গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও আমাদের অরণ্যে রোদন!

কলাম

লেখক মুশতাকের মৃত্যু, কার্টুনিস্ট কিশোরের গ্রেফতার এবং সাংবাদিক কাজলের দিনের পর দিন জামিন না পাওয়ার দৃষ্টান্তগুলো অতি সাম্প্রতিক। তারপরও প্রথম আলোর সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের সাথে যা হয়েছে, হল, হচ্ছে বা হতে চলেছে আমি ঠিক বিশ্বাস করতে পারছি না। সচিবালয়ে গতকাল তাকে ঘন্টার পর ঘন্টা আটকে রেখে যেভাবে হেনস্থা করা হয়েছে, তা সাংবাদিকতার ইতিহাসে বিরল এবং ন্যাক্কারজনক। আমার ধারনা ছিল ‘দু’নম্বরি’ ঢাকতে আর ক্ষমতার মোহে পরেই কর্তাব্যক্তিরা এমনটি করেছেন। উত্তেজনা প্রশমন হওয়া মাত্র তারা তাদের ভুল বুঝতে পারবেন এবং যারপর নাই লজ্জিত হবেন। আমি নাদান মানুষ, সামান্য সাংবাদিকতার শিক্ষক, ক্ষমতার বাড়াবাড়ি বুঝে আসে না। অনকেই যেমন বলছেন, নিজেদের কোটি টাকা চুরির নথি ঢাকতে তারা রোজিনাকে ‘চোর’ সাজিয়েছেন, তথ্য ‘চুরির’ অভিযোগ আরোপ করেছেন, তার সাথে দ্বিমত হতে পারছি না।

আমার আঙুলগুলো যখন কিবোর্ড চেপে চেপে অরণ্যে রোদন করে যাচ্ছে ঠিক তখুনি বাইরে এক পশলা বৃষ্টি নেমে গেল। তাতে গত দু’দিনের গুমোট ভ্যাঁপসানো গরম কমে স্বস্তি ফিরলেও, রোজিনা ইসলামকে নিয়ে যে গুমরাহ তৈরি হয়েছে তার ইতিবাচক পরিনতি পাওয়া গেল না। সাংবাদিকরা আজ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রেস কনফারেন্স বয়কট করেছেন। বিকেলে কারওয়ান বাজারে প্রতিবাদ সমাবেশ, মানব বন্ধন। এদিকে, পুলিশ ক্যারাভান থেকে রোজিনা ইসলামের নিক্ষিপ্ত দৃষ্টির ছবিটি আমাদের নিউজফিড ফালা ফালা করে দিচ্ছে।

খুব সামগ্রিকভাবে চিন্তা না করেও এখানে আমার/আপনার সরাসরি দুইটা ভয়ের দিক আছে। এক. এমনটা ঘটতে থাকলে গণমাধ্যম আমাদের মত আমজনতার অধিকার নিয়ে কথা বলতে পিছপা হবে। দুই. সরকারি দায়িত্বরত যেকোন ব্যক্তি আমাকে/আপনাকে পুলিশে সোপর্দ করতে পারবে। এদেশে দমনমূলক আইনের অভাব নাই, বুঝেশুনে একটা মামলা ঠুকে দিলেই হল। এখানে পুলিশ জনগণের বন্ধু বা দুর্বলের কান্ডারি হয়ে উদ্ধার করতে আসবে না। ঘন্টার পর ঘন্টা হেনস্থা বা অপদস্থ করা হল কেন কেউ এই প্রশ্ন তুলবে না।

সাংবাদিকতা চ্যালেন্জিং পেশা, তবে বাংলাদেশের জন্য পেশাটি দিনদিন আরো কঠিন হয়ে পড়েছে। সম্প্রতি রাজধানীতে এক তরুণীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে গণমাধ্যমের ওপর মালিকানা এবং বিজ্ঞাপনের চাপ কতটা প্রবল হতে পারে সে সম্পর্কে আন্দাজ পেয়েছি। আর এই ঘটনা বুঝিয়ে দিচ্ছে প্রশাসন কত বড় চাপ তৈরি করে মুক্ত গণমাধ্যমের জন্য।

গণমাধ্যমের টুটি চেপে ধরতে রাষ্ট্র কিছু আইন তৈরি করে। আইন দিয়ে এরা নৈতিক সমর্থন আদায় করে নিতে চায়। এক্ষেত্রে সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে অফিসিয়াল সিক্রেসি অ্যাক্ট ভঙ্গের দায় চাপানো হয়েছে। ডিজিটাল সিকিউরিটি এ্যাক্ট যেমন ভিন্নমত তুলে আনার এবং সরকারের সমালোচনার পরিপন্থী ভূমিকা পালন করতে পারে বা পারছে। ঠিক তেমনি প্রশাসনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চালাতে অফিসিয়াল সিক্রেসি এ্যাক্ট ভয়ংকর বাঁধা। আপনি নথি, দলিল ছাড়া তো অনুসন্ধানী রিপোর্ট লিখতে পারবেন না। আর যারা দুর্নীতি করবেন তারা নিশ্চয়ই নথি গোপন রাখতে চাইবেন। এই আইন তাদের এই অন্যায় চাওয়াটাকে নিরাপত্তা দেয় মাত্র। ফলে এই আইনের নৈতিক ভিত্তি অত্যন্ত দূর্বল।

আরো যেটা বড় ব্যাপার বাংলাদেশের সংবিধান তার নাগরিরকের মত প্রকাশের স্বাধীনতা দেয় এবং এটাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে গণ্য করে । এই সংবিধান হল দেশের সর্বোচ্চ আইন। নিয়ম অনুযায়ী দেশের সকল আইন হবে সংবিধান অনুসারে, সংবিধানের পরিপন্থী কোন আইন তৈরি হতে পারে না বা টিকে থাকতে পারে না। সেইদিক বিবেচনায় অফিসিয়াল সিক্রেসি এ্যাক্ট এবং ডিজিটাল সিকিউরিটি এ্যাক্ট সংবিধান পরিপন্থী।

একজন নাগরিক মত প্রকাশের ক্ষেত্রে কতটা স্বাধীন, তার রিকটার স্কেল হল গণমাধ্যম। গণমাধ্যম যেখানে কথা বলতে পারে না, সেখানে ব্যক্তি মানুষের বাকস্বাধীনতা সোনার পাথরবাটি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *