মোঃ ওয়াসিমুল বারী সিয়াম
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মোহনীয় আকর্ষণে আঁকড়ে ধরে আছে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার। যারা ভ্রমণ করতে পছন্দ করেন তারা সময় পেলেই ছুটে যান কক্সবাজারসহ অনেক পর্যটন এলাকায়। আমরাও – স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের ৭৮ থেকে ৮৪ ব্যাচের মোট ৪১জন এবার বেছে নিয়েছিলাম কক্সবাজারকে, “সাগরের নীলের হাতছানি” নামের এক স্টাডি ট্রিপের গন্তব্য হিসেবে। সাথে ছিলেন বিভাগের শ্রদ্ধেয় সহকারী অধ্যাপক মোশাররফ হোসেন স্যার এবং উজ্জ্বল প্রাণশক্তির উৎস শবনাম জান্নাত ম্যাম – এই ভ্রমণের পথপ্রদর্শক, আবার একই সঙ্গে আমাদের আত্মিক সঙ্গী। তাদের পরিবারও ছিলেন আমাদের সফরসাথী, যাঁদের উপস্থিতি পুরো ট্রিপকে আরও উষ্ণ ও প্রাণবন্ত করে তুলেছিল।

আমাদের বাস ছাড়ে গভীররাতে, রাজধানীকে পিছনে ফেলে চলতে থাকে – ঘুম জড়ানো চোখে একেকজন উঠে সিটে বসি, কিন্তু চোখে-মুখে তখনও উত্তেজনার ঝিলিক।
পরদিন সকালে ডলফিন মোড়ে নেমে ‘বে ইউন্ডারস’ হোটেলে বিশ্রাম নেই, নাস্তা শেষ করেই ছুটে যাই অদেখা সমুদ্রের পথে। চারপাশে নরম আলো ছড়িয়ে আছে, যেন প্রকৃতিও আজ আমাদের সঙ্গে রওনা হয়েছে। সমুদ্র এত বিশাল! আগে কখনো এত বড় জলরাশির সামনে দাঁড়াইনি। হৃদয়টা কেমন যেন ধকধক করতে লাগল উত্তেজনায়। স্যান্ডেল খুলে পা রাখলাম ভেজা বালিতে – ঠান্ডা ঠান্ডা এক অদ্ভুত আরাম লাগল মনে। সবাই একসাথে হাঁটতে শুরু করলাম। কেউ জুতা হাতে দৌড়াচ্ছে, কেউ বালিতে নাম লিখছে, আর কেউ দাঁড়িয়ে ঢেউয়ের ছবি তুলছে মোবাইলে। একসময় আর না পেরে নেমে পড়লাম জলে। শুরু হলো আমাদের সমুদ্রস্নান। কেউ ঝাপ দিচ্ছে, কেউ পানি ছিটিয়ে দিচ্ছে হাসতে হাসতে। শেষে আমরা সবাই একসাথে ঢেউয়ের সাথে তাল মিলিয়ে দুলে উঠলাম। মনে হলো, ঢেউ শুধু পানি নয় – এ যেন আনন্দের এক ভাষা, যেটা বুঝতে হলে শুধু চোখ নয়, মনটাও খুলে দিতে হয়।

সেখান থেকে ফিরে সবাই চেক-ইন করল, তখন ঘড়ির কাঁটা ১২টা ছুঁইছুঁই। সামান্য বিশ্রামের পর দুপুরের খাবার সেরে সোজা যাওয়া হয় সুগন্ধা সৈকতে। ঢেউয়ের ছোঁয়া, পায়ে বালুর নরম স্পর্শ – সব মিলিয়ে যেন মন জুড়ে বসে এক অপার ভালোলাগার ঢেউ।

বিকেলে ঘুম থেকে উঠে শুরু হয় নতুন আরেক অধ্যায়, কলাতলি বিচ। সেখানে দাঁড়িয়ে সবাই উপভোগ করল সূর্য ডোবার অপূর্ব দৃশ্য।
বিচের হকারদের কাছে দেখা যায় শামুক, ঝিনুক, মালা। কেউ কেউ সেখানেই সামুদ্রিক খাবার-কাকড়া, অক্টোপাস সি-ফুডের স্বাদ নিয়ে নেয়।
হাঁটতে হাঁটতে আবার ফিরে যাই সুগন্ধা সৈকতে, যেখানে সৈকতপাড়ের দোকানে কেনাকাটার ব্যস্ততা, কেউ ঝিনুক কিনছে, কেউ নাম খোদাই করাচ্ছে। কেউ আবার আচার, চকলেট কিনছেন।

সেখান থেকে ফিরে একটু বিশ্রাম নিয়ে রাতে আয়োজিত হয় বারবিকিউ পার্টি। কলাতলি সৈকত যেন উৎসবমুখর। কেউ গাইছে, কেউ তালি দিচ্ছে, কেউ আবার নীরবে উপভোগ করছে সেই উষ্ণতা।
একপর্যায়ে অনুষ্ঠিত হয় রেইফেল ড্র – উল্লাসে ফেটে পড়েন পুরস্কারজয়ীরা। খাবার শেষে কেউ ঘুমিয়ে পড়েন, আবার কেউ আবার বিচ বেড ভাড়া করে, কেউ নিরালায় সমুদ্রের গর্জন শুনতে ঘুরে বেড়ান একা একা।
পরদিন সকাল ৭টায় সবাই তৈরি। সুগন্ধা বিচের পাশের বুফে রেস্টুরেন্টে সকালের নাস্তা সেরে ফিরে আসে হোটেলে – ব্যাগ গোছানো, গোসল সেরে আবার নতুন ভ্রমণের প্রস্তুতি। ঠিক ১২টার দিকে দুপুরের খাবার খেয়ে যাত্রা শুরু হয় চান্দের গাড়িতে করে মেরিন ড্রাইভের পথে।
প্রথম গন্তব্য হিমছড়ি – সেখানে পাহাড়ের ওপরে দাঁড়িয়ে নিচে তাকালেই দেখা যায় নীল সমুদ্রের বিস্তার। কেউ ছবি তোলে, কেউ দাঁড়িয়ে থাকে স্তব্ধ হয়ে। জায়গাটা যেন ছোট্ট এক মিনি বান্দরবান-সবুজ আর ঢেউয়ের বন্ধনে বাঁধা। এরপর যাওয়া হয় পাটোয়ারটেকে। কেউ গ্রুপ ছবি তোলে, কেউ আবার নিজের মত করে ছবি তুলতে ব্যস্ত। সন্ধ্যার আগে বিচে ফুটবল খেলায় মেতে ওঠে অনেকে। কেউ আবার সৈকতে বেড ভাড়া করে আড্ডায় মাতেন, গান করেন। সবশেষে সূর্য ডোবার মুহূর্তে সাগরের দিকে তাকিয়ে থাকে সবাই- চোখে তৃপ্তি আর মনভরা নীরবতা।

সূর্য ডোবার পর ফিরে এসে হোটেলে একটু বিশ্রামের পর অনেকেই বেরিয়ে পড়েন বার্মিজ মার্কেটে – কেউ ঝিনুক কিনছেন, কেউ আত্মীয়ের জন্য চুড়ি বা স্যুভেনির। সন্ধ্যার শেষপ্রান্তে, একদম চলে যাওয়ার আগে, অনেকে আবার একবার শেষবারের মতো সমুদ্র দেখতে যায় – বিদায়ের আগে শেষ হাতছানি যেন। রাত বাড়তেই আমরা উঠে বসি বাসে ফিরে আসার জন্য। চোখেমুখে ক্লান্তি, কিন্তু মনে ভেসে বেড়ায় ঢেউয়ের শব্দ, রোদেলা বিকেল, পাহাড়ের পাথর আর কিছু অমলিন বন্ধুত্ব।

স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক ও গণমাধ্যম অধ্যায় বিভাগের “সাগরের নীলের হাতছানি” নামের এই সফর কেবল একটা ভ্রমণ ছিল না, ছিলো শেখা, ছিলো সম্পর্ক গড়ে তোলা, আর নিজের ভেতরের প্রশান্তিকে খুঁজে পাওয়ার এক নিরলস প্রয়াস। তাঁরা ঘুরলেন, আর আমি দেখলাম – তাঁদের চোখে জীবনকে নতুন করে রঙিন হয়ে উঠতে।
