পাখির ডানায় উড়োজাহাজের আবিস্কার

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ভিন্ন খবর

মো. আল আমিন তুষার:
ছোটবেলায় পাখির মত করে আকাশে ওড়ার স্বপ্ন আমরা কে দেখিনি? মানুষের এমন ইচ্ছা বরাবরের। আর পাখি হবার এমন সাধই কিনা বাস্তব হলো উড়োজাহাজের আবিস্কারে। পৃথিবীর ইতিহাসকে বদলে দেয়া আবিষ্কার গুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। পুরো ‍দুনিয়াকে ছোট করে নিয়ে এসেছে এই বাহন। আকাশ পথের যাত্রার শুরুর গল্পগুলো জানবো আজ।

উনিশ শতকে আমেরিকার দুই ভাই অহাইয়ো অঙ্গরাজ্যের ডেটন শহরে একটি সাইকেল কোম্পানি পরিচালনা করতেন। উইলবার রাইট এবং তার ছোট ভাই অর্ভিল রাইট দুই জনই ছিলেন উদ্ভাবনী মানুষ। তারা স্বপ্ন দেখতেন কল্পনার অবাস্তব কে বাস্তবে রূপ দেবার। একদিন আকাশে পাখিদের উড়া দেখে উইলবার খেয়াল করেন পাখিরা ওড়ার সময় তাদের পাখার ডগা বাঁকিয়ে তাদের গতিপথ নিয়ন্ত্রন করছে। তার এই পর্যবেক্ষণ বদলে ফেলে ইতিহাস। সেই সময় অনেকেই বিমান উরাতে পারত তবে নিয়ন্ত্রন করতে পারত না এর গতিপথ, যার ফল প্রতিটি বিমান এর ভুলন্ঠিত হয়ে পড়ে যাওয়া।

উইলবার পাখিদের গতিপথ নিয়ন্ত্রন এর এই কৌশল দেখে একটি তত্ত্ব আবিস্কার করেন। তার এই তত্ত্ব অনুসারে, উড়াবারর সময় বিমান এর পাখা নড়ানো সম্ভব হলেই এর গতিপথ নিয়ন্ত্রন করা সম্ভব হবে। পরবর্তী সময়ে এই তত্ত্বকে পাখা মোচড়ানো বা উইং ওয়াপিং নামকরন করা হয়েছে।

এরপর পূর্ণ আকারের ইঞ্জিনবিহীন বিমান নির্মাণে টানা তিন বছর কাজ করেন এই দুই ভাই। নিরলস পরিশ্রমের পর একটা দারুন নকশা তৈরি হয়ে যায়। সেই অনুযায়ী তৈরি হয় একটি বিমানও। এখন একে পরিক্ষা করে দেখবার পালা। এর জন্যে প্রয়োজন পর্যাপ্ত বাতাস এবং দুর্ঘটনার ক্ষতি কমানোর জন্যে বালুময় ভুমি। এই সবকিছু ভেবে তারা পরীক্ষার জন্যে বেছে নেন নর্থ ক্যারলাইনা রাজ্যের কিটি হক সমুদ্র সৈকতকে। ১৯০২ সালে প্রথম এই ইঞ্জিনবিহীন বিমান এর পরীক্ষামুলক উড্ডয়ন ব্যর্থ হয়। তবে, এই ব্যর্থতা দমাতে পারেনি অদম্য রাইট ভাইদের। তারা বার বার চেষ্টা করে গেছেন। সময় নেন আরও এক বছর। এবার আর ইঞ্জিন বিহীন নয়, চার সিলিন্ডার বিশিষ্ট ১২ অশ্ব ক্ষমতা সম্পন্ন একটি ইঞ্জিন যুক্ত করা হয় এবার। উন্নত করা হয় রাডার ব্যাবস্থা। ডিজাইন এর মধ্যেও আনা হয় অনেক পরিবর্তন। এবারই প্রথম মানুষের অধরা সেই উড়বার সপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয় রাইট ব্রাদার্স।

দুই ভাই মিলে নতুন ডিজাইন এর এই বিমান উড়ানোর চেষ্টা করছেন চারদিন ধরে। দিনটা ১৯০৩ সালের ১৭-ই ডিসেম্বর, উইলবার রাইট সেদিন ৮৫২ ফিট উচুতে তাদের বিমানকে নিয়ে ভাসতে সক্ষম হন। ৫৯ সেকেন্ড ভেসে থেকে রেকর্ড সৃষ্টি করে “দি রাইট ফ্লায়ার”। এই সফল পরীক্ষার পরই দুই ভাই তাদের আবিস্কার এর জন্যে পেটেন্ট আবেদন করেন। কিছু বছরের মধ্যে সেটা পেয়েও যান রাইট ব্রাদার্স।

তবে, তারা একা বিমান আবিস্কার এর কাজ করছিলেন তা কিন্তু নয়। এই সমুদ্র সৈকত থেকে আরও প্রায় ৫০০ মাইল দূরে কাজ করছিলেন আর এক জন উদ্ভাবক। নিউ ইয়র্ক এর হ্যামন্ডস্পোর্ট এ বসে বিমান আবিস্কার এর নেশায় বিভোর ছিলেন গ্লেন কাটিস। তিনি ছিলেন পেশায় একজন মোটর সাইকেল ডিজাইনার। সেই সুবাদে প্রচুর জানতেন মোটর ইঞ্জিন সম্পর্কে। রাইট ভাইদের অসাধারান সফলতা দেখে তিনি তাদের কাছে চিঠি পাঠান। তাদের সাথে কাজ করে বিমান এর ইঞ্জিনকে আরও উন্নত করার প্রাস্তাব রাখেন। তবে রাইট ব্রাদার্স তাদের সফল্যের ভাগ অন্য কোন আমেরিকানকে দিতে চাননি। তাই ভালো ইঞ্জিনের দরকার থাকার পরও কার্টিস এর সহযোগিতার সেই প্রস্তাব নাকচ করে দেন রাইট ব্রাদার্স। এই প্রত্যাখ্যান হতাশ করেনি কার্টিসকে। বরং তিনি আরও উঠে পড়ে লাগেন রাইট ভাইদের আগেই উন্নত বিমান তৈরি করতে। আর এর মধ্য দিয়ে শুরু হয় ইতিহাস এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক উৎকর্ষতার লড়াই।

একটি আমেরিকান কোম্পানি কার্টিসের বিমান নির্মাণের জন্য বিনিয়োগ করতে রাজি হয়। টেলিফোন আবিষ্কারক আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল ছিলেন সেই কোম্পানির অন্যতম অংশীদার। ১৯০৭ সালে তারা যৌথভাবে কাজ শুরু করেন। তবে রাইট ভাইদের উড়োজাহাজের নকশা পেটেন্ট এর কারণেই তারা ওই ডিজাইন ব্যবহার করতে পারছিলেন না। আর এ কারণেই সম্পূর্ণ নতুন ডিজাইনের উড়োজাহাজ তৈরি করতে কাজ করছিলেন তারা। গ্রাহাম বেলের কোম্পানি এই মূল উদ্দেশ্য নিয়েই বিনিয়োগ করেন। আর এই আলাদা করার চেষ্টায় নতুন একটি উপায় আবিষ্কার করে ফেলেন কার্টিস। পাখা মোচড়ানো বা উইং ওয়াপিং এর পরিবর্তে তিনি ব্যাবহার করেন অন্য একটি তত্ত্ব। কার্টিস এর নতুন নকশা অনুযায়ী বিমানের মূল পাখার সাথে লাগানো হয় ছোট ছোট পাখা। পাখাগুলো ছিল কব্জা লাগানো ছোট ছোট ফ্ল্যাপ। আর এই প্রথমবার করানোর মাধ্যমে বিমানকে স্থিতিশীল করতে সক্ষম হন কার্টিস। কিছুদিনের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ করা শিখে ফেলেন তিনি। তার এই পদ্ধতির নামকরণ করেন ‘এইলরনস’ যার বাংলা অনুবাদ ছোট পাখা। বর্তমান সময়ের আধুনিক বিমানগুলোতেও কার্টিস এর এই পদ্ধতি সফলতার সাথে ব্যবহার করা হচ্ছে। কার্টিস এর সেই বিমানে ব্যবহার করা হয়েছিল ৪০ অশ্ব ক্ষমতাসম্পন্ন আরেকটি ইঞ্জিন। আর বিমানটির নামকরণ করা হয় “জুন বাগ”।

জুন বাগের সক্ষমতা প্রমাণ করতে “দি সাইন্টিফিক আমেরিকান কনটেস্ট” নামে একটি প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হয়। সেখানে আমন্ত্রণ জানানো হয় গ্লেন কার্টিস এবং রাইট ভাইদের। তবে ডিজাইন চুরি হয়ে যাওয়ার ভয়ে রাইট ভাইরা প্রতিযোগিতায় যাওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। অন্যদিকে, প্রতিযোগিতা ঠিক আগের দিন পরীক্ষামূলক উড্ডয়নের সময় দুর্ঘটনায় পড়ে জুন বাগ পুরো বিধস্ত হয়ে যায়, অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান গ্লেন কার্টিস।

নিজের সম্মান বাঁচাতে একদিনের মধ্যে তার সহকারীদের সাথে নিয়ে জুন বাগ মডেলের আরও একটি বিমান তৈরি করে প্রতিযোগিতায় অংশ নেন গ্লেন কার্টিস। ১৯০৮ সালের ৪ জুলাই নিউ ইয়র্ক এর আকাশে প্রায় ২ মিনিট ভেসে থেকে এবং প্রায় এক কিলমিটার পাড়ি দিয়ে রাইট ভাইদের রেকর্ড ভেঙ্গে রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যান তিনি।

তার এই অভাবনীয় সাফল্যের পর রাইট ব্রাদার আরো একটি পাল্টা প্রদর্শনীর আয়োজন করে। আমেরিকান সেনাবাহিনীর রাইট ভাইদের সাথে ২৫ হাজার ডলারের একটি চুক্তি করে। ১৯০৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর অরভিল রাইট তৎকালীন সময়ের সকল রেকর্ড ভেঙে দেন। সেদিনটা টানা ৬২ মিনিট সফল ভাবে উড্ডয়নে সফল হন তিনি। ১২ টি সফল উড্ডয়ন এর পর শেষ আনুষ্ঠানিক প্রদর্শনের জন্য টম সিলফ্রিজ নামের এক সামরিক অফিসার অলরাইট এর সাথে বিমানে ওঠেন। তবে তখনও একজনের বেশি মানুষ নিতে সক্ষম ছিল না বিমান। সেটা আঁচ করতে পারিনি কেউই, যার ফল হিসেবে এই প্রদর্শনী শেষ হয় এক মারাত্মক দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে। অরভিল রাইট অল্পের জন্য বেঁচে যান সেদিন, তবে সামরিক অফিসার টম সিলফ্রিজ চলে যান না ফেরার দেশে। তিনিই ইতিহাসে প্রথম ব্যক্তি হিসেবে বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেন। অরভিল রাইট তারপর থেকে আর নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেননি। দুর্ঘটনায় পা এবং পাঁজরের হাড় ভেঙে তাকে সারাটা জীবন কাটাতে হয়েছে অনেক যন্ত্রণায়।

১৯০৯ সালে নিউইয়র্কে একটি বিশাল উৎসবের আয়োজন করা হয়। শেখানে আরও একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়, যা এই উৎসবের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল। এই প্রদর্শনী ছিল সর্বপ্রথম জনসাধারণের সামনে বিমান উড্ডয়নের প্রদর্শনী। উইলবার রাইট হাডসন নদীর উপর বিমান চালিয়ে জনসাধারনের মনে বিস্ময় সৃষ্টি করেন।

অন্যদিকে কার্টিস তার পুরোনো ডিজাইনগুলোকে আরো উন্নত করতে থাকেন। তিনি নানা ধরনের ডিজাইনের বিমান তৈরি করতে সক্ষম হন। কার্টিস প্রথম মানুষ হিসেবে বিমানে করে এক শহর থেকে অন্য শহরে সফলভাবে উড়ে যেতে পেরেছিলেন। একসাথে পানিতে এবং আকাশে চলতে পারে এমন বিমান এর ডিজাইন আবিষ্কার করেন কার্টিস। বোমাবর্ষণ যোগ্য বিমানো তারই প্রবর্তন। আর তারই আবিষ্কার সামরিক উড্ডয়নকে নিয়ে যায় অন্য এক দিগন্তে। এসবের মধ্যেই এই দুই উদ্ভাবক এর মধ্যে চলতে থাকে আইনি লড়াই। পেটেন্ট রক্ষার জন্য লড়তে লড়তে মাত্র ৪৫ বছর বয়সে উইলবার রাইট ১৯১২ সালের এপ্রিল টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

১৯১৪ সালের জুলাই মাসে শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। প্রথমবারের মতো যুদ্ধ মাটি ছেড়ে আকাশে উঠে যায়। ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সালের মধ্যে জার্মানি প্রায় ৫০ হাজার বিমান নির্মাণ করে, কিন্তু এদিকে রাইট ভাইদের পেটেন্ট এর কারণে আমেরিকায় বিমান শিল্প তখনও থমকে ছিল ৷

১৯১৭ সালে প্রথম বিশ্ব যুদ্ধে জড়ানোর পর, আমেরিকান সরকার প্রথমেই হস্তক্ষেপ করে বিমান ব্যবসার যুদ্ধ থামাতে। বিমানের পেটেন্ট শেয়ার করতে অরভিল রাইটকে একরকম বাধ্য করে আমেরিকান সরকার।

এরই ফলশ্রুতিতে নতুন ডিজাইনের যুদ্ধবিমান “জেনি ফাইটার” বিমান বিক্রি করে রাতারাতি সবচেয়ে বড়ো বিমান নির্মাতা সংস্থার মালিক বনে যান গ্লেন । কাটিস এই বিমান বিক্রি করেছিলেন প্রায় ৭০০০। যুদ্ধের পর কাটিসের সাফল্য চলতেই থাকে এবং ১৯২০ সাল নাগাদ তিনি প্রায় ৩২ মিলিয়ন ডলারের মালিক হন, যার বর্তমান বাজার মূল্য ৩০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশী। অপরদিকে অরভিল রাইট এ সময় বিমান ব্যবসা থেকে অব্যহতি নিয়ে নেন। ফলে বিনা প্রতিদ্বন্ধিতায় ব্যবসা করছিলেন কাটিস।

রাইট ব্রাদার্স বিমান আবিষ্কার করলেও গ্লেন কাটিস উড়োযাহাজকে লাভজনক ব্যবসা শিল্পে পরিণত করেন৷ রাইট ব্রাদার্স বিমানের প্রাথমিক মডেল নির্মাণ করেন ঠিক তবে বিমানের আধুনিকায়নে তারা ব্যর্থ হন। অন্যদিকে বর্তমান সময়ের আধুনিক বিমানের অনেক যন্ত্রাংশ তৈরিতে কার্টিস এর অবদান অনস্বীকার্য। রাইট কোম্পানি থেকে অরভিল এবং কাটিস কোম্পানি থেকে কাটিস এর অবসর নেয়ার বহু বছর পর এই দুই কোম্পানি একীভূত হয় ৷ বিমান শিল্পের সার্বিক উন্নতির কথা চিন্তা করেই এই একীভূতকরন করা হয়। নতুন কোম্পানির নাম দেয়া হয় “কাটিস-রাইট কোম্পানি”। এই বিশাল কোম্পানিটি বর্তমানে বিমান ও বিমানের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ নির্মাণ করে যাচ্ছে ৷

লেখাটি ইন্টারনেট ঘেঁটে বিভিন্ন লেখা থেকে তৈরী করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *