই ভেবছেন। আর যারা ভেবেছেন, তাদেরকেই বরং নানা ভাবে কোয়ারেন্টিন করে রেখেছে সমাজ ও রাষ্ট্র! ভাইরাসের কারণে যত মৃত্যু হয়েছে, তার চেয়ে মানুষ্য সৃষ্ট কারণে – যুদ্ধ, গণহত্যা, গুপ্তহত্যা, ক্রসফায়ার/এনকাউন্টার, জঙ্গিহামলা, দুর্ভিক্ষ, জলবায়ু পরিবর্তন- কি কম মানুষ মারা গেছেন? আর এসব করতে গিয়ে, মানুষ তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমান করতে গিয়ে বারবার প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রনের চেষ্টা করছে! কিন্তু নিজেকে প্রকৃতির একটা অতিক্ষুদ্র প্রজাতি ভাবতে পারে নি।
সবশেষে বলি, মানুষ হিসেবে আমাদের সীমাবদ্ধতাটা বুঝতে হবে। আমাদের যেহেতু জন্ম হয়, মৃত্যু অবধারিত, ঠিক একটা ভাইরাসের মত। আমাদের জ্ঞান-বুদ্ধি হয়তো আমাদের বিশেষ কিছু সুবিধা দিতে পারে, কিন্তু মহাকালের কাছে এর মূল্য একটি জেলিফিস, একটা মাছরাঙা, একটা আ্যমিবা কিংবা একটা গোলাপ গাছের মতই! তাই, আমরা নত হই প্রকৃতির কাছে! প্রকৃতিকে যত নিরাপদ রাখতে পারবো, আমরাও তত নিরাপদ থাকবো! মনে রাখবেন, সৃষ্টিকর্তার কাছে তার সব সৃষ্টিই মূল্যবান!
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ।