ইন্দ্রাণী মল্লিক
কাজী নজরুল ইসলাম বরাবরই আমার কাছে একজন ব্যতিক্রমী সৌন্দর্যচেতা কবি। আমার মনে হয়, কবিতা এক কাল্পনিক জগৎ, কবিরা সবসময় তাদের কল্পনাকে কবিতায় প্রকাশ করেন। কিন্তু নজরুলের কবিতায় বাস্তবতার চিত্রও প্রতিফলিত হয়। নজরুলের কবিতা আমাদের বিদ্রোহী হতে শেখায়, সম্যবাদী হতে শেখায়, কখনোবা প্রকৃতিকে খুব কাছ থেকে অনুভব করতে শেখায়। কবি প্রকৃতিকে খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করেছেন। প্রকৃতিকে জানা মানে নিজেকে জানা, আর নিজেকে জানা মানে জীবনের সব গভীরতা উপভোগ করা। প্রকৃতির প্রতি তাঁর এই প্রেম লক্ষ করে লোকে তাঁকে ‘তারাক্ষ্যাপা’ বলে ডাকতো।
একই প্রকৃতিকে বারবার ভিন্ন ভিন্ন রূপে আবিষ্কার করেছেন নজরুল। দোলনচাঁপা, ঝিঙেফুল, ফণীমনসা, মহুয়া এসব নাম তাঁর রচনাকে আরো বেশি সুরভিত করেছে। নজরুলের ‘ঝিঙেফুল’ কবিতায় প্রকৃতির প্রতি কবির গভীর ভালোবাসা ও মমত্ববোধের প্রকাশ ঘটেছে। পৌষের বেলা শেষে সবুজ পাতার এদেশে জাফরান রং নিয়ে ঝিঙে ফুল মাচার ওপর ফুটে থাকে। এ সৌন্দর্যে মুগ্ধ কবি প্রজাপতির ডাকে আকাশে এমনকি স্বর্গের অলকাপুরীতেও যেতে চান না। এই মাটি মায়ের গভীর সান্নিধ্যেই থাকতে চান।
তাঁর চৈতী হাওয়া একটি মাতাল প্রেমের কবিতা হলেও সেখানে প্রকৃতির ছোঁয়া পাওয়া যায়। কবি যাকে ভালোবাসতেন সেই প্রিয়তমা কোথায় হারিয়ে গিয়েছে! প্রিয়ার সাথে তাই যোজন যোজন দূরত্বের সৃষ্টি হয়েছে। জীবনটা এক সময় ছিলো নিস্তরঙ্গ পুকুরের মতো। এই নিস্তরঙ্গ জীবনে কবি প্রিয়া প্রেমের টেউ তুলে দিয়ে উধাও হয়ে গিয়েছে।
রোজ পূর্বদিগন্তে সূর্য উঠে আবার পশ্চিমে অস্ত যায়। যাপিত জীবনে এই খেয়াঘাটে কবি মাঝির মতো প্রিয়তমারূপী যাত্রীর অপেক্ষায় আছেন। এক চৈতী দিনে প্রিয়তমা কবির বাহুলগ্ন হয়েছিলো। আজ আবার সেই চৈতী দিন। হাওয়ায় চারদিক উন্মাতাল। আমের বনে মুকুল ধরেছে। নিসর্গ জেগেছে নানান ফুলে। অথচ কবির জীবন প্রিয়াশূন্য। অধীর আগ্রহে প্রিয়ার জন্য অপেক্ষা করছে কবি। কবি তখন লিখেছেন, ‘বুলবুলি নীরব নার্গিস-বনে, ঝরা বন-গোলাপের বিলাপ শোনে’।
প্রকৃতি প্রেমীদের কোনো মৃত্যু হয় না। প্রকৃতিতেই তারা আবার হারিয়ে যায়। পুষ্পরাজির দিকে তাকিয়ে ‘বুলবুলি নীরব নার্গিস-বনে’ গানটি শোনার সময় আমরা তাঁকে দেখতে পাবো। প্রতিটি ইন্দ্রিয়তে অনুভব করতে পারবো।
শিক্ষার্থী, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ
